প্রায় ৬০ বছর ধরে নিজের বাড়িতেই তৈরি করছেন হাজার হাজার পাখি

অসিতবাবু বলেন, পাখি তোমার সাথী, একে মেরো না

বাড়িতে বসেই পাখি তৈরি করছেন ৭৫ বছর বয়সী এক ‘যুবক’। হ্যাঁ, যুবকই বটে। তিনি নিজেও হয়তো চান পাখি হতে। এই পাখি তৈরির নেশা সপ্তম শ্রেণি থেকেই। আজও চলছে। জীবনের একমাত্র সঙ্গী। এখনও রোজ স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নের আকাশে উড়ে বেড়ায় অজস্র পাখি। পাখি তৈরির স্বপ্ন সবসময় তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়। চান, জ্যান্ত না, চা-কাঠের তৈরি এই পাখিগুলি নিয়েই একটি প্রদর্শনী করবেন। মানুষের ভিড় সেখানে উপচে পড়বে। 

নাম অসিত কুমার ব্যানার্জী। বড়ো হওয়া ডুয়ার্সের নাগরাকাটা এলাকায়। বহু বছর স্কুল শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষকতার স্বীকৃতি হিসাবে ১৯৯০ সালে উপরাষ্ট্রপতি ডঃ শঙ্কর দয়াল শর্মা তাঁকে দিল্লিতে পুরস্কারও তুলে দিয়েছেন। অসিতবাবুর বাবা একটি চা বাগানে চাকরি করতেন। সেই সূত্রে চা বাগানের সঙ্গে তাঁর গভীর টান ছোটো থেকেই। চা বাগান কিংবা জঙ্গলে থাকতে থাকতেই হরেকরকম পাখি অসিতবাবুকে গ্রাস করেছিল। চা কাঠ সংগ্রহ করে তিনি কিশোর বয়সে নানারকম পাখি বানাতে শুরু করেন। সেই নেশা বড়ো হয়েও ছাড়তে পারেননি। নাগরাকাটার সেন্ট মেরিস স্কুলে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন তিনি। চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন ২০০৬ সালে। তবে স্কুলে ভূগোল পড়ানোর ফাঁকেও বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে নানারকম পাখির প্রদর্শনী করেছেন। নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে বিভিন্ন এলাকায় পাখি বিলি করেছেন।

বর্তমানে অসিতবাবু ডুয়ার্স ছেড়ে চলে এসেছেন শিলিগুড়ি শহরে। কিন্তু এখনও ডুয়ার্সের প্রকৃতি তাঁকে টানে। তবে এখন আর চা কাঠ তেমন পান না বলে শাল, সেগুন কাঠ সংগ্রহ করে পাখি তৈরি করেন। অসিতবাবু বলেন, ঈশ্বরের অপূর্ব সৃষ্টি এই পাখি। পৃথিবীজুড়ে কত রকমের পাখি রয়েছে। আর তাদের পাখনার বৈচিত্র্যময় রং, ঠোঁট ভাবতে গেলে অবাক লাগে। পাখি কিন্তু কারও ক্ষতিও করে না। অথচ আমরা অনেকেই পাখিদের ঢিল মারি। অসিতবাবু তাই একসময় ডুয়ার্সের স্কুলে স্কুলে প্রদর্শনী করে প্রচার করেছেন, পাখি তোমার সাথী, একে মেরো না।

শিলিগুড়ি সংহতি মোড়ে নিজের ফ্ল্যাটে খাট, আলমারি শো-কেসে সব কাঠের পাখি সাজিয়ে রেখেছেন তিনি। প্রতি মাসেই একটি-দু’টি করে পাখি তৈরি করেন। ভাঙা কাচের টুকরো, শিরীষ কাগজ, হাতুড়ি-পেরেক, করাত, ফুটো করার ড্রিল মেশিন নিয়ে বসে পড়েন পাখি নির্মাণের কাজে।

পাখি বানানো ছাড়াও তাঁর নেশা নাটকে অভিনয় করা। ডুয়ার্সে থাকার সময় ‘ডাইন’ নামের একটি নাটক তৈরি করেন আদিবাসীদের নিয়ে। সেই নাটকে বিভিন্ন জন্তু-জানোয়ারের ডাক নিজেরাই তৈরি করেছিলেন। তবে আদিবাসী সমাজে ডাইন নামক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কাজ করে অনেক হুমকিও পেয়েছিলেন অসিতবাবু। তাঁর সেই নাটকে অংশগ্রহণকারী আদিবাসী মেয়েদের বিয়ে হবে না বলেও ভয় দেখানো হয়েছিল। তারপরেও কিন্তু দমে যাননি তিনি।

*নিজস্ব চিত্র

 

 

Developed by DXDasia