টোপরের বদলে দুব্বো, ঘোমটার বদলে তুলসি পাতা – বিয়ের পিঁড়িতে ‘বড়ি’ যুগল

আজও বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে তিথি নক্ষত্র মিলিয়ে ঘটা করে এই প্রথা মেনে চলা হয়

শীতের সন্ধ্যের সুরে ঘনিয়ে আসছেন বিসমিল্লা… গোধূলি লগ্ন। রজনীগন্ধার ম ম গন্ধের ভিতর দিয়ে আমন্ত্রিতরা সবাই আসতে শুরু করেছে একে একে। সাজানো হয়েছে বরের বাসর। সুসজ্জিত ছাদনা তলায় জোড়া পানে মুখ ঢেকে একটু পরেই হাজির হবে কনে। তারপর… শ্রী শ্রী প্রজাপতয়ে নমঃ – কল্যাণীয়া ওমুকের সঙ্গে কল্যাণীয় তমুকের শুভবিবাহ সম্পন্ন হইল।

শীত মরসুমে এহেন প্রাচীন চিত্রের সঙ্গে আমরা বারবার পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাই। কিন্তু যে বিবাহ অনুষ্ঠানের সঙ্গে আমরা অনেকেই পরিচিত নই, জানি না কিংবা ভুলতে বসেছি তা হল- বাংলার হাতেগড়া খাঁটি শৈল্পিক প্রোডাক্ট – ‘বড়ি’র বিবাহ অনুষ্ঠান।

বিয়ে এবং বড়ি, শীতকাল হল এই দুইয়েরই মোক্ষম সময়। বড়ির স্বাদ এবং স্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনে শীতের হিম আর রোদের কোনও বিকল্প নেই। বিবর্তিত সময়, আধুনিক সমাজ অথবা নব প্রজন্ম বড়ি নিয়ে এত বাড়াবাড়ি করে না। তারা যা পায় তাই খায়। চালের বড়ি নাকি ডালের, এ নিয়ে আলাদা করে ভাববার সময় নেই কারও। তাহলে খুঁজলে এখনও খাঁটি বড়ির সন্ধান কি মেলে না? মেলে। আমরা এখন ভেজালে অভ্যস্ত। তবে মন্দের ভালো হল, খাঁটি-ভেজাল মিলিয়ে মিশিয়ে বাঙালি মানসে এখনও বড়ির চাহিদা রয়ে গেছে। শহর ছেড়ে একটু ভিতরে, মাটির কাছাকাছি থাকা মফস্‌সল আর গ্রামে এখনও প্রাক শীতকালে মহিলারা ডাল ফেনাতে শুরু করেন। অগ্রহায়ণ এলেই বড়ি দেওয়ার কাজ শুরু হয়ে যায়। আর এই মরসুমেই ‘বড়ির বিয়ে’ হয়।

বড়ির বিয়ের ধরণ অনেকটা পুতুল খেলার মতো। বড়ি দিয়ে তৈরি হয় বর-বৌ। দুব্বো দিয়ে বানানো হয় বরের টোপর। তুলসিপাতায় বৌয়ের ঘোমটা হয়। সিঁদুর দিয়ে সাজানো হয় কনে বড়িকে। বর-কনের পাশে আরও ছোটো ছোটো বড়ি থাকে, তারা হল বর ও কনেযাত্রী। বর ও বৌ বড়ির আকার অবশ্য অন্য সবগুলির চেয়ে বড়ো। তারিখ, তিথি, নক্ষত্র পাল্টালেও বড়ির বিয়ের দিনের কিন্তু বদল হয় না। পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদলে এখনও চালু সেই প্রথা। সেখানকার প্রথা অনুযায়ী প্রতি বছর অগ্রহায়ণের প্রথম বৃহস্পতিবার হল সেই দিনটি।  

বড়ির বিয়ে দেওয়া হয় কেন, মহিষাদল রাজবংশের স্বর্ণকার মল্লিক পরিবারের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা। রাজবাড়ির গৃহকত্রীর কথায়, বিয়ের পর এ বাড়িতে আসার পর থেকে এই অনুষ্ঠান দেখে আসছেন তিনি। আগে তাঁর শাশুড়ি বড়ির বিয়ে দিতেন। সেই প্রথা মেনে এখন তিনি দেন। বড়ির বর, কনে তৈরি করার জন্য নতুন বিউলি ডাল প্রথমে বেটে ভালো করে ফেটিয়ে একটি পাথরের উপর বা পরিস্কার কোন জায়গায় বড়ি দেওয়াই নিয়ম। আসলে অগ্রহায়ণ থেকে তো বিয়ে, নবান্ন ইত্যাদি নানা অনুষ্ঠানের সূচনা। তাই হয়তো বড়ির বিয়ে দিয়ে বড়ি বানানোর শুভ কাজ শুরু করার প্রথা এটা। প্রচলিত ধারণা হল, বড়ির বিয়ে দিলে পরিবারের সবার কল্যাণ হবে। কেন, কবে, কে এই রীতি চালু করেছিলেন, তা জানেন না তিনি।

লোকসংস্কৃতি বিষয়ক এক গবেষকের কথায়, মহিষাদল বলে নয়, গোটা পূর্ব মেদিনীপুরেই অগ্রহায়ণের শুরু থেকে বিউলি ডালের বড়ি দেওয়া শুরু হয়। এখানকার গয়না বা নক্সা বড়ির মতো বড়ি অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। মনে হয়, বড়ির প্রতি ভালোবাসা থেকেই হয়তো মহিষাদলের মল্লিক পরিবারে দু'টি বড়ির মধ্যে বিয়ে দেওয়ার প্রচলন হয়।

তবে, মহিষাদল ছাড়াও বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বড়ির বিয়ে দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। বড়ির বিয়ে প্রথার ভিন্ন ভিন্ন নামও রয়েছে, কোথাও ‘বড়িহাত’ আবার কোথাও ‘বুড়োবুড়ির বিয়ে’। বাঁকুড়ার পাঁচাল গার্লস হাইস্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা কল্যানী বন্দ্যোপাধ্যায় বলছিলেন, “আমাদের বাড়িতে এই রীতি মানা হয়। এয়োস্ত্রীরা কাঁসার থালাতে বড়ি দেন। কুবের যেখানে পাতা হয়, অষ্টমঙ্গলা পর্যন্ত সেখানেই রাখা থাকে। কুবের মানে একটি পাই বা সের ভর্তি ধান আর একটা কাঁসার গ্লাসে সরষের তেল ও এক গ্লাস জল রাখা হয়। আর একটা প্রদীপ সবসময় জ্বালিয়ে রাখা হয়।”

আবার, নদিয়ার করিমপুরের বাসিন্দা শান্তনু বিশ্বাস-এর কথায়, “আমাদের নদিয়াতেও এর প্রচলন আছে। ছেলে বড়িকে লাল লঙ্কা আর মেয়ে বড়ির মাথায় বেগুনের ফুল দিয়ে সাজানো হয়। তারপর ধান, দুর্বা সহযোগে শঙ্খ ধ্বনি, উলু ধ্বনি দিয়ে বড়ির বিয়ে দেওয়া হয়।”

মোদ্দা কথা, স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী বড়ির বিবাহ-অনুষ্ঠানের বৈচিত্র দেখা যায় কিন্তু এই ঐতিহ্য এখনও টিকে আছে বাংলায়। বড়ি এমন একটা জিনিস ডাল-ঝোল-অম্বলের সঙ্গে যৌথতায় অথবা ভাত পাতে মুচমুচে ভাজা রূপে সে একাই একশো। তাই, সময় থাকলে বাড়িতেই বড়ি বানিয়ে নিন, ব্যস্ততা থাকলে কোয়ালিটি পরখ করে বাজার থেকে কিনে নিন। নিজে বড়ি খান, অন্যকে খাওয়ান। স্বাদহীন এই সময়ে এর চেয়ে সুস্বাদু আর কীই বা হতে পারে!

তথ্যসূত্রঃ বাংলার লোকশিল্প, কাবেরী দাস মহাপাত্র, এই সময়

ছবিঃ বাংলার লোকশিল্প ফেসবুক গ্রুপ থেকে সংগৃহীত

Developed by DXDasia