গ্রাম-বাংলার প্রায় হারিয়ে যাওয়া শীতকালীন উৎসব ‘বড়ি হাত’

ফুল বড়ি, গয়না বড়ি, ঝোলের বড়ি, বাতাসা বড়ি – বাংলার বড়ি হরেকরকম

গ্রহায়ণ মাসে গ্রাম-বাংলায় নতুন ফসল ফলানো হয়। নব অর্থাৎ নতুন অন্ন গ্রহণে ও রকমারি খাবারের আনন্দে এই নবান্ন উৎসবে গ্রাম বাংলার মানুষ মেতে ওঠে। নবান্নে গ্রাম বাংলার রকমারি খাবারের পদ থাকে। এর মধ্যে একটি হল বড়ি। সম্ভবত সংস্কৃত শব্দ ‘বটীকা’ থেকে ‘বড়ি’ কথাটি এসছে। যার অভিধানগত অর্থ পিষ্ট দাউল ও মশলা সংযোগে প্রস্তুত ছোটো বড়ো বটিকাকার খাদ্য। রান্নার বিভিন্ন পদে বড়ি ব্যবহার করা হয়। যেমন বড়ি ভাজা, তরকারি, ঝোলেও বড়ি দেওয়ার রীতি আছে। আবার পাঁচমিশালি তরকারি বা তেঁতুলের টকেও বড়ির বিকল্প নেই। সাধারণত নবান্নের আগেই মা, কাকিমা, দিদিমারা ডাল বা কলাইকে শিলে ভালো করে বেঁটে বড়ি দেওয়া শুরু করেন। গোটা শীতকাল জুড়ে শীতের মিষ্টি রোদে পিঠ লাগিয়ে চলে বড়ি দেওয়া। যদিও এখন এই বড়ি দেওয়ার রেওয়াজ অনেকটাই কমে গিয়েছে। বাজারে প্যাকেটজাত রকমারি বড়ি পাওয়া যায়। আগে গ্রাম বাংলার প্রায় প্রতিটি বড়িতেই মা, কাকিমা, ঠাকুমারা শীতকালে রোদে বসে, গল্পের আসরে আড্ডা জমিয়ে বড়ি দিতেন। বাড়ির ছাদে গোটা শীতকাল জুড়ে বড়ি শুকানো হতো। সময়ের সঙ্গে এখন এই সব অনেকটাই কমে গিয়েছে।

আগে গ্রাম বাংলার প্রায় প্রতিটি বড়িতেই মা, কাকিমা, ঠাকুমারা শীতকালে রোদে বসে, গল্পের আসরে আড্ডা জমিয়ে বড়ি দিতেন। বাড়ির ছাদে গোটা শীতকাল জুড়ে বড়ি শুকানো হতো। সময়ের সঙ্গে এখন এই সব অনেকটাই কমে গিয়েছে।

আবার খাবারের বিভিন্ন পদ অনুযায়ী বড়ির আকার ও ডাল বা কলাই-এর ভিন্ন বড়ি হয়ে থাকে। সাধারণত অনেক রকমের বড়ি হয় যেমন, ‘ফুল বড়ি’ বা ‘ভাজা বড়ি’। এই বড়ি ছোটো ছোটো হয়। মুসুর ডালের সঙ্গে পোস্ত, কালোজিরে দিয়ে তৈরি করা হয়। ‘নকশা বড়ি’ বা ‘গয়না বড়ি’ মেদিনীপুরের একটি পুরোনো শিল্প ও ঐতিহ্য। বোঝা যায় ‘গয়না বড়ি’ নামটি এসেছে গয়না বা অলংকার থেকে, মহিলাদের অলংকারের নকশা অনুকরণ করে এই বড়ি দেওয়া হয় খাবারের থালাটিকে আরো দৃষ্টি নন্দন করে তুলতে। মাদুরের ওপর এই বড়ি দিতে দেখা যায়। প্রথমে পোস্ত ছড়িয়ে দেওয়া হয়, বর্তমানে পোস্তর দাম বেশি হবার কারণে কেউ কেউ সাদা তিলকে ভেজে গুঁড়ো করে ছড়িয়ে দিয়ে থাকে। তারপর ওই পোস্ত বা তিলের ওপর বিভিন্ন নকশা বা অলংকরণ করে এই বড়ি দেওয়া হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এই বড়ি দেখে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, “ইহার শিল্প নৈপুণ্য বিস্ময়জনক”।

 

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর কারুকার্য দেখে নাম দিয়েছিলেন ‘নকশি বড়ি’। এর রূপ এবং অলংকরণ সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। বাংলার খাদ্য সংস্কৃতির একটি নান্দনিক অঙ্গ হল এই ‘গয়না বড়ি’। আর একটি হলো ‘ঝোলের বড়ি বা তরকারির বড়ি’। যা ভাজা বড়ির থেকে আয়তনে একটু বড়ো হয়। সাধারণত বিউলি ডালের হয়। কেউ আবার এর সঙ্গে পোস্ত, জিরে, হিং, মরিচ গুঁড়ো, নুন দিয়ে আরও সুস্বাদু করে তোলেন। এছাড়াও গ্রাম বাংলায় আরও রকমারি বড়ি দিতে দেখা যায়, স্থান ভেদে এর নামও আলাদা। যেমন- বাতাসা বড়ি, জিলাপি বড়ি, হিং-এর বড়ি, মশলা বড়ি, ছোলার ডাল, কলাইয়ের ডাল প্রায় সব ডালেরই বড়ি হয়ে থাকে।

  বড়ি তৈরি করার প্রণালী   ডাল বা কলাইকে ভালো করে খোসা ছাড়িয়ে ৫-৬ ঘণ্টা জলে ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর শিলে বা বর্তমানে মিক্সিতে ভালো করে বেঁটে নেওয়া হয়। পোস্ত, নুন, মশলা দিয়ে ১৫-২০ মিনিট ভালো করে হাতের সাহায্যে ফাটিয়ে নেওয়া হয়। যদি থালাতে বড়ি দেওয়া হয় সেক্ষেত্রে থালাটিতে ভালো করে সরষের তেল বুলিয়ে একটু গরম করে নেওয়া হয়, যাতে বড়ি শুকিয়ে গেলে থালাতে লেগে না যায়। অনেকে আবার কাপড়ের উপরও বড়ি দিয়ে থাকেন। এরপর হাতের মধ্যে ফেটানো ডাল নিয়ে এক একটি করে পাত্রের উপর লাইন দিয়ে বড়ি দেওয়া হয়ে থাকে। ৩/৪ দিন ভালো করে রোদে শুকানো করা হয়। আবার গয়না বড়ি মাদুর বা থালাতেও দেওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে থালা বা মাদুরের উপর ভালো করে পোস্ত বা সাদা তিল ছড়িয়ে দিয়ে তার উপর সুন্দর অলংকরণ করে এই বড়ি দেওয়া হয়। গয়না বড়ি দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘চং’ (উপরে গোল চাকতি লাগানো স্টিল বা পিতলের তৈরি ছোটো ফাঁপা নল) ব্যবহার করা হয়। মোটা কাপড়ও ব্যবহার করা যেতে পারে। কাপড়ের মধ্যে  ডাল বাটা নিয়ে চংটিকে হাতে লাগিয়ে এর মধ্যে দিয়ে ডাল বা কলাইয়ের দ্রবণটিকে বের করা হয়, এর জন্য সরু হয়ে দ্রবণটি চং-এর মধ্যে দিয়ে বের হয়, ফলে রকমারি নকশাটি করতে অনেক সুবিধা হয়।

  বড়ি হাত   গ্রামবাংলায় সাধারণত নবান্নের আগে বড়ি দেওয়া শুরু হয় এবং গোটা শীতকাল জুড়ে চলে বড়ি দেওয়া। এই সময় সারা বছরের জন্য বড়ি তৈরি করে ভালো করে রোদে শুকিয়ে কাচের বয়াম বা কৌটোর ভিতরে মজুত করে রাখা হয়। বড়ি দেওয়া শুরুর প্রথমদিনটিকে বলা হয় ‘বড়ি হাত’। এই ছোট্ট প্রথাটি গ্রাম-বাংলায় অনেক জায়গায় করা হয়ে থাকে। বোঝাই যাচ্ছে ‘বড়ি হাত’ মানে বড়ি দিতে শুরু করা। প্রথম বড়ি দুটি অন্য বড়ির থেকে আকারে একটু বড়ো করা হয়। এই বড়ি দুটির একটির নাম ‘বুড়ো’ আর একটির নাম ‘বুড়ি’। এরপর বড়ি দুটির ওপর দূর্বা ঘাস ও তুলসী পাতা দেওয়া হয় ও একটি বড়ির মাথায় সিঁদুর দেওয়া হয়ে থাকে (বুড়ি)। গ্রাম বাংলায় একেই চলতি কথায় ‘বড়ি হাত’ বলা হয়।

____

ছবি – নিজস্ব

Developed by DXDasia