
মুখোশ গড়ার সময় নিয়ম ভাঙলে নাকি মৃত্যু নিশ্চিত শিল্পীর
দিনাজপুর মুখোশের দেশ। মুখোশকে স্থানীয় ভাষায় বলে ‘মোখা’। এই মুখোশ তৈরি রীতিমতো পবিত্র ব্যাপার দিনাজপুরের শিল্পীদের কাছে। স্নান সেরে শুদ্ধশুচি হয়ে কাচা কাপড় পরে বসতে হয় মুখোশ তৈরিতে। মুখোশ গড়ার প্রথম দিনে মাছ, মাংস, ডিম ছুঁয়েও দেখেন না তাঁরা। এছাড়া আরও কিছু সংযম পালন করতেই হয়। মদ্যপান এই কদিন নৈব নৈব চ। মুখোশশিল্পীদের স্থির বিশ্বাস, নিয়ম বা আচার অমান্য করলে শিল্পীর মৃত্যু অবধারিত। অনেকে মিলে নিয়ম না মানলে বড় কোনও দুর্যোগ নেমে আসবে সবার ওপরে। তাতে ক্ষতি হবে এমনকি নির্দোষদেরও। এমন ঘটেছে নাকি? প্রশ্ন করলে হাঁ হাঁ করে ওঠেন দুই দিনাজপুরের ইটাহার, হেমতাবাদ, কুশমুণ্ডি, গঙ্গারামপুরের শিল্পীরা। “কত্তো ঘটেছে এমন। এই তো প্রশান্ত রায় মারা গেল বাজ পড়ে। মোখা বানাতে গিয়ে প্রথমদিনেই মাংস ও বাজে নেশা করেছিল।” কথায় কথায় আরও কত গল্প বেরিয়ে আসে। কেউ মারা গেছে নিয়ম ভাঙার দু মাস পরে, কেউ বা হয়ত বছর দুয়েক পরে। বছর পাঁচ-সাত পরেও মারা গেছে কেউ কেউ। প্রায়শ্চিত্ত করেও লাভ হয়নি। অনেকসময় ‘পাপ’ লাগছে না ভেবে ফের নিয়ম ভেঙেছে কেউ। আর বাঁচে!
বলতে বলতে ভয়ে মাথায় হাত ঠেকান রবি, শ্যামল, জয়ন্তরা। কেউই ইস্কুলের গণ্ডি পেরোননি সেভাবে। ‘টাকা কই যে পড়ব?’ মোখা তৈরি করে ক’টাকাই বা আয়। নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। তাই মুখোশ বানানোর ফাঁকে ফাঁকেই কেউ ঠেলা, রিকশা টানে, কেউ কাজ করে ইটভাঁটায়। শহুরে মানুষ এঁদের দুনিয়ায় পা রাখলে খানিক থতমত খাবেনই। এ এক অদ্ভুত বিশ্বাসের জগৎ। ভয়-অন্ধ বিশ্বাস-শিকড় গাঁথা সংস্কৃতি-আচার… এসবের মধ্যেই বোনা আছে এই ভূখণ্ডের পরম্পরার ইতিহাস। আমাদের সাধ্য কী, এত সহজে তাকে ছোঁয়!

শাস্ত্রীয় পুরাণ থেকে লৌকিক ধর্মবিশ্বাসের কোলাজ এইসব মোখাতে ধরা। দিনাজপুরে কত পরব, অনুষ্ঠান। স্থানীয় জনজাতির শিকড়ের ছাপ তাতে লেপ্টে। সঙ্গে মিশেছে ব্রাহ্মণ্য রীতির রেশ, বঙ্গ-সংস্কৃতির অন্যান্য রঙও। মুখোশ কেমনভাবে উঠে এসেছে এইসব পরবের মুখেও। গমীরা, চোরচুরুনির গান, জিতুয়া পুজোর নাচ, লক্ষ্মীয়ালার নাচ, ব-খেলার গান, হালুয়া-হালুয়ানি পালা, চণ্ডী মনসার গান, ‘খন’ গান—এইসব পরবে মোখা না থাকলে চলবেই না।
এই মোখানাচ বেশ প্রাচীন। বাংলার মধ্যযুগের কাব্যগুলি তার প্রমাণ। দিনাজপুরের কবি তন্ত্রবিভূতির ‘মনসাপুরাণ’, জগজ্জীবন ঘোষালের ‘মনসামঙ্গল’, মানিক দত্তের ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কিংবা রামাই পণ্ডিতের ‘শূন্যপুরাণ’-এর মতো গ্রন্থগুলিতে দিনাজপুরের গমীরার উল্লেখ আছে। তবে, এই মোখানাচের ইতিহাস আরো পুরনো। দিনাজপুরের সাবেককালের রঙ এতে লেগে। যেমন ধরা যাক গমীরার পরব। চৈত্র সংক্রান্তিতে শুরু হয়ে পরব গড়ায় আষাঢ়ে অম্বুবাচী পর্যন্ত। ‘গম্ভীরার নাচ’ লোকমুখে ‘গমীরার নাচ’ হয়েছে। শুধু নাম না, বদলেছে পরবের ধরনও। দিনাজপুরের গমীরা মালদহের গম্ভীরার মতো শিবপ্রধান নয়। এখানে বরং উড়ানকালীই প্রধান, স্থানীয় নাম ‘শিকনিচাল’। তাছাড়া, দিনাজপুরের গমীরা কেবলই নাচপ্রধান। এর সঙ্গে গানের সম্পর্ক নেই। এই নাচ কল্যাণ-কামনাধর্মী, অশুভ শক্তির বিনাশ করে শুভ শক্তি প্রতিষ্ঠার। মহাভারত, রামায়ণ, নানা পুরাণ কাহিনি ও স্থানীয় নানা মিথের মিলমিশে এই নাচের গড়ন। ‘ফুলঝারি’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পরবের শুরু। তখন বাঘ, ভাল্লুক, বুড়াবুড়ির মোখা পরে দলে দলে সেবকের দল বাড়ি বাড়ি ঘুরে ‘মাঙ্গন’ বা সিধা তোলে। এভাবে এগারো-বারো দিন সিধা তোলার শেষে গমীরাতলায় জড়ো হয় সবাই। তখনই উড়ানকালী, মশানকালী, ডাকিনীকালী, দুয়ার-কুয়ারি, চ্যাংকালী, দানো, বুড়াবুড়ি, খর-দূষণ, ভদ্রকালী, জটাপাখি, শিকনিল, স্বর্গপেইরি প্রভৃতি মুখোশগুলিতে মন্ত্রপূত জল ছিটিয়ে প্রাণদান করেন রাজবংশীয় পুরোহিত বা দেবাংশীরা।
এরপর শুরু হয় গমীরার মোখা-নাচ। বিভিন্ন চরিত্রের মুখোশ পরে নাচেন নৃত্যশিল্পীরা। পিছনে বাজনা বাজে। শুধু গমীরা নয়, এখানকার লৌকিক ও সামাজিক অন্যান্য নানা পরবেও মোখানাচের দেখা মেলে। এবং সেখানে নাচের সঙ্গে মেশে গানও। যেমন, ‘চোরচুয়ানির গানে’ পেয়াদা, কারকুন ও ভাল্লুকের মুখোশ পরা মোখা নাচ। সামন্ততান্ত্রিক সমাজের নানা অত্যাচারের রূপকল্প এতে এখনও জড়িয়ে-লেপ্টে আছে। ‘ব-খেলার গান’-এর মোখার নাচও বিখ্যাত। ‘ব’ অর্থে ব্রত। শ্রাবণ সংক্রান্তি থেকে ভাদ্র মাসের প্রথমদিন পর্যন্ত যে বিষহরা ব্রত পালিত হয় এখানে, সেই উপলক্ষেই এই পরব। ছেলেরা রঙ মেখে সং সেজে বাঘ ও ভালুকের মুখোশ পরে লম্ফঝম্প করে। দেখে হেসে কুটোকুটি যায় বাড়ির বউ-মেয়ে থেকে চুলে পাক ধরা ‘বুড়া’ও। হালুয়া-হালুয়ানির পালায় আবার গাই ও বলদের মোখা পরে আসরে নামেন নৃত্যশিল্পীরা। সেও দেখার মতো জিনিস বটে।

দিনাজপুরের এই মুখোশশিল্পের সঙ্গে জড়িত মূলত স্থানীয় দেশি পলি ও রাজবংশীরা। মোখা তৈরিতে চৈতন (ছাতিম), আম, গামারি, পাকুড়, নিম প্রভৃতি কাঠের ঠুং বা খুটা লাগে। কুঁদে কুঁদে যত্ন করে চোখ, নাক, মুখ আঁকা হয়। তারপর পালিশ, রঙ। রঙ বলতে হাঁড়ির কালি, সিঁদুর, চুন, সাদা খড়িমাটি, জিগাও বসতবৈর গাছের ছাল ভিজিয়ে তৈড়ি লাল রঙ। এরপর তেঁতুল বীজ গুঁড়ো করে ফের পালিশ।
সময় গড়াতে গড়াতে এগোচ্ছে আরও আধুনিক হবে বলে। বিশ্বায়িত, ফোর জি-র দুনিয়ায় কীভাবে যেন এখনও টিকে আছে এই মোখা নাচ। জীবন মানেই যেসব বাংলা সিরিয়ালের সন্ধান মেলে টিভি খুললে, পরবের সময় সেগুলি ছেড়েও মোখা নাচ দেখতে এখনও ভিড় করেন মানুষ। আনন্দে হাততালি দিয়ে ওঠেন, চোখে এখনও লাগে মুগ্ধতার রেশ। নিজের শিকড়ের প্রতি এই মুগ্ধতাই বাঁচিয়ে রাখে কোনও জাতিকে, তার ইতিহাসকে। দিনাজপুরের ইতিহাস নিজের মুখ দেখছে এই মোখায়।
