
অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোন্নয়ন দপ্তরের উদ্যোগ
বড়ো শিল্পপতিরা কারখানা গড়বার জন্য সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন রাজ্য শিল্প উন্নয়ন দপ্তর থেকে। পাশাপাশি গ্রাম এলাকার পিছিয়ে পড়া কৃষক বা অন্য ছেলেমেয়েরা যাতে সরকার থেকে সাহায্য নিয়ে ছোটো ছোটো শিল্প কারখানা গড়তে পারেন, তার প্রয়াস নিয়েছে রাজ্য অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোন্নয়ন দপ্তর। প্রথমে শিল্প-কারখানা না হলে কীভাবে কৃষকের পণ্য বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী কিনে নিতে পারে, তার ব্যবস্থাও করছে। অন্তত উত্তরবঙ্গে এমন কিছু সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য রয়েছে, যেগুলো সঠিক বিপণনের অভাবে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। সেগুলোকে নতুন দিশা দিতে এই দপ্তর নতুন উদ্দীপনায় কাজে নেমেছে। দপ্তরের উত্তরবঙ্গের যুগ্ম অধিকর্তা দীপঙ্কর চক্রবর্তী এমন খবরই জানাচ্ছেন।
উত্তর দিনাজপুর জেলায় বিশেষ ধরনের ফাইবারহীন আদা বহু বছর ধরে উৎপাদিত হয়। আবার সারা রাজ্যের মোট হলুদের চাহিদার সত্তর থেকে আশি ভাগ বহু বছর ধরে মিটিয়ে আসছে উত্তর দিনাজপুর। এই জেলায় মোট হলুদের শতকরা ৭৫ ভাগ উৎপাদন হয় গোয়ালপোখর ব্লকে। অন্যদিকে দার্জিলিং পাহাড়, বিশেষ করে কালিম্পং জেলা বড়ো এলাচ এবং ফুলঝাড়ু উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। সেই সব কৃষি পণ্য আরও কীভাবে সুন্দরভাবে বাজারজাত করা যায় তার কাজও শুরু হয়েছে সরকারি উৎসাহে।
ফুলঝাড়ু
কালিম্পংয়ের তোদেতাংদা এলাকায় বড়ো এলাচ গুঁড়ো করে শুকনো বা ড্রাই করতে যাতে সুবিধা হয়, তার জন্য কৃষকদের মেশিন দিয়েছে অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উন্নয়ন দপ্তর বা এমএসএমই। আগে এই বড়ো এলাচ তৈরির কাজে তাঁদের বড়ো ভাটি তৈরি করতো হোত। পরিশ্রমও বেশি হত, উৎপাদনও তেমন হত না। এখন মেশিনের সাহায্যে কাজ হতে থাকায় পরিশ্রম কমেছে, উৎপাদন বেড়েছে। আর তার গুণগত মান যেমন ভালো হচ্ছে, তেমনই দাম পাওয়া যাচ্ছে।
পাহাড়ে প্রচুর ঝাড়ুফুল বা ফুলঝাড়ু উৎপাদন হয়। সেসব ঝাড়ু পাহাড় থেকে শিলিগুড়ি গুরুং বস্তি এলাকায় এনে ড্রাই করা হত। তারপর সেগুলো বেঁধে মার্কেটিং করা হত। বহু ক্ষেত্রে দাম পেতেন না ঝাড়ু চাষিরা। দীপঙ্করবাবু জানাচ্ছেন, “আমাদের প্রচেষ্টার ফলে বড়ো বড়ো শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে সেই সব ঝাড়ু চাষিদের সংযোগ ঘটেছে। এতে তাঁদের ঝাড়ুগুলোর একটি বিপণন ব্যবস্থা হয়েছে”। কালিম্পংয়ের লিংসেগাও থেকে কৃষক আমলিসো দাওয়া জানালেন, তাঁদের ফুল ঝাড়ুর বিপণন করে দিতে এমএসএমই দপ্তর সহায়তা করেছে। এখন তাঁদের দরকার আরও মেশিনপত্র, আরও সরকারি সহায়তা, যাতে ঝাড়ুগুলো ড্রাই করার পর তা বেঁধে ফেলার কাজ আরও ভালো হয়। এই ঝাড়ু শিল্প থেকে পাহাড়ে আরও কর্মসংস্থান এবং রাজস্ব আসতে পারে বলেই তাঁর অভিমত। কিন্তু সরকারি তৎপরতা ব্যাপকভাবে না হলে এই শিল্প একসময় হারিয়ে যেতে পারে।
ফাইবারহীন আদা
উত্তর দিনাজপুর জেলা ফাইবারহীন আদা উৎপাদনে বিখ্যাত। কিন্তু গুণগত মান উন্নত হওয়ায় এই আদার দাম বেশি। অপরদিকে পাহাড়েও আদা উৎপাদন হয়। কিন্তু তার দাম একটু কম হওয়ায় চাহিদা বেশি। এতে উত্তর দিনাজপুর জেলার আদা উৎপাদন মুখ থুবড়ে পড়তে থাকে। রাজ্যের অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উন্নয়ন দপ্তর এই সব আদা চাষিদের জন্য কিছু পরিকল্পনা নিয়েছে। আদা পেস্টিং করে বৃহৎ শিল্প গোষ্ঠীকে দেওয়া হয়। তাতে চাহিদা তৈরি হয়। এবার সেখানকার আদা চাষিদের পেস্টিং করার মেশিন দেওয়া হবে। একইভাবে উত্তর দিনাজপুর জেলার হলুদ কীভাবে আরও ভালো করা যায় তার ভাবনাও শুরু হয়েছে। পাঞ্জিপাড়া থেকে আদা চাষি সুভাষ বিশ্বাস বলেন, “গোয়ালপোখর ব্লকের আদা গোটা বাংলায় একটি সম্ভাবনাময় চাষ। কিন্তু এই আদা হারিয়ে যাচ্ছে। তাই আদা থেকে পাউডার, লিক্যুইড তৈরির প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে”। শুধুমাত্র গোয়ালপোখর ব্লক এলাকাতেই প্রায় তিনশ চাষি বসবাস করেন। এমএসএমই দপ্তর তাঁদের উৎসাহ দিচ্ছে। প্রকল্প তাঁরা জমা দিয়েছেন। এখন অনুমোদনের অপেক্ষা। আদাকে ভিত্তি করে ছোটো ছোটো অনেক কারখানা হতে পারে।
উত্তরবঙ্গে ফুলঝাড়ু চাষ
দীপঙ্করবাবু জানান, তাঁরা গ্রামের মানুষ এবং কৃষকদের কথা চিন্তা করে রুরাল অন্ত্রপ্রনারশিপ হাব তৈরির কাজে নেমেছেন বিভিন্ন গ্রামে। এর পাশাপাশি শিল্প কারখানা এগিয়ে নিয়ে যেতে ক্লাস্টার তৈরি হচ্ছে। গড়ে উঠছে এগ্রো বিজনেস ক্লাস্টারও। তার বাইরে শিলিগুড়ি কাওয়াখালিতে চলছে বিশ্ব বাংলা শিল্পী হাট। হস্ত শিল্পের বিপণন হচ্ছে শিল্পী হাটে। এদিকে শিলিগুড়ি সেভক রোডে স্থানীয় শিল্প দপ্তরের সূত্রে জানানো হয়েছে, বাংলাশ্রী, কর্মসাথী, ওয়েস্টবেঙ্গল ইনসেন্টিভ স্কিমে বিভিন্ন মানুষ, বিশেষ করে বেকাররা স্বনির্ভরতার বিভিন্ন ঋণ সহায়তা পাচ্ছেন। কর্মসাথীতে বিগত চার মাসে ৭৫০টি ঋণ সহায়তার আবেদন জমা পড়ে। প্রায় সব আবেদনই মঞ্জুর হয়েছে।
