জানাচ্ছে এনসিআরবি-র রিপোর্ট
সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশে একের পর এক অপরাধের ঘটনায় উত্তাল গোটা দেশ। গত বছর এক নৃশংস গণধর্ষণ এবং হত্যার জেরে খবরের শিরোনামে উঠে এসেছিল হাথরাস। কংগ্রেস মুখপাত্র রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা মন্তব্য করেছিলেন, “উত্তরপ্রদেশকে দিন দিন অপরাধপ্রদেশ বানিয়ে ফেলা হচ্ছে।” কয়েকদিন আগে সেই হাথরাসেই যৌন নির্যাতনে অভিযুক্ত এক আসামি জামিনে ছাড়া পেয়ে গুলি করে খুন করল নির্যাতিতার বাবাকে। গতকাল হারদোই জেলায় পান্দেতারা গ্রামে নিজের মেয়ের মাথা কেটে হাতে ঝুলিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলেন সরভেশ কুমার নামের একজন। ২০২০ সালে মহিলাদের ওপর অপরাধের নিরিখে সারা দেশের শীর্ষে ছিল উত্তরপ্রদেশ।
ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্যে যখন এই পরিস্থিতি, সবচেয়ে বেশি জনঘনত্বের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে আইন-শৃঙ্খলার ছবি কিন্তু একেবারেই ভিন্ন। জাতীয় মহিলা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী গত বছর মহিলাদের ওপর অপরাধের তালিকায় আমাদের রাজ্য ছিল অনেক পিছনে – দশম স্থানে। কয়েক বছর ধরে নিরাপত্তার জন্য সারা দেশে তারিফ অর্জন করছে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা।
আরও পড়ুন: ব্রিগেডের জনতরঙ্গ
ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো বা এনসিআরবি-র ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০ লক্ষ বা তার বেশি জনসংখ্যাবহুল শহরের মধ্যে কলকাতাতেই অপরাধের হার সবচাইতে কম। গোটা দেশের বড়ো শহরগুলিতে গড় অপরাধের হার যেখানে ৪৬২.২, সেখানে কলকাতার অপরাধের হার মাত্র ১৪১.২ (প্রতি এক লক্ষ জনসংখ্যায়)। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে কলকাতার থানাগুলিতে জমা পরা অভিযোগের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে ৩১.৩ শতাংশ। ২০১৭-তে কলকাতায় জমা পড়া অভিযোগের সংখ্যা ১৯,৯২৫। এর মধ্যে ধর্ষণের অভিযোগ জমা পড়েছে ১৫টি। দিল্লিতে সেখানে ২০১৭-তে ধর্ষণের অভিযোগ জমা পড়েছে ১,১৭০টি।
২০১৮ সালেও দেশের সবচেয়ে নিরাপদ শহরের শিরোপা ধরে রাখে আমাদের মহানগর। অপরাধের হার ছিল ১৫২.২। যেখানে দিল্লিতে ১৪৫৬.৭ এবং মুম্বাইতে ৩০৯.৯। দিল্লিতে খুনের ঘটনা ঘটেছে ৪১৬টি। কলকাতার ক্ষেত্রে সংখ্যাটা ৫৫। বেঙ্গালুরুতে সারা বছরে ৬২৫টি খুনের প্রচেষ্টার মতো ঘটনা ঘটেছে, যা সবথেকে বেশি। সেখানে কলকাতায় ১৪৩। মহিলাদের শ্লীলতাহানি সবচেয়ে বেশি হয়েছে মুম্বই শহরে। যার অভিযোগ নথিবদ্ধ হয়েছে ১০৬৯টি। আমাদের কলকাতায় ১৫১টি এমন ঘটনার অভিযোগ দায়ের হয়েছে।
এনসিআরবি-র দেওয়া ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান থেকে উঠে আসে, মেয়েদের জন্য দেশের সবচেয়ে নিরাপদ শহর কলকাতা। ভারতের ১৯টি মেট্রো শহরের মধ্যে কলকাতায় মহিলা হেনস্থার সংখ্যা অনেকটাই কম। ২০১৯ সালে আমাদের মহানগরে মাত্র ১৪টি হেনস্থার অভিযোগ জমা পড়েছে। ধর্ষণের কোনও ঘটনা ঘটেইনি। নাবালিকা ও শিশু কন্যা নির্যাতনের ঘটনাও অনেক কম। মহিলা নির্যাতনের যেক’টি অভিযোগ পাওয়া গেছে, তাঁদের প্রত্যেকেরই বয়স ১৮ বছরের ওপরে। সেদিক থেকে তিলোত্তমা একেবারে নিরাপদতম শহরের শীর্ষতালিকায় উঠে এসেছে।
যেভাবে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দিয়ে নজির গড়েছে মহানগর, তা অবশ্যই কলকাতা পুলিশের কৃতিত্ব। অপরাধ দমনে একের পর এক অত্যাধুনিক পদক্ষেপ নিয়ে চলেছেন তাঁরা। গত দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে মহিলাদের আত্মরক্ষার প্রাথমিক পাঠ দিচ্ছে কলকাতা পুলিশ। যে উদ্যোগের নাম ‘তেজস্বিনী’। আয়োজন করা হয়েছে একের পর এক প্রশিক্ষণ শিবির। সেখানে মহিলারা যোগ দিতে পারেন বিনামূল্যে। কলকাতার নিরাপত্তা রক্ষায় পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসনের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। সাধুবাদ জানাতে হয় শহরের বাসিন্দাদেরও। অপরাধের হার কমাতে সহায়ক হয়েছে তাঁদের সচেতনতা।
