বিভাজন নয়, গ্রামবাংলার সহাবস্থানের কথা বলে দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুর

“ধর্ম যার যার, পথ যার যার,/ মানুষ হইলে মিলিবে সবার।” — শাহ আবদুল করিম (লোকগান, সিলেট অঞ্চলের বাউল পরম্পরা)

ক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুর—মানচিত্রে একটি ছোটো শহর, কিন্তু স্মৃতির আবহে বহুস্তরীয়। যেখানে ইতিহাস আজ আর কেবল প্রত্ননথিতে বন্দি নয়; এখানে ইতিহাস মিশে গেছে লোককথায়, বিশ্বাসে রূপ নিয়েছে আর মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে জায়গা করে নিয়েছে। এই ভূখণ্ডেই ‘পীরপাল’ নামক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে একটি সমাধি, যেটি লোকমুখে বখতিয়ার খিলজী-র সমাধি নামে চিহ্নিত। ঐতিহাসিক নথিতে এই সমাধির পরিচয় অনিশ্চিত, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ সীমিত, এবং গবেষকদের মধ্যে মতভেদ স্পষ্ট। কিন্তু এত বিতর্ক ও দ্বিধার মধ্যেও এই সমাধিকে ঘিরে প্রতি বছর যে লোকমেলা বসে, তা উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ সমাজে হিন্দু–মুসলমান সম্প্রীতির এক বিরল, নীরব দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।

মানুষ কীভাবে একটি বিতর্কিত স্মৃতিকে সহাবস্থানের জায়গায় রূপান্তর করেছে—এই প্রতিবেদন তার নথি। ইতিহাসে কিছু নাম আছে, যারা কেবল একজন ব্যক্তিকে নির্দেশ করে না, একটি যুগের সূচনাকেও চিহ্নিত করে। বখতিয়ার খলজি তেমনই এক নাম। দ্বাদশ শতকের শেষভাগে বাংলার বনজঙ্গল, নদী ও জনপদের মধ্য দিয়ে তাঁর অগ্রযাত্রা কেবল একটি সামরিক অভিযান ছিল না; ছিল বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক গভীর রূপান্তরের সূচনা। এক সময়ের প্রায় অজ্ঞাত তুর্কো-আফগান সেনানায়ক, অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই হয়ে উঠলেন বাংলার শাসক।

এই মাজার ওয়াকফ বোর্ডের অধীনে নয় আবার ASI বা রাজ্য প্রত্নতত্ত্বের সুরক্ষিত স্মারকও নয় অর্থাৎ, এটি পুরোপুরি লোকায়ত ব্যবস্থাপনায় চলে। এই মাজার বা সমাধি কোনো এক সম্প্রদায়ের নয়, গ্রামের হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকলের প্রার্থনা করার জায়গা।

 

ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, বখতিয়ার খিলজী ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে নবদ্বীপ (নদিয়া) দখল করেন। সেই সময় নবদ্বীপে বাংলার শেষ স্বাধীন হিন্দু রাজা লক্ষণ সেন সিংহাসনাসীন। কথিত আছে, ১৭-১৮ জনের খুব ছোটো একটি অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে (ঐতিহাসিকদের মতে সংখ্যাটি ছিল প্রতীকী, আক্রমণের আকস্মিকতা বোঝাতে ব্যবহৃত) বখতিয়ার খিলজী এই সেন শাসনাধীন নবদ্বীপে আকস্মিক আক্রমণ করেন। এই ক্ষুদ্র সংখ্যক ঘোড়ার ক্ষুরের আঘাতে এত ধুলো ওড়ে যা দেখে লোকজন ভাবে যে, খিলজী তার বিরাট যুদ্ধবাহিনী নিয়ে আক্রমণ করেছে, এবং রাজা লক্ষ্মণ সেনের কাছেও সেই একই খবরই পৌঁছোয়। রাজা ভয় পেয়ে বিনা যুদ্ধে নবদ্বীপ ছেড়ে পূর্ববঙ্গে (সম্ভবত বিক্রমপুরে) পালিয়ে যান এবং বাংলায় এক নতুন যুগের সূচনা হয়। বখতিয়ার খিলজী নবদ্বীপ দখলের পর, নবদ্বীপকে স্থায়ী রাজধানী হিসেবে রাখেননি। তিনি উত্তর বাংলার গুরুত্বপূর্ণ নগর লখনৌতি (বর্তমান মালদা জেলার গৌড় অঞ্চল)-কে তাঁর শাসনকেন্দ্র ও রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

নবদ্বীপ জয়ের পর বখতিয়ার খিলজী উত্তর দিকে এক দুঃসাহসিক অভিযানে বেরোন—উদ্দেশ্য তিব্বত ও কামরূপের দিকে অগ্রসর হওয়া। এই সামরিক অভিযান দুর্গম পাহাড়ি পথ, প্রবল শীত, খাদ্য ও রসদের ঘাটতি এবং স্থানীয় প্রতিরোধের কারণবশত কালপূর্বেই ব্যর্থ হয়। সমসাময়িক সূত্র Tabaqat-i-Nasiri অনুযায়ী, ব্যর্থ অভিযানের পর বখতিয়ার শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এবং সেই সুযোগের অসদ্ব্যবহারে তাঁরই এক অনুগত সেনাপতি (আলি মারদান খিলজী) ১২০৬ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ তাঁকে হত্যা করে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, আজকের দক্ষিণ দিনাজপুর–মালদা অঞ্চলে বখতিয়ারকে সমাধিস্থ করা হয়। বখতিয়ার খিলজীর সমাধির ঐতিহাসিক অবস্থান, প্রত্নতাত্ত্বিক দলিল অনুযায়ী, অজ্ঞাত। দক্ষিণ দিনাজপুর, গঙ্গারামপুরের পীরপাল গ্রামে অবস্থিত এই সমাধিকে স্থানীয়ভাবে তাঁর বলে মানা হলেও, এর পক্ষে কোনো সমসাময়িক লিখিত বা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই। অতএব এটি একটি লোকবিশ্বাস-নির্ভর স্মৃতিস্থল।

এই মাজারের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃপক্ষ নেই। এই মাজার ওয়াকফ বোর্ডের অধীনে নয় আবার ASI বা রাজ্য প্রত্নতত্ত্বের সুরক্ষিত স্মারকও নয় অর্থাৎ, এটি পুরোপুরি লোকায়ত ব্যবস্থাপনায় চলে। এই মাজার বা সমাধি কোনো এক সম্প্রদায়ের নয়, গ্রামের হিন্দু- মুসলিম নির্বিশেষে সকলের প্রার্থনা করার জায়গা। মাজারের দেখভাল করেন মূলত আশপাশের ২–৩টি পরিবার। তাদের কেউ নিজেকে ‘খাদিম’ বলেন আবার কেউ বলেন “পীরের জায়গা পাহারা দিই”। সমাধিটি দেখাশোনা করা, পরিষ্কার রাখা, আলো জ্বালানো, ধূপ জ্বালা এই সব কাজ করেন গ্রামের সকল সম্প্রদায় মিলেই; এই দায়িত্ব কিন্তু লিখিত কোনো নিয়ম নয়, উত্তরাধিকারসূত্রে তারা এই কাজ করে আসছে। মুসলিম পরিবার এখানে চাদর চড়ায়, ফাতিহা পড়ে; হিন্দুরা প্রদীপ জ্বালায়; আবার হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবাই মানত করে, গাছে বা রেলিং-এ সুতো বাঁধে, সেই মানত পুরো হলে তারা এসে একটি সুতো খুলে দিয়ে যায়, কেউবা বুড়ো পীরের মাজারে মাটির ঘোড়া ভেট দেয়, দুধ ও ফুল দেয়। তবে, এই মুসলিম দরগার দর্শনার্থীদের সিংহভাগই কিন্তু হিন্দু।

এই সমাধিকে ঘিরে আজ বহু কিংবদন্তি, লোকবিশ্বাস ও ধর্মীয় আচারের রমরমা, এগুলি লিখিত ইতিহাসের চেয়ে লোকস্মৃতি ও মৌখিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন: গভীর রাতে নাকি সমাধির আশপাশে ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ শোনা যায়, তাই রাতে মাজারে একা যাওয়ার নিয়ম নেই; এই গ্রামে খাটে শোওয়া অশুভ, তাই মাটি উঁচু করে শোওয়াই নিয়ম; এই মাজার নাকি বৃহস্পতিবার ও অমাবস্যায় সবচেয়ে সংবেদনশীল থাকে, তাই এই দিনগুলোতে আলো জ্বালিয়ে রাখা আর বাড়তি সতর্কতা জারি থাকে; পীর নীরবতা পছন্দ করেন, তাই সমাধির কাছে নীরবতা বজায় রাখার নিয়ম। তবে, সব থেকে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই গ্রামে কেউ কাঠের খাটে শোয় না, এমনকি কাঠের চেয়ারে বসেও না। কয়েক শতাব্দী ধরে এই নিয়ম চলে আসছে বংশপরম্পরায়। এই গ্রামের লোকেদের বিশ্বাস যে খাটে ঘুমোলে বুড়ো পীর খাট থেকে ফেলে দেয় অথবা অসুখ-বিসুখ করে। তাই এই গ্রামের সব বাড়িতে মাটি উঁচু করে অথবা সিমেন্ট দিয়ে খাটের মতো বেদী বানানো হয়, তার ওপর বিছানা করে তারা শোয়। এমনকি বিয়েতে খাট দেওয়া বা নেওয়ার প্রচলনও এই গ্রামে নেই। অন্য গ্রাম থেকে কোনো মেয়ে বিয়ে করে যদি এই গ্রামে আসে, তাকেও শুতে হয় ওই মাটি বা সিমেন্টের উঁচু বেদী ওপর বিছানা করে, তবে এই গ্রামের কেউ যদি গ্রামের বাইরে যায়, তখন সে খাটে শুতে পারে। তবে, গ্রামের ১-২টো বাড়ির লোক কেবল খাটে শোয়, তাদের বিশ্বাস এই যে, তাদের কোনো এক পূর্বপুরুষ পীরের মাজারে জ্যান্ত ঘোড়া ভেট করেছিল, তারপর থেকে তারা খাটে শোয়ার অনুমতি পেয়েছে। একটি কথা এখানে বিশেষ উল্লেখ্য, এই গ্রামের বেশির ভাগ পরিবারই কিন্তু হিন্দু পরিবার; মুসলমান প্রায় নেই বললেই চলে, এবং এইসব নিয়ম মেনে চলা পরিবারগুলোও অধিকাংশ হিন্দু। তবে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এখানকার লোক বিশ্বাস করে যে, মাজারের মাটি বা ছায়া রোগ সারায় বিশেষ করে চর্মরোগ, জ্বর বা মানসিক অস্থিরতা, তাই হিন্দু, মুসলিম নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের লোক এই মাজারে আসেন তাদের রোগ-জরা থেকে মুক্তি পাওয়ার বিশ্বাস নিয়ে। ইয়ুং-এর collective unconscious ধারণা দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, পীরপালের সমাধিকে ঘিরে প্রচলিত বিশ্বাসগুলো ব্যক্তিগত কুসংস্কার নয়, বরং প্রজন্মান্তরে সঞ্চিত সমষ্টিগত স্মৃতির (collective memory) প্রকাশ। মৃত্যু, অন্ধকার ও নীরবতার মতো আর্কিটাইপিক ভয় এই লোকাচারের মাধ্যমে সামাজিক আচরণে রূপ নিয়েছে।

ধর্ম এখানে পরিচয়ের দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় না; বরং লোকাচার, স্মৃতি ও দৈনন্দিন অভ্যাসের ভেতর দিয়ে সহাবস্থানের একটি নীরব কাঠামো গড়ে তোলে। এই মেলা ইতিহাসের স্মারক নয়, ইতিহাসের ফলাফলও নয়; এটি বরং সমাজের প্রতিক্রিয়া

এই সমাধিকে ঘিরে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বসে একটি লোকমেলা—কোনো সরকারি বিজ্ঞপ্তি ছাড়া, কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই। মেলার দিনে সমাধি চত্বর হয়ে ওঠে ভাগ করা এক পবিত্র স্থান (shared sacred space),  যেখানে হিন্দু ও মুসলমান মানুষ পাশাপাশি দাঁড়ায়—কেউ মানত করতে, কেউ দোয়া পড়তে, কেউ কেবল মানুষের ভিড় দেখতে। মুসলমানরা চাদর চড়ান ও ফাতিহা পাঠ করেন, হিন্দুরা ধূপ–প্রদীপ জ্বালান ও মানত করেন, সঙ্গে চলে নাগরদোলা, জিলিপির দোকান, খেলনার হাঁক। ধর্মীয় আচার ও গ্রামীণ বিনোদন পাশাপাশি অবস্থান করে, কোনোটিই অন্যটিকে অস্বীকার করে না। ধর্ম এখানে পরিচয়ের দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় না; বরং লোকাচার, স্মৃতি ও দৈনন্দিন অভ্যাসের ভেতর দিয়ে সহাবস্থানের একটি নীরব কাঠামো গড়ে তোলে। এই মেলা ইতিহাসের স্মারক নয়, ইতিহাসের ফলাফলও নয়; এটি বরং সমাজের প্রতিক্রিয়া—একটি বিতর্কিত স্মৃতিকে মানুষ কীভাবে দৈনন্দিন সহাবস্থানের পরিসরে রূপান্তর করেছে, তার জীবন্ত দলিল।

এই মেলা ধর্মীয় কম, সামাজিক বেশি। একটি গ্রামীণ মিলনমেলা। যেখানে সকলের সম্মিলিত লোকাচারই হলো মিলনের ভাষা। মেলার দিনগুলোতে লক্ষ্য করলে দেখা যায় – হিন্দু পরিবার, মুসলিম দরগা-রিচুয়ালে অংশ নিচ্ছে, আবার মুসলিম পরিবার হিন্দু লোকাচার মেনে প্রদীপ জ্বালাচ্ছে। এগুলো পরিকল্পিত সম্প্রীতি নয়, এগুলো সহজাভ্যাসে গড়ে ওঠা সহাবস্থান। এখানে রক্ষণাবেক্ষণ, লোকাচার ও দৈনন্দিন আচরণ মিলিয়ে গড়ে উঠেছে হিন্দু–মুসলমান সম্প্রীতির এক ব্যবহারিক সংস্কৃতি।

এই প্রতিবেদন ইতিহাসের সত্যতা নির্ধারণের চেষ্টা নয়, কারণ ইতিহাস এখানে একমাত্র সত্য নয়। এটি একটি সামাজিক বাস্তবতার নথি, কীভাবে একটি অনিশ্চিত সমাধি, লোকবিশ্বাস ও মেলার মতো সাধারণ সামাজিক প্রথার মাধ্যমে, ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে হিন্দু–মুসলমান সহাবস্থানের এক অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে। যে দেশে ইতিহাস প্রায়ই বিভাজনের ভাষায় লেখা হয়, গঙ্গারামপুরের এই মেলা সেখানে দেখায়—লোকসংস্কৃতি কীভাবে নীরবে, কোনো স্লোগান ছাড়াই, মানুষকে একসঙ্গে দাঁড় করিয়ে রাখতে পারে।

——————
গ্রন্থপঞ্জি / নির্বাচিত তথ্যসূত্র:
● Minhaj-i-Siraj. Tabaqat-i-Nasiri.
● Elliot, H. M. & Dowson, John (eds.). The History of India as Told by Its Own Historians.
● Majumdar, R. C. (ed.). The History of Bengal, Vol. II: Muslim Period.
● Eaton, Richard M. The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204–1760.
● Ernst, Carl W. Eternal Garden: Mysticism, History, and Politics at a South Asian Sufi Center.
● van der Veer, Peter. Religious Nationalism: Hindus and Muslims in India.
● Halbwachs, Maurice. On Collective Memory.
● Jung, C. G. The Archetypes and the Collective Unconscious.
● Eliade, Mircea. The Sacred and the Profane.
● West Bengal District Gazetteer: Dakshin Dinajpur.
● Field interviews and oral histories collected in Pirpal village, Gangarampur.

Written by