ভীম রাজা : ইতিহাস ও মিথের সন্ধানে দক্ষিণ দিনাজপুর

প্রান্তভূমিতে ভীম পুজোর বিস্তার কীভাবে হলো?

প্রতীকী ছবি ব্যবহার করা হয়েছে

ক্ষিণ দিনাজপুরের লোকসমাজে ‘রাজা ভীম’ একটি অতি পরিচিত নাম। এই ভীম রাজাকে প্রায়শই মহাভারতের দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীমের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু এই গুলিয়ে যাওয়াটা সচেতন ইতিহাসবিকৃতি নয়; বরং লোকস্মৃতির স্বাভাবিক এক প্রক্রিয়া। লোককথায় যে ভীমের কথা বলা হয়—তিনিও শক্তিশালী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, গদাধারী এক বীর এবং অদ্ভুতভাবে এই বৈশিষ্ট্যগুলি মহাভারতের ভীমসেনের সঙ্গে এতটাই মিলে যায় যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুই ভীমের স্বতন্ত্র পরিচয় ঝাপসা হয়ে যায়। তবে ঐতিহাসিকভাবে এই দুই ভীম এক নন। মহাভারতের ভীম পৌরাণিক চরিত্র, আর দক্ষিণ দিনাজপুরে জনস্মৃতিবদ্ধ ভীম হলেন একাদশ শতকের কৈবর্ত বিদ্রোহের বীর নেতা—এক বাস্তব ঐতিহাসিক ব্যক্তি। কিন্তু লোকসমাজে ইতিহাসের সূক্ষ্ম কালভেদ টেকে না, সেখানে চরিত্র টেকে। এই কারণে দেখা যায়, ঐতিহাসিক ভীম ধীরে ধীরে মহাভারতের ভীমের গুণাবলি ধার করে নিয়েছেন।

কৈবর্ত বিদ্রোহের ঐতিহাসিক ভীম ধীরে ধীরে লিখিত ইতিহাসের প্রান্তে সরে গিয়ে লোকস্মৃতির কেন্দ্রে স্থান করে নিয়েছেন, যার প্রতিধ্বনি আজও শোনা যায় দক্ষিণ দিনাজপুরের গ্রামসমাজে।

পশ্চিমবঙ্গের কিছু জেলায়, মূলত দক্ষিণ দিনাজপুর-এ (South Dinajpur) ভীম রাজার পুজোর প্রচলন থাকলেও কোনো দৃশ্যমান ঐতিহাসিক নিদর্শন মেলে না। কোনো শিলালিপি নেই, কোনো প্রামাণিক নথি নেই, কোনো দুর্গ বা রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ পর্যন্ত নেই। অথচ এই জেলাতেই, বিশেষত কৈবর্ত সমাজে, ভীম আজও উপস্থিত। তিনি আছেন লোকপুজোয়, মানতের আচারে, আর মুখে মুখে ফেরত আসা স্মৃতিতে। এই অনুপস্থিতি ও উপস্থিতির বৈপরীত্যই এই লেখার মূল বিষয়। ইতিহাসের লিখিত নথিতে যাঁকে পরাজিত বিদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, লোকসমাজে তিনি কীভাবে রক্ষাকর্তায় রূপান্তরিত হলেন, সেই আলোচনাই এখানে মুখ্য।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : কৈবর্ত বিদ্রোহ ও ভীম
একাদশ শতকের বাংলা ছিল এক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের সময়কাল। পাল রাজবংশের ক্ষমতা তখন আর আগের মতো দৃঢ় নয়; সামন্তরাজ্যগুলির পারস্পরিক টানাপোড়েন, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং সামাজিক বৈষম্য ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছিল। বিশেষত বরেন্দ্র অঞ্চল, যা পাল সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৃষিনির্ভর কেন্দ্র ছিল, সেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অসন্তোষ ধীরে ধীরে সংগঠিত রূপ নিতে শুরু করে। এবং এই প্রেক্ষাপটেই বরেন্দ্র অঞ্চলে সংঘটিত হয় ইতিহাসখ্যাত ‘কৈবর্ত বিদ্রোহ’, যা মধ্যযুগীয় বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আন্দোলন। কৈবর্ত সম্প্রদায় ছিল একটি জলনির্ভর, কৃষিনির্ভর এবং সামাজিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। ‘কৈবর্ত’ সংস্কৃত শব্দ হলেও, লোককথার ব্যুৎপত্তি অনুযায়ী, ‘কৈ’ বা ‘কে’ শব্দের অর্থ হলো জল ও ‘বর্ত’ কথার অর্থ জীবিকা। এই প্রাচীন সমাজগোষ্ঠী জলসম্পদকেন্দ্রিক জীবিকার (বিশেষত মাছধরা) সাথে যুক্ত ছিল বলেই ‘কৈবর্ত’ নামে অভিহিত হতো। পাল শাসনের মধ্যভাগে, এই গোষ্ঠীর উপর অতিরিক্ত কর আরোপ, ভূমি নিয়ন্ত্রণের অধিকার হ্রাস এবং সামাজিক অবমূল্যায়নের অভিযোগ ছিল পাল রাজাদের ওপর।

এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব ছিল ধারাবাহিক। প্রথমে দিব্য, তারপর রুদ্রক, এবং শেষে ভীম– এই তিনজন কৈবর্ত নেতার হাত ধরে বিদ্রোহ ক্রমশ সংগঠিত ও শক্তিশালী হয়। দিব্য ছিলেন (দিব্যোক বা দিব্যক) সম্ভবত পাল প্রশাসনের একজন স্থানীয় কর্মকর্তা বা সামরিক পদাধিকারী এবং যিনি এই কৈবর্ত বিদ্রোহের সূচনাকার। দিব্যের প্রতিষ্ঠিত এই আন্দোলন ও পরিবর্তশাসন পরবর্তীতে বজায় রাখেন যথাক্রমে রুদ্রক এবং তারপর ভীম। ঐতিহাসিক নথিসূত্রে জানা যায়, ভীমের সময়েই এই আন্দোলন সম্ভবত তীব্রতম রূপ নেয় এবং বরেন্দ্র অঞ্চল সাময়িকভাবে পাল শাসনের বাইরে চলে যায়।
 
দিব্যক, রুদ্রক ও ভীমের ধারাবাহিক এই প্রতিরোধ কৈবর্তদের পাল অপশাসনের বিরুদ্ধে একত্রিত করতে সফল হলেও, ভীমের বিকল্প শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পাল রাজা রামপাল, সামন্ত ও ব্রাহ্মণ্য শক্তিকে একজোট করে বরেন্দ্র পুনর্দখল করেন। ভীম পরাজিত হন এবং ইতিহাসের লিখিত নথিতে তাঁর ভূমিকা এখানেই প্রায় শেষ হয়ে যায়। 

ভীম পুজোর ধারাবাহিকতা কাল্ট সারভাইভাল–এর আলোতেও তাৎপর্যপূর্ণ; এখানে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব দেবতাসত্তায় রূপান্তরিত হয়ে লোকধর্মে আশ্রয় পেয়েছেন। ফলে ভীমের উপস্থিতি প্রত্ননিদর্শনে নয়, বরং আচারে, মানতে এবং সামাজিক বিশ্বাসে—যেখানে ইতিহাস মুছে গেলেও পুজোর স্মৃতি আজও বিলীন হয়নি।

এই বিবরণ পাওয়া যায় পালপন্থী কাব্যগ্রন্থ ‘রামচরিতম’-এ, যেখানে ভীমকে বিদ্রোহী ও শাসনব্যবস্থার বিঘ্নকারী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। তবে এই ঐতিহাসিক বর্ণনার একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেহেতু বিদ্রোহ দমনকারী শক্তির দৃষ্টিকোণ থেকেই এই ইতিহাস বিবৃত, তাই ভীমের চরিত্র সেখানে নেতিবাচক। এবং এইভাবেই কৈবর্ত বিদ্রোহের ঐতিহাসিক ভীম ধীরে ধীরে লিখিত ইতিহাসের প্রান্তে সরে গিয়ে লোকস্মৃতির কেন্দ্রে স্থান করে নিয়েছেন, যার প্রতিধ্বনি আজও শোনা যায় দক্ষিণ দিনাজপুরের গ্রামসমাজে।

দক্ষিণ দিনাজপুর : ইতিহাসের প্রান্তভূমি
ঐতিহাসিক ‘ভীম’ কিংবা কৈবর্ত বিদ্রোহের আলোচনায় দক্ষিণ দিনাজপুরের নাম সরাসরি উচ্চারিত না হলেও, অঞ্চলগত প্রেক্ষাপটে এই ভূখণ্ডকে উপেক্ষা করা যায় না। মধ্যযুগীয় বাংলায় আজকের জেলা-সীমা কার্যকর ছিল না; রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঞ্চল নির্ধারিত হত নদী, জনবসতি ও ভূমি-ব্যবহারের ভিত্তিতে। পাল রাজবংশের সাম্রাজ্যের বিস্তার ছিল উত্তর-পশ্চিমে জলন্ধর (বর্তমান পাঞ্জাব), মধ্য গঙ্গা উপত্যকায় কান্যকুব্জ (বর্তমান উত্তরপ্রদেশ), পূর্বে গৌড় (বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গের কিছু অংশ) এবং দক্ষিণ-পূর্বে কটক (বর্তমান ওড়িশা) পর্যন্ত। সেই অর্থে দক্ষিণ দিনাজপুর ছিল ঐতিহাসিক গৌড়ের, বরেন্দ্র অঞ্চলের দক্ষিণ–পূর্ব প্রান্তভূমি। 

বিদ্রোহের মূল কেন্দ্রভূমি যা প্রশাসনিক ও সামরিক সংঘর্ষে চিহ্নিত, সেখানে প্রান্তিক অঞ্চলগুলি বিদ্রোহী সমাজের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ধারক হয়ে ওঠে। দক্ষিণ দিনাজপুর ছিল তেমনই এক ভূখণ্ড—নদী, বিল, জলাভূমি ও মৎস্যজীবী বসতিতে সমৃদ্ধ। কৈবর্ত সমাজ, যাদের উপর ভর করেই এই বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছিল, তাদের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক বিস্তার এই অঞ্চলেও উপস্থিত ছিল।

এই কারণে দক্ষিণ দিনাজপুরে ভীমের রাজধানী বা সামরিক নিদর্শন না থাকলেও, তাঁর সামাজিক উপস্থিতির ভিত্তি অনুপস্থিত ছিল না। বরং বলা যায়, বিদ্রোহের রাজনৈতিক কেন্দ্র থেকে দূরে অবস্থান করার ফলে এখানকার স্মৃতি স্থাপত্যে নয়, লোকজ চর্চায় বেশি সংরক্ষিত হয়েছে।

আরও একটি দিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রান্তভূমি হিসেবে দক্ষিণ দিনাজপুর ছিল ক্ষমতার প্রত্যক্ষ নজরদারির বাইরে, কিন্তু সামাজিক-সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের ভিতরে। ফলে এখানে ইতিহাস লিখিত নথিতে কম ধরা পড়েছে, কিন্তু মৌখিক ধারাবাহিকতায় বহুযাবৎকাল টিকে রয়েছে। ভীমের স্মৃতিও সেই ধারাবাহিকতার অংশ—যেখানে তিনি শাসক হিসেবে নয়, সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে বেঁচে আছেন। অতএব, দক্ষিণ দিনাজপুরকে ভীমের ইতিহাসে, কেন্দ্র না হলেও প্রান্ত হিসেবে স্বীকার করা জরুরি। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই যেখানে ইতিহাসের কেন্দ্র নীরব হয়ে যায়, প্রান্তভূমিই সেখানে হয়ে ওঠে স্মৃতির শেষ আশ্রয়।

লোকস্মৃতি, জল, জীবিকা ও ভীম
দক্ষিণ দিনাজপুরে ভীম পুজোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য তার অপ্রাতিষ্ঠানিকতা। ভীমের নামে দক্ষিণ দিনাজপুরে কোনো স্থায়ী মন্দির নেই; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুজোর স্থান একটি পাথরখণ্ড, মাটির ঢিবি, অথবা কোনো প্রাচীন বৃক্ষতল। এইসব স্থানকে ঘিরে কোনো স্থাপত্য নির্মিত হয়নি, তবু গ্রামবাসীর কাছে তা দেবস্থান হিসেবে স্বীকৃত। এই অনাড়ম্বরতা ইঙ্গিত করে যে, ভীম এখানে শাস্ত্রনির্ভর দেবতা নন, বরং লোকবিশ্বাসে নির্মিত এক স্মৃতি-পুরুষ। 

দক্ষিণ দিনাজপুরে ভীম রাজার উপস্থিতি অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে প্রধান সীমাবদ্ধতা হল লিখিত ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের অভাব। কোনো শিলালিপি, স্থাপত্য বা সমসাময়িক দলিল এই অঞ্চলে তাঁর প্রত্যক্ষ শাসন বা কর্মকাণ্ডের সাক্ষ্য দেয় না।

পুজোর আচারও একইভাবে লোকজ। ব্রাহ্মণ্য পুরোহিতের উপস্থিতি অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুপস্থিত; পুজো পরিচালনা করেন স্থানীয় কৈবর্ত সমাজের প্রবীণ সদস্যরা। নিবেদনে থাকে মাছ, ভাত, দেশি মদ বা দৈনন্দিন জীবনের খাদ্যোপাদান— যা ভীমের সঙ্গে জলজীবন ও মৎস্যজীবী সংস্কৃতির সম্পর্ককে প্রতিফলিত করে। দক্ষিণ দিনাজপুরের ভৌগোলিক সত্তা মূলত নদীনির্ভর। আত্রেয়ী, পুনর্ভবা প্রভৃতি নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে এখানকার কৃষি ও মৎস্যজীবী জীবন। কৈবর্ত সমাজের জীবিকা, খাদ্যসংস্কৃতি এবং দৈনন্দিন অনিশ্চয়তা—সবই জলসম্পদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। নদীতে মাছ কমে গেলে, পুকুরে রোগ দেখা দিলে, বা কোনো আকস্মিক বিপর্যয় ঘটলে ভীমের উদ্দেশ্যে মানত করা হয়। বিপদ কেটে গেলে পুজো দেওয়া হয় কৃতজ্ঞতা স্বরূপ। অর্থাৎ, ভীম এখানে দূরবর্তী কোনো দেবতা নন; তিনি সমাজের সংকটমুহূর্তের আশ্রয়। লোকতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এই পুজোকে একটি “লিভিং মেমোরিয়াল” হিসেবে দেখা যায়, যেখানে প্রত্নবস্তুর পরিবর্তে আচারের ধারাবাহিকতা ইতিহাসের স্মৃতি বহন করে। 
   
দক্ষিণ দিনাজপুরে ভীম পুজোর বিস্তার
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কৈবর্ত বা মৎস্যজীবী বসতিপ্রধান গ্রামাঞ্চলেই এই পুজোর উপস্থিতি অধিক লক্ষ্য করা যায়। বালুরঘাট মহকুমার আত্রেয়ী তীরবর্তী গ্রামগুলি, কুশমণ্ডি অঞ্চলের জেলে-পাড়া, তপন ব্লকের পুনর্ভবা অববাহিকা এবং হিলি সংলগ্ন সীমান্তবর্তী জলাভূমি-নির্ভর বসতিতে ভীম পুজোর বিচ্ছিন্ন কিন্তু ধারাবাহিক চর্চা পাওয়া যায়।  

 

সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ গবেষণা
দক্ষিণ দিনাজপুরে ভীম রাজার উপস্থিতি অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে প্রধান সীমাবদ্ধতা হল লিখিত ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের অভাব। কোনো শিলালিপি, স্থাপত্য বা সমসাময়িক দলিল এই অঞ্চলে তাঁর প্রত্যক্ষ শাসন বা কর্মকাণ্ডের সাক্ষ্য দেয় না। ফলে গবেষণাকে নির্ভর করতে হয় মূলত লোকস্মৃতি, স্থাননাম ও আচার-অনুশীলনের উপর—যার স্বভাবতই একটি ব্যাখ্যাগত সীমা রয়েছে। তবে এই সীমাবদ্ধতাই ভবিষ্যৎ গবেষণার সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত করে। পদ্ধতিগত লোকসংগ্রহ, গ্রামভিত্তিক মানচিত্রায়ন, এবং প্রত্নসম্ভাব্য স্থানের ক্ষেত্রসমীক্ষা—এই সব উদ্যোগ দক্ষিণ দিনাজপুরে ভীম-স্মৃতির স্তরগুলি আরও স্পষ্ট করতে পারে। 

পরিশেষে…
ভীম রাজার স্মৃতি দক্ষিণ দিনাজপুরে তথা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা, মহকুমা, গ্রামে যে রূপে টিকে আছে, তাকে কেবল লোকবিশ্বাস বলে চিহ্নিত করলে তার ঐতিহাসিক তাৎপর্য সম্পূর্ণ ধরা পড়ে না। প্রান্তিক সমাজের স্মৃতিচর্চার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এটি এক ধরনের সাব-অল্টার্ন মেমোরি —যেখানে ক্ষমতাকেন্দ্রিক লিখিত ইতিহাসের বাইরে থেকে একটি পরাজিত নেতৃত্বের স্মৃতি সমাজ নিজস্ব উপায়ে সংরক্ষণ করেছে। একই সঙ্গে ভীম পুজোর ধারাবাহিকতা কাল্ট সারভাইভাল–এর আলোতেও তাৎপর্যপূর্ণ; এখানে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব দেবতাসত্তায় রূপান্তরিত হয়ে লোকধর্মে আশ্রয় পেয়েছেন। ফলে ভীমের উপস্থিতি প্রত্ননিদর্শনে নয়, বরং আচারে, মানতে এবং সামাজিক বিশ্বাসে—যেখানে ইতিহাস মুছে গেলেও পুজোর স্মৃতি আজও বিলীন হয়নি।
__________

সংক্ষিপ্ত গ্রন্থপঞ্জি

১. সন্ধ্যাকর নন্দী, রামচরিতম (সংস্কৃত কাব্য), ১১শ শতক, ২. রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলার ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা, ৩. রামশরণ শর্মা, প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতীয় সমাজ, ওরিয়েন্ট লংম্যান, ৪. নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালির ইতিহাস: আদিপর্ব, দে’জ পাবলিশিং, ৫. দীনেশচন্দ্র সেন, বঙ্গের লোকসাহিত্য, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ৬. দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কৈবর্ত সমাজভিত্তিক মৌখিক স্মৃতি ও ক্ষেত্রসমীক্ষা।

Developed by DXDasia