মানুষ বিপদে পড়লে উদ্ধার কেন্দ্র হতে পারে, তবে পশুপাখিদের জন্য কেন হবে না?

শিলিগুড়ির আদর্শনগরের বণিক পরিবার অসাধ্যসাধন করলেন

মানুষ আজকাল বহু ক্ষেত্রে পরিবার বা সমাজে একসঙ্গে বসবাস করতে পারেন না, তাদের মধ্যে অল্পতেই বিরোধ তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু এমন বিস্ময়ও আছে যেখানে দিনের পর দিন গরু-ছাগল-ভেড়া-কুকুর-বিড়াল-চিল একসঙ্গে বাস করছে। শিলিগুড়ি পুরসভার চার নম্বর ওয়ার্ডের আদর্শনগর কলোনি এলাকায় এ এক বৈচিত্র্যময় পরিবেশ। এইসব পশুপাখিকে একটি উদ্ধার আশ্রমে রেখে স্থানীয় বণিক পরিবারের মধু বণিক থেকে শুরু করে অর্জুন বণিক, সানু বণিক এবং পরিবেশপ্রেমী শ্যামা চৌধুরী সকলের কাছে আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছেন।

 
চিলটি আর আকাশে উড়তে পারে না। কারণ কোনও এক দুর্ঘটনায় তার ডানাগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। সে এখন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। তার নাম রাখা হয়েছে চিলি। সকাল হলেই উদ্ধার আশ্রমের ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে সেই চিল। আবার সন্ধে হলেই আশ্রমের ঘরে ঢুকে যায়। কখনও আশ্রমে থাকা গরু সিমির পিঠে বা পায়ের কাছে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে নিশ্চিন্তে। গরুটির পিঠ চুলকে দেওয়া বা গরুটি তার জিহ্বা দিয়ে চিলিকে আদর করে দিচ্ছে এমন দৃশ্যও হামেশাই তাঁরা প্রত্যক্ষ করেন বলে বণিক পরিবারের যুবক সানু জানিয়েছেন।


এক পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে মহানন্দা নদী। তার পাশেই এই পশুপাখির উদ্ধার কেন্দ্র চলছে বণিক পরিবার ও স্থানীয় মানুষের সহায়তায়। পরিবেশবিদ ও পশুপ্রেমী শ্যামা চৌধুরী জানালেন, ২০০৮ সালে শুরু হয়েছিল এই উদ্ধার আশ্রম। এখন সেখানে সাতটা কুকুর, পনেরোটি ভেড়া, চারটে গরু, ছ’টি ছাগল, একটি বিড়াল এবং একটি চিল রয়েছে। অদ্ভুত সহাবস্থান এই প্রাণীদের। একসঙ্গে থাকতে থাকতে তাদের মধ্যে অন্যরকম প্রেমের বন্ধন তৈরি হয়েছে যা এই সমাজে প্রায় বিরল ঘটনা। যেমন সেখানকার মা ভেড়া বা মা ছাগলেরা একটু দূরে ঘাস খেতে গেলে তাদের সন্তানদের নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করে নেয় চাকা, ম্যাকদের মতো কুকুরেরা। ভেড়া বা ছাগলের সন্তানদের বাইরের কুকুরেরা আক্রমণ করতে গেলে প্রতিবাদে ঘেউ ঘেউ করে রুখে দাঁড়ায় চাকা, ম্যাকদের মতো কুকুরেরা।

উদ্ধার আশ্রমে এসব পশুপাখির আসার ঘটনা বেশ বেদনাদায়ক। যেমন ম্যামি। ম্যামি আসলে একটি ভেড়া। পাঁচ বছর আগে ম্যামি ছিল অন্তঃসত্ত্বা। শিলিগুড়ি শক্তিগড়ের ৬ নম্বর রোডে ম্যামিকে আক্রমণ করে কয়েকটি পথ কুকুর। ম্যামির ঘাড় থেকে মাংস খুবলে নেয় কুকুরেরা। ম্যামি রক্তাক্ত, মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে থাকে একটি নর্দমার মধ্যে। খবর পায় বণিক পরিবারের সদস্যরা। তারা ম্যামিকে উদ্ধার করে এনে ওই আশ্রমে স্থান দেন। তার চিকিৎসা শুরু হয়। ধীরে ধীরে ম্যামি সুস্থ হয় এবং সন্তান জন্ম দেয়। এখন সেখানে শূন্য থেকে ভেড়ার সংখ্যা ১৫। আবার এক পথ কুকুরের ছয় সন্তান মহানন্দায় ভেসে যাচ্ছিল। মা কুকুরটি নদীতে ভেসে যেতে থাকা তার সন্তানদের উদ্ধার করতে পারছিল না। নদীর পার ধরে ধরে ছুটতে থাকা মা কুকুরটি শুধু ঘেউ ঘেউ করে কাঁদতে থাকে। শেষে বণিক পরিবারের সদস্যরা খবর পেয়ে ভেসে যেতে থাকা চারটে কুকুর শাবককে ওই উদ্ধার আশ্রমে স্থান দেন। মা কুকুরটিও শাবকদের সঙ্গে সে আশ্রমে থেকে যায়। সানু বণিক জানালেন, এদের জন্য প্রতিদিন তাদের বাড়িতে পাঁচ কেজি চালের ভাত তৈরি হয়। মাংস প্রতিদিন আনা হয় ২০০ টাকার। বোনলেস চিকেন রান্না হয় ২৫০ গ্রাম। যারা নিরামিষ খায় তাদের জন্য আলাদা নিরামিষ রান্না হয়। 


শিলিগুড়ির কিছু মানুষ তাদের বাড়ির কুকুর-বিড়াল বৃদ্ধ হলে আজকাল এই উদ্ধার আশ্রমে রেখে যান। তারপর বণিক পরিবারের সদস্যরা তাদের সেবা করেন। এই সেবার একটাই বার্তা- ভালোবাসা। নিজেরা ব্যবসা-বানিজ্য বা চাকরি করে যে টাকা রোজগার করেন তার একটা অংশ এসব অসহায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন অবলাদের পিছনে তাদের ব্যয় হয়ে যায়। 

মহানন্দা নদী লাগোয়া বিপন্ন পশুপাখি উদ্ধার আশ্রমটি বহু মানুষের কাছে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে। স্থানীয় অনেকেই আশ্রমে যান, পশুপাখিদের দেখে আসেন। চঞ্চলা পোদ্দার বলেন, এই অবলারা কথা বলতে পারে না বলে কি আমরা এদের পাশে থাকব না? মানুষ বিপদে পড়লে যদি উদ্ধার কেন্দ্র হতে পারে তবে পশুপাখিদের জন্য কেন তা হবে না? বণিক পরিবারের সদস্য চঞ্চলাদেবী সকল পশুপাখির জন্য প্রতিদিন রান্না করেন। আর রান্না করতে তার এতটুকুও বিরক্তি নেই।
 

Developed by DXDasia