
পেশায় তিনি অটোচালক, নেশা কবিতা লেখা
পেশায় তিনি অটোচালক, নেশা কবিতা লেখা। পড়াশোনা মাত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। তাতে কী হয়েছে, লিখে চলেছেন একের পর এক তাক লাগানো কবিতা। সঙ্গে গানও। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই লিখেছেন ২৩টি কবিতা। আর বাংলা ভাষার জন্য প্রচার করে চলেছেন দিনরাত। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসেও তিনি অটো চালাতে চালাতে যাত্রীদের মধ্যে মাতৃভাষার প্রচারে কবিতা পাঠের কর্মসূচি নিয়েছেন। নিজের উদ্যোগে প্রকাশ করেছেন তাঁর কবিতার সংকলনের ওপর পত্রিকা ‘কবিতার ছন্দে’। সেটাও তিনি প্রচার করবেন মানুষের মধ্যে।
ব্যতিক্রমী এই অটো চালকের নাম গণেশ বিশ্বাস। বয়স ৫৬ বছর। বাড়ি শিলিগুড়ি মহকুমার শিবমন্দিরের শান্তিপুরে। সংসারে আর্থিক অভাবের কারনে পড়াশোনা বেশি দূর হয়নি। নেমে পড়তে হয় কাজে। একসময় টোটো চালাতেন। কিন্তু তখন কিছু লোকজন তাঁকে পিছন থেকে টিপ্পনি কাটত। টোটো যদি ভাঙা রাস্তার গর্তে পড়ত, তবে পিছন থেকে কেউ কেউ তাঁকে খোঁচা দিয়েই উত্যক্ত করত “আহা”, “উঁহু” বলে। তাঁর মন খারাপ হত। শেষে টোটো চালানো ছেড়েই দেন। মনের দুঃখ প্রকাশ করতে কবিতা লিখবেন বলে স্থির করেন। দু-একটি কবিতা লিখেও ফেলেন। আশপাশের বিদ্বজ্জনদের দেখান, কবিতা লেখা ঠিক হয়েছে কিনা। সবাই তাঁকে উৎসাহিত করেন। এরপর তিনি সময় পেলেই কবিতা লিখতে থাকেন। কিন্তু এতে মনের খিদে মিটলেও পেট তো চলবে না। পরিবারে স্ত্রী-কন্যা রয়েছে। তাই ঋণ নিয়ে কিনে ফেলেন অটো। সেই অটোই আজ তাঁর পেশা। কিন্তু কবিতার নেশা ছাড়েননি। যখন যাত্রীর জন্য স্ট্যান্ডে অপেক্ষা করেন, অটোর মধ্যেই বসে যান খাতা-কলম নিয়ে। একের পর কবিতা তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে আসে ওই সময়ে। আবার যাত্রীরা অটোয় চাপলে কবিতা পড়ে তাঁদের শোনান, বলেন, “বাংলা ভাষার চর্চা দিকে দিকে প্রসারিত হোক।”
অবসর সময়ে অটোর মধ্যেই একের পর কবিতা লেখেন
বাংলা ভাষা নিয়ে তাঁর অনেক কবিতা রয়েছে। যেমন ‘গর্বের বাঙালি আমরা’তে লিখেছেন, “বাংলা ভাষাকে জানাই শ্রদ্ধা / বাংলা মোদের মাতৃভাষা / বাংলায় গ্রন্থ বিশ্বকবির লেখা /বাংলা তোমাকে প্রণাম/ বঙ্গভূমি ধন্য তোমাদের জন্য”। আবার তিনি কবিতায় লিখেছেন, “আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি/ আমরা বাংলায় বই পড়ি/ আমরা বাংলায় লেখালেখি করি/ এই বাংলা ভাষা রক্ষার্থে / দিয়েছিলেন আত্মবলিদান / কতশত বাঙালি ভাইবোন আমার/ ২১শের শহিদ দিবসে এসে/ করছি আমরা অঙ্গীকার /বাংলা তোমাকে ভুলব না আমরা/ বাংলা তোমাকে প্রণাম /বাংলা তোমাকে প্রণাম”। ‘বাংলা ভাষার পোস্টমর্টেম’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, “দেশ ও মাতৃভাষায় গর্ব আমার / ধন্য আমি এই বাংলায় জন্ম/ বাঙালি মনীষী ভিটার জন্য / মহান বিপ্লবী সুভাষ নেতাজি/ বাংলার বিদ্রোহী কবি নজরুল / স্বাধীনতার গান গায় গুনগুন/ সেই ভাষা বাংলা আজ দূর ছাই ছাই/ কষ্ট লাগে বাংলার পোস্টমর্টেম দেখে”।
নিজের উদ্যোগে প্রকাশ করেছেন তাঁর কবিতার সংকলনের ওপর পত্রিকা
আরও পড়ুন: মাছেদের বন্ধু মনোজ সরকার
এভাবে দেড়শোর বেশি কবিতা লিখেছেন তিনি। আবার বন্ধ চা বাগান নিয়ে গল্পও লিখেছেন। লিখেছেন কয়েকটি গান। তিনি বলেন, “বাংলা আমার মাতৃভাষা। এই ভাষার প্রচারের জন্য বাংলায় বসবাসকারী সব মানুষকে কাজে নামা দরকার।” গণেশ বিশ্বাসের এই কবিতা লেখার প্রয়াস এবং বাংলা ভাষা চর্চার প্রচারকে তারিফ করেন আন্তর্জাতিক বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি সমিতির শিলিগুড়ি শাখার সম্পাদক সজলকুমার গুহ এবং অন্যতম কর্মকর্তা অনিল সাহা। সজলকুমার গুহ বলেন, “বাংলা পৃথিবীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। বাংলা ভাষার জন্য প্রতিটি ভারতবাসীরও গর্ব করা দরকার। কিন্তু ভারত সরকার এই ভাষাকে আজও ধ্রুপদী ভাষার সম্মান দেয়নি। এরমধ্যেই গণেশ বিশ্বাসদের মতো সামান্য অটো চালক বিশেষ পড়াশোনা না করেও যেভাবে বাংলা ভাষার জন্য প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন, তাকে অবশ্যই কুর্নিশ জানাতে হয়।”

