জন্মশতবর্ষে চলচ্চিত্রের বিশ্বকর্মা বংশী চন্দ্রগুপ্ত
ছুটন্ত ট্রেনের ভিতর মুখোমুখি আলাপচারিতায় মগ্ন অদিতি আর অরিন্দম। স্বচ্ছ জানলায় বাইরে পাহাড়, মাঠ, গাছপালা পেরিয়ে যাচ্ছে সাঁইসাঁই করে ছুটে চলা ট্রেন। সেই গতি অতিক্রম করে যাচ্ছে তাদের পেশাদারি সম্পর্ক।
সত্যজিৎ-পরিচালিত ‘নায়ক’ সিনেমার সেই অবিস্মরণীয় শট! ঠাহর করা দুষ্কর যে, এই দৃশ্যের সেট ডিজাইনে ‘অপটিকাল ইলিউশন’ কাজে লাগানো হয়েছিল। ২০১৮ সালে একটি ইংরেজি দৈনিকের নিবন্ধে সন্দীপ রায় এ বিষয়ে বলেছিলেন, “যাঁরা নায়ক দেখেছেন তাঁদের মধ্যে অনেকেই ভাবেন ছবিতে আসল ট্রেন ব্যবহার করা হয়েছিল। আদপে তা হয়নি। সত্যিটা হল, ছবির জন্য ট্রেনের সেট বানিয়েছিলেন শিল্প-নির্দেশক বংশী চন্দ্রগুপ্ত। এবং এই অপটিকাল ইলিউশন-এর জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছিল তাঁকে।”

নায়ক ছবির সেই ট্রেনের দৃশ্য
কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন বলেই হয়তো তাঁর কাজ সারা পৃথিবীর চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আলোচ্য। আজ। দুঃখের বিষয় যতটা আলোচনা চলচ্চিত্রের শিল্প নির্দেশনা বিষয়ে হওয়া দরকার, তা এদেশে হয় না। তাই বংশী চন্দ্রগুপ্তও আড়ালে থেকে যান।
জন্ম ১৯২৪ সালে। শিয়ালকোটে। বিচারপতি বাবার পালিত পুত্র। দেশভাগের আগেই চন্দ্রগুপ্ত পরিবার কাশ্মীরে। শ্রীনগর কলেজ থেকে লেগে পড়লেন সুভো ঠাকুরের সঙ্গে। আঁকিয়ে হবেন। ভারতীয় চিত্রকলায় মোড় ঘোরানো সুভো ঠাকুরের ‘ক্যালকাটা গ্রুপ’-এর অন্যতম সদস্য। আঁকতেন সিনেমার ‘সিন’। শোনা যায়, সুভো ঠাকুরের সঙ্গেই কলকাতায় এসেছিলেন। তখনো তাঁর পরিকল্পনা ছিল চিত্রশিল্পী হবেন। কিন্তু শেষ অবধি চলে এলেন ফিল্মে।
চল্লিশের দশকের বাংলা ছবিতে বংশীর হাতেখড়ি। ছবি এঁকে সুনাম করতে পারেননি ঠিকই কিন্তু এই বংশী চন্দ্রগুপ্তের তৈরি সেট সারা পৃথিবীর সিনেমা-প্রেমীদের নজর কেড়েছিল। নবীন এই তরুণকেই জঁ রেনোয়া তাঁর ‘দ্য রিভার’ ছবির শিল্প নির্দেশনার জন্য বেছে নিয়েছিলেন। সত্যজিতের সঙ্গে আলাপ অবশ্য আরও আগেই। সত্যজিৎ রায়, বংশী চন্দ্রগুপ্ত আর সুব্রত মিত্র— এই তিন বিস্ময়কর প্রতিভার সম্মিলনই ‘পথের পাঁচালি’ তৈরি করে বাংলা তো বটেই, বদলে গেছিল ভারতীয় ছবির ইতিহাসও।

বংশী চন্দ্রগুপ্তের আঁকা ছবি (ছবি-ঋণ: জীবনস্মৃতি আর্কাইভ)
১৯৪৭ সালে সত্যজিৎ ও তাঁর বন্ধু চিদানন্দ দাশগুপ্ত মিলে তৈরি করেছিলেন ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি। সঙ্গে ছিলেন বংশী চন্দ্রগুপ্ত ও আর পি গুপ্ত। কলকাতায় আন্তর্জাতিক ছবি, বিশেষ করে ইউরোপীয় নিও-রিয়েলিস্ট সিনেমা দেখার পীঠস্থান হয়ে ওঠে এই প্রতিষ্ঠান। বাংলা ছবির বহু বিশিষ্ট পরিচালকই ছিলেন এই সংগঠনের সদস্য। ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির সদস্যরা মিলে ১৯৪৮ সালে ১০ মিনিটের একটা ছবি করেছিলেন—‘এ পারফেক্ট ডে’। একজন লোক সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত কীভাবে এক প্যাকেট সিগারেট শেষ করলেন, এই ছিল ছবির প্রেক্ষাপট। চিত্রনাট্য লিখেছিলেন সত্যজিৎ, ক্যামেরা অজয় কর, শিল্প নির্দেশনা বংশীচন্দ্র গুপ্ত, সংগীত জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র।
‘অপরাজিত’-তে কাশীর অপুদের বাড়ির অন্দরটা আবার ‘চারুলতা’ ও ‘গুপী গায়েন বাঘা বায়েন’ সিনেমায় আল্পনা বা রাজসভার মেঝে, দেয়াল জুড়ে প্লাস্টার অফ প্যারিস-এর কাজ বংশী চন্দ্রগুপ্ত তুলে ধরেছিলেন সেই প্রথম

ক্লদ রেনোয়ার সঙ্গে সত্যজিৎ ও বংশী চন্দ্রগুপ্ত
‘নায়ক’-এ একটা আস্ত ট্রেন তৈরি করা থেকে, তার অন্দরসজ্জা তৈরি বা ঐ একই ছবিতে টাকার খাদে তলিয়ে যাওয়ার সেট, অরিন্দম তথা উত্তমকুমারের বিখ্যাত হওয়ার আগের ঘরে থাকার ইন্টেরিওর ও পরের কাজ, ‘পথের পাঁচালি’ সিনেমায় হরিহর ও সর্বজয়ার ঘরের ইন্টেরিওর তৈরি- নতুন দরজাকে নিজের টেকনিক মিশিয়ে পুরোনো করা, জলসাঘর’-এ নাচঘর, ‘অপরাজিত’-তে কাশীর অপুদের বাড়ির অন্দরটা আবার ‘চারুলতা’ ও ‘গুপী গায়েন বাঘা বায়েন’ সিনেমায় আল্পনা বা রাজসভার মেঝে, দেয়াল জুড়ে প্লাস্টার অফ প্যারিস-এর কাজ বংশী চন্দ্রগুপ্ত তুলে ধরেছিলেন সেই প্রথম।
বংশী চন্দ্রগুপ্তকে সত্যজিৎ বলতেন, ‘বংশী ফিল্মের ফাঁকিটা শেখো..সবটা তো ক্যামেরা ধরবে না।’ শুনতেন না বংশী। গোটা ইউনিটে একমাত্র তিনি সত্যজিৎ-কে ‘মানিক’ এবং ‘তুমি’ বলতেন। গোটা সেট তাঁর নিখুঁত হওয়া চাই। অসাধারণ ডিটেলস-পরিবেশ-স্টাইলে বংশী ভারতীয় সিনেমায় ‘সেট’ তৈরির ভাবনা-রূপায়ণ-কে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গিয়েছেন। তাঁর কাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলো‘প্রপস’। মিড শটের ক্ষেত্রে যদি প্রপস ঠিক না হয়, তা হলে শিল্প নির্দেশনা ফ্লপ। সেই দিক থেকেও বংশী চন্দ্রগুপ্ত সব ছবিতে একশোয় একশো। কোনও সিনেমায় যাত্রীদের ব্যাগ, ছোটো ছোটো জিনিস, প্রত্যেকটা খুঁটিনাটি বংশী চন্দ্রগুপ্তের কাজকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিল।

হিন্দিতে সত্যজিৎ রায়ের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের সিনেমা ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’র সেট বানিয়েছিলেন বংশী, ছবিতে অবধের রাজা ওয়াজিদ আলী শাহ-এর সিংহাসন
‘না দেখলে যে দেখানো যায় না’— এই ভাবনা এই দর্শনকে পুঁজি করে প্রায় চার দশক ধরে তিনি কাজ করে গিয়েছিলেন। যখন ভারতীয় চলচ্চিত্রের দর্শকরা সিনেমার পর্দায় যা দেখছেন, তার রচনা অনেকটাই বাস্তব জগতের চেয়ে আলাদা, অর্থাৎ স্টুডিও কেন্দ্রিক আর্টিফিসিয়াল একটা পরিবেশ। এই রকম একটা সময়ে বংশী তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন বিশ্বাসযোগ্য এক জগৎ। তাঁর হাত ধরেই ভারতীয় সিনেমায় দৃশ্যপট রচনায় শুরু হয়েছিল বাস্তবধর্মী চলচ্চিত্র অবলোকনের নতুন দৃষ্টিকোন। এই কাজে সত্যজিৎ রায়, সুব্রত মিত্র, দুলাল দত্তের সঙ্গে হাতে হাত রেখে মিলিত ভাবে তিনিও কাজ করে চললেন। এখানে গোটা সৃষ্টিটাই মিলিত অংশগ্রহণের। কোনও একজন একক ব্যক্তির নয়।

কুমোরটুলিতে সত্যজিৎ রায় ও বংশী চন্দ্রগুপ্ত
একে একে মৃণাল সেন, তরুণ মজুমদার, নিত্যানন্দ দত্ত, হিন্দি ছবিতে রাজেন্দ্র ভাটিয়া, বাসু চট্টোপাধ্যায়, অবতার কাউল, রবীন্দ্র ধর্মরাজ, শ্যাম বেনেগল থেকে অপর্ণা সেন (ইংরেজি ভাষায় নির্মিত) প্রমুখ পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছিলেন ১৯৪৯ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত। এর মধ্যেই কয়েকটি তথ্যচিত্র পরিচালনাও করেছেন। মৃণাল সেনের ‘বাইশে শ্রাবণ’, ‘আকাশ কুসুম’, ‘পুনশ্চ’, ‘অবশেষে’, ‘প্রতিনিধি’, ‘কলকাতা ৭১’-এ। তরুণ মজুমদারের সঙ্গে করেছেন ‘পলাতক’ (যাত্রিক), ‘আলোর পিপাসা’, ‘একটুকু বাসা’, ‘বালিকা বধূ’। নিত্যানন্দ দত্ত’র সঙ্গে ‘বাক্স বদল’, ‘হঠাৎ দেখা’, বাসু চ্যাটার্জির সঙ্গে ‘পিয়া কা ঘর’, ‘উসপার’, রাজেন্দ্র ভাটিয়া ‘পরায়া ধন’, ‘সীমা’, ‘জঙ্গল মে মঙ্গল’, কুমার সাহানী’র ‘মায়া দর্পণ’, রবীন্দ্র ধর্মরাজের সঙ্গে ‘চক্র’, বি. আর. চোপরার সঙ্গে ‘পতি পত্নি অউর ও’, মুজফফর আলি’র ‘উমরাও জান আদা’, শ্যাম বেনেগলের ‘আরোহন’, অপর্ণা সেন ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’, ইত্যাদি আরও অনেক পরিচালকদের সঙ্গে বহু বাংলা, হিন্দি ভাষার কাহিনিচিত্র এবং তথ্যচিত্রে কাজ করেছেন। বংশী চন্দ্রগুপ্ত পরিচালিত তথ্যচিত্র- ‘গ্লিমসেস্ অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল’, ‘গঙ্গাসাগর’ ইত্যাদি।

মার্চেন্ট-আইভরি প্রডাকশনের জেমস আইভরি পরিচালিত হাল্লাবোল ওভার জর্জি অ্যান্ড বনি'স পিকচার (১৯৭৮) ছবির শিল্প নির্দেশনা করেন বংশী চন্দ্রগুপ্ত
১৯৮১। আমেরিকায় সত্যজিতের ছবির প্রদর্শনী। জোর করে মানিক নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর কালজয়ী সব ছবির কালজয়ী শিল্প নির্দেশক-বংশী-কে। প্রথম বিদেশ যাওয়া। বেড়াতে গেলেন লং আইল্যান্ড। ফিরবেন। ট্রেন ধরতে প্ল্যাটফর্মে ছুটলেন দুই বন্ধু, চিদানন্দ ও বংশী। হুমড়ি খেয়ে পড়লেন বংশী। সামান্য সময়। চিরঘুমে বংশী চন্দ্রগুপ্ত। ভয়ংকর হৃদরোগ। নির্বাক মানিক। সব সূচি বাতিল। ফিরে এলেন বংশীর নিথর দেহ নিয়ে। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ খবরও বেরিয়েছিল বড়ো করে। এ কথা অস্বীকার করা যাবে না, একশো বছরের আন্তর্জাতিক শিল্প নির্দেশনার ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে আছেন। থাকবেনও। সত্যজিৎ বলেছিলেন “…বংশী ছিল অদ্বিতীয় ”।
আজকাল শিল্প নির্দেশনা বা আর্ট ডিরেকশনের বদলে প্রোডাকশন ডিজ়াইন বলার চল হয়েছে। বলা যেতে পারে, শিল্প নির্দেশনায় বংশী চন্দ্রগুপ্তের দেখানো পথ ধরেই আমরা এগিয়ে চলেছি। বংশী চন্দ্রগুপ্তের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তাঁর সৃষ্টির ভুবনকে স্মরণ এবং চর্চা চলছে। ২০০৯ থেকে শুরু করে ২০১২ পর্যন্ত সময়কাল ধরে অতিদুষ্প্রাপ্য নথিপত্র জোগাড় এবং তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন বা বন্ধুত্ব ছিলো যেমন মৃণাল সেন, তরুণ মজুমদার, অপর্ণা সেন, সৌম্যেন্দু রায়, দুলাল দত্ত, পূর্ণেন্দু বসু, সুরেশ চন্দ্র চন্দ্র, কার্তিক বসুদের স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে একটি ৫০ মিনিটের তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন অরিন্দম সাহা সরদার। এর পাশাপাশি তাঁর জীবন ও সৃজন বিষয়ে জীবনস্মৃতি আর্কাইভে একটি বিভাগও গড়ে তুলেছেন তিনি। এই বিভাগে বংশী চন্দ্রগুপ্তের শিল্পনির্দেশনায় সমৃদ্ধ চলচ্চিত্রের একটা বড়ো ডিজিটাল সংগ্রহ যেমন রয়েছে, তেমনি তাঁকে নিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানা লেখা, সাক্ষাৎকার, আলোকচিত্র এবং তাঁর হাতে আঁকা ছবিরও সংগ্রহ করা হয়েছে।
__________
তথ্য ঋণ:
বংশী চন্দ্রগুপ্ত ফেসবুক আর্কাইভ পেজ
অরিন্দম সাহা সর্দার জীবনস্মৃতি আর্কাইভ
বঙ্গদর্শন আর্কাইভ (কথা ছিল, সত্যজিতের চিত্রনাট্যে ‘ঘরে-বাইরে’ পরিচালনা করবেন হরিসাধন দাশগুপ্ত : মৌনী মণ্ডল)
পীয়ূস সরকার
কামরুল হাসান