দক্ষিণ দিনাজপুরের বাণগড় : মাটি খুঁড়ে পাওয়া গিয়েছিল মৌর্য, গুপ্ত, পাল, তাম্রপ্রস্তর যুগের সন্ধান

৯-২৫ নভেম্বর সমগ্র পৃথিবী জুড়ে পালিত হয়। দক্ষিণ দিনাজপুর হেরিটেজ সোসাইটিও অন্যান্য বছরের মতো বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস পালন করে। প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। নালন্দা বিদ্যাপীঠে বিশ্ব ঐতিহ্য দিবসের সূচনা দিনে উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণ দিনাজপুর হেরিটেজ সোসাইটির সহ সভাপতি অভিজিৎ সরকার, নালন্দা বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক সৌমিত দাস, কোষাধক্ষ্য ঝন্টু হালদার, হেরিটেজ সোসাইটির কুমারগঞ্জ ব্লক কো-অর্ডিনেটর জুলিয়াস, হাসান চৌধুরী, সদস্য বিপ্লব ঘোষ প্রমুখ।

‘নিজেদের ঐতিহ্যকে চেনো, নিজেদের শেকড়কে জানো’ – এই বিষয়কে কেন্দ্র করে বক্তব্য রাখেন সৌমিত দাস, অভিজিৎ সরকার প্রমুখ। দক্ষিণ দিনাজপুরে যে যে স্থানগুলো ঐতিহ্যের তালিকায় আসতে পারে সেই স্থানগুলিকে নিয়ে একটি স্লাইড উপস্থাপনা করেন শিক্ষক ঝন্টু হালদার। সেখানে বালুরঘাট নাট্যমন্দির, হিলির জৈন মন্দির, খাঁপুর সিংহবাহিনী মন্দির, কুমারগঞ্জের দেবগ্রামের শিবমন্দির, বাণগড়, আতা শাহের দরগা, করদহের শিবমন্দির-সহ অন্যান্য ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলিকে দেখানো হয়। পরে সচেতনতার অঙ্গ হিসেবে শোভাযাত্রাও হয়। ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের শহর ও জেলার ঐতিহ্য সম্পর্কে সংরক্ষণের অঙ্গীকার করে।

১৮০৯ সালে প্রথমবার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষের পূর্বপ্রান্তে তাদের জরিপ কার্যের সময় প্রথম খেয়াল করেন দিনাজপুরের ঐতিহাসিক নিদর্শনের। এবং তখন থেকেই নিদর্শনগুলির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায় বর্তমান দক্ষিণ দিনাজপুরের বাণগড়ের ঢিবি।

বাণগড়ের ঢিবি

দক্ষিণ দিনাজপুর হেরিটেজ সোসাইটি-সহ সভাপতি অভিজিৎ সরকার বলেন, “আমরা অনেক দিন থেকেই জেলার জন্য হেরিটেজ মর্যাদা যুক্ত স্থানের দাবি করে আসছি। এবার তা পাওয়া উচিত। আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে আমাদের? শিক্ষার্থীদের সচেতনতার মাধ্যমে এই দাবি নিয়মিত করে যাবো।” এই কর্মসূচির আলোকে দক্ষিণ দিনাজপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে একটা নাতিদীর্ঘ আলোচনা করা যাক। দক্ষিণ দিনাজপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটা প্রাণকেন্দ্র বাণগড়। মৌর্য, শুঙ্গ, গুপ্ত, পাল, সেন, তাম্রপ্রস্তর যুগের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে যে জায়গার মাটি খুঁড়ে তার নাম বাণগড়। বাণগড়ের রাজা ও রাজত্বকাল শুরুর সঠিক ইতিবৃত্তান্ত জানা না গেলেও একটি কথা উল্লেখ করলে বোঝা যাবে এর প্রাচীনত্ব। ড. দীনেশচন্দ্র সরকার তাঁর পাল পূর্ববর্তী যুগের  বংশানুচরিত গ্রন্থে লিখেছেন, “ত্রয়োদশ শতাব্দীর সূচনায় তুর্কী মসুলমানেরা বাংলার পশ্চিমার্ধ অধিকার করে প্রথম দিকে গৌড় বা লখ্নাবতী (লক্ষ্মনাবতী)-কে রাজধানী করে এবং কিছুকাল পরে দেবকোট বা বাণগড়ে তাদের শাসনকেন্দ্র স্থাপিত হয়।”

১৮০৯ সালে প্রথমবার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষের পূর্বপ্রান্তে তাদের জরিপ কার্যের সময় প্রথম খেয়াল করেন দিনাজপুরের ঐতিহাসিক নিদর্শনের। এবং তখন থেকেই নিদর্শনগুলির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায় বর্তমান দক্ষিণ দিনাজপুরের বাণগড়ের ঢিবি। ১৯৩৮-৪১ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ঐকান্তিক ইচ্ছায় ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের কলকাতার তৎকালীন সুপারিন্টেনডেন্টের মাধ্যমে ভারত সরকারের পুরাতত্ত্ব বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল কে. এন. দীক্ষিতের মাধ্যমে বাণগড় খননের অনুমতি পাওয়ার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক ড. কুঞ্জ গোবিন্দ গোস্বামীর নেতৃত্বে খননকার্য শুরু হয়। আর তাতেই মাটির নীচ থেকে উঠে আসে বিভিন্ন যুগের প্রত্নসম্ভার। ভূমিগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসে সেনানিবাস, প্রাসাদ ফটক, শস্যাগার, পদ্মাবতী স্তম্ভ, নব্যপ্রস্তর যুগের ফ্লিট পাথরের কুঠার- এসব রাখা আছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ মিউজিয়ামে।

ধলদিঘির পাড়ে অবস্থিত আতা শাহের দরগা

২০০৯-১১ দ্বিতীয়বার খনন হয়েছিল বাণগড়ে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার কলকাতা মণ্ডলের অধিকর্তা তপনজ্যোতি বৈদ্যের নেতৃত্বে। ৮টি স্তরের এই খনন কার্যে সবার উপরে যেমন পাওয়া গিয়েছিল সুলতান যুগের পাতকুয়া, তেমনই সর্বনিম্ন স্তরে পাওয়া গিয়েছে কাঠের কাঠামো। এটা কি তবে কাঠ দ্বারা নির্মিত বাড়ির প্রাচীন নিদর্শন? ২০১১ সালে খনন বন্ধ হয়ে যায়। দক্ষিণ দিনাজপুর হেরিটেজ সোসাইটি অন্যান্য ইতিহাস লেখকদের লেখায় বারবার উঠে এসেছে বাণগড়ের পুনর্খননের কথা। অবশেষে আবার প্রায় ৩০ কোটি টাকার অনুমোদন মিলেছে বাণগড় পুনর্খননের।

দক্ষিণ দিনাজপুরে এলে পর্যটকদের গন্তব্য হয় বাণগড়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষামূলক ভ্রমণেরও জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাণগড়। তবে এই ঐতিহাসিক স্থান যে আরও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে তা বলাই বাহুল্য। বাণগড় ছাড়াও গঙ্গারামপুর এবং সংলগ্ন এলাকায় দ্রষ্টব্য স্থানগুলি হল অনিরুদ্ধ-ঊষার বিবাহ মণ্ডপ, অতীশ দীপঙ্করের স্মৃতি বিজড়িত ধলদিঘির পাড়ে অবস্থিত আতা শাহের দরগা, ইখতিয়ারউদ্দিন মহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির (পীরপালের সমাধি) সমাধি ইত্যাদি।

২০১১ সালে খনন বন্ধ হয়ে যায়। দক্ষিণ দিনাজপুর হেরিটেজ সোসাইটি অন্যান্য ইতিহাস লেখকদের লেখায় বারবার উঠে এসেছে বাণগড়ের পুনর্খননের কথা। অবশেষে আবার প্রায় ৩০ কোটি টাকার অনুমোদন মিলেছে বাণগড় পুনর্খননের।

ইখতিয়ারউদ্দিন মহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির সমাধি

চার শতাব্দীর বেশি সময় ধরে এখানে রাজত্ব করেছিলেন পাল বংশের রাজারা। শেষ সম্রাট মদন পালের আমলে সভাকবি সন্ধ্যাকর নন্দী সৃষ্ট ‘রামচরিত’ কাব্যগ্রন্থ সংস্কৃত সাহিত্যের এক উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে আছে। দক্ষিণ দিনাজপুর হেরিটেজ সোসাইটি বিশ্ব ঐতিহ্য সপ্তাহের (World Heritage Week) বিভিন্ন দিনের নানাবিধ কর্মসূচিতে তুলে ধরছে বাণগড়-সহ দক্ষিণ দিনাজপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। মাহুর কিসমতের মন্দির, দেবগ্রাম, শমীবৃক্ষ, ঐতিহ্যের তপন দিঘি আরও কত কী!

কীভাবে যাবেন
ট্রেনে : নিকটতম রেল স্টেশনটি বালুরঘাট, যা দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা সদর। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে কলকাতার ট্রেনগুলি নিয়মিতভাবে বালুরঘাটের জন্য পাওয়া যায়

সড়ক পথে : মালদা, শিলিগুড়ি, রায়গঞ্জ এবং উত্তরবঙ্গের অন্যান্য প্রধান শহরগুলিতে ইতিমধ্যে রাস্তা দিয়ে সুসংযুক্ত। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে।

Written by