পশ্চিমবঙ্গ চারুকলা উৎসব ২০২২-২৩ : রাজ্যের প্রাণকেন্দ্রে শিল্পী ও শিল্পের মিলনোৎসব

সপ্তাহ ব্যাপী মেলা ও প্রদর্শনীর মাধ্যমে উদযাপিত হল বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পকলা

মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের (West Bengal Information and Culture Department) রাজ্য চারুকলা পর্ষদের আয়োজনে, ২২ থেকে ২৮ নভেম্বর রবীন্দ্রসদন (Rabindra Sadan), নন্দন (Nandan) সংলগ্ন প্রাঙ্গন, একাডেমী অফ ফাইন আর্টস, একতারা মুক্তমঞ্চ (Ektara Muktamancha) ও গগনেন্দ্র প্রদর্শশালা (Gaganendra Pradarshashala) জুড়ে হয়ে গেল বর্ণাঢ্য চারুকলা উৎসব (Charukala Utsav)। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য চারুকলা পর্ষদের সভাপতি তথা শিল্পী যোগেন চৌধুরী (Jogen Chowdhury), সহ-সভাপতি শিল্পী শুভাপ্রসন্ন (Shubhaprasanna), পশ্চিমবঙ্গ তথ্য ও সংস্কৃতি এবং কারিগরী শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বিভাগের মন্ত্রী শ্রী ইন্দ্রনীল সেন (Indranil Sen), কলকাতার মহানাগরিক এবং নগরোন্নয়ণ ও পৌর বিষয়ক বিভাগের মন্ত্রী জনাব ফিরহাদ হাকিম (Firhad Hakim) প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তি। তাঁরা সহ ৫০ জনের বেশি শিল্পী একসঙ্গে ছবি এঁকে প্রতি বছরের মতো এবছরও চারুকলা উৎসবের শুভসূচনা করেন। গতকাল (২৮ নভেম্বর) ছিল উৎসবের শেষ দিন।

এবছরও চারুকলা মেলায় বসছিল বাংলার নানা গোষ্ঠীর শিল্পকর্মের পসরা। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে ৫০টির বেশি স্টলে প্রদর্শিত হয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পচর্চারত নির্বাচিত শিল্পীদের শিল্পকর্ম। নবীন-প্রবীন শিল্পীদের পারস্পরিক মেলবন্ধনের পাশাপাশি শিল্পীরা তাঁদের শিল্পকর্ম বিক্রিরও সুযোগ পান তাঁরা। শিল্প সংগ্রাহকেরা এই মেলা থেকে চিত্র ও ভাস্কর্য, পটচিত্র, পোস্টার, ছাপাই ছবি ও ফটোগ্রাফি ও সেরামিক মাধ্যমের শিল্পকর্ম শিল্পীদের কাছ থেকে সরাসরি সংগ্রহ করার সুযোগ পেয়েছেন এবং পর্ষদ প্রকাশিত বই ও অ্যালবামও কেনার সুযোগ ছিল। প্রতিদিনই উৎসব প্রাঙ্গনে আয়োজিত হয়েছিল গান ও ছবির আড্ডা। এছাড়াও ছিল বিভিন্ন শৈল্পিক অনুষ্ঠান।

তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী ইন্দনীল সেন বলেন, “২০১১-র পর থেকে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু চারুকলা পর্যদ নয়, সংগীত অ্যাকাডেমি, নজরুল অ্যাকাডেমি এগুলো ঢেলে সাজাচ্ছেন। যাঁরা প্রখ্যাত শিল্পী এবং নবাগত শিল্পী সবাইকে নিয়েই আমরা এই ধরনের কাজ করে চলেছি। আগামী দিনেও করবো।”

এ বছর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছবি আঁকেন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমও। তাঁর কথায়, “এখান থেকেই আগামীর শুভাপ্রসন্ন বা মকবুল ফিদা হুসেন তৈরি হবে। মূলত তরুণ শিল্পীদের উৎসাহ দিতেই আমার এখানে আসা।”

এই শিল্পমেলা আয়োজিত হয় মূলত তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের প্রতিভা প্রদর্শনের জন্য। ক্রমশ এই উৎসবের পরিসর, পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বিভিন্ন জেলা থেকে, গ্রাম থেকে প্রবীণ-নবীন শিল্পীরা তাঁদের শিল্পকর্ম নিয়ে শহরের প্রাণকেন্দ্রে এই উৎসবে সামিল হন। ছবি বিক্রির পাশাপাশি শহরের মানুষের কাছে নিজেদের কাজ প্রদর্শনীর সুযোগ এই মেলা। পাশাপশি থাকে সম্ভাবনাময় তরুণ শিল্পীদের কাজ। এবছর তরুণ শিল্পীদের প্রায় ১১০০ বেশি ছবি জমা পড়েছিল, যার মধ্যে ২০০-র বেশি কাজ প্রদর্শিত হয়েছে। যোগ্য শিল্পীকে উৎসাহিত করতে পুরস্কার ও শংসাপত্রও দেওয়া হয়েছে। পুরস্কৃত হয়েছেন অরুণিমা চৌধুরী, তরুণ ঘোষ প্রমুখ শিল্পীরা। তাঁদের কাজগুলি প্রদর্শিত হয়েছিল গগনেন্দ্র প্রদর্শালায়।

গগনেন্দ্র প্রদর্শশালায় চারুকলা পর্ষদের পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী তরুণ ঘোষের শিল্পকর্ম

মিস্কড মিডিয়ার মাধ্যমে নিজের ব্যক্তিগত দর্শনকে তুলে ধরেন শিল্পী পূজা সরকার। তাঁর কথায় “প্রায় দশ বছর হল এখানে যোগদান করছি। অভিজ্ঞতা কম-বেশি অন্যান্য বছরের মতোই। ছবি বিক্রি হচ্ছে কিন্তু খুবই কম, কোভিডের আগে যে পরিস্থিতি ছিল এখন আর সেটা নেই।”

নিজেদের স্টলে পূজা সরকার

এই প্রথম এ বছরের মেলায় পোস্টারের সম্ভার নিয়ে একটি ব্যতিক্রমী স্টল ছিল। স্টলের তরফ থেকে শিল্পী কাঞ্চন দাস বলেন, “এই বছর প্রথম আমরা স্টল নিয়েছি। নামী শিল্পী থেকে নবীন শিল্পী এমনকি যাঁরা প্রথাগত শিল্পী নন, তাঁদের করা পোস্টারও আমরা প্রদর্শন করছি। যে কেউ আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পোস্টার আঁকতে পারেন। আমাদের পোস্টার সমসাময়িক সমাজ, রাজনীতি সর্বোপরি মানুষের কথা বলে।”

পোস্টার-চিত্রের স্টলে

আবার, ৬ জন মহিলা তাঁদের কাজের পসরা নিয়ে একটি স্টল দিয়েছিলেন। কেউ কলকাতার কেউ বা শহরতলির। তাঁদেরই অন্যতম সদস্য জয়িতা সাহার কথায় “প্রতি বছর আমরা স্টল নিই না। সমসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। আমদের স্টলে শুধুমাত্র মহিলা শিল্পীদেরই কাজ থাকে। মহিলাদের বিভিন্ন ‘ইমোশন’ উঠে আসে আমাদের কাজে। আমাদের ছবিগুলির দাম ২০০০-৩০০০ থেকে শুরু। ছোটো কাজের চাহিদাই সবসময় বেশি থাকে। বড়ো কাজের দাম বেশি হওয়ায় তেমন একটা বিক্রি হয় না।”

জয়িতা সাহা ও কৃষ্ণ বসু

মেলার শেষ দিন শিল্প-উৎসাহী সহ সাধারণ দর্শকদের ভিড় ছিল দেখার মতো। বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিল্পীদের কথায়, এমন একটি উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পেরে তাঁরা খুবই আনন্দিত। যাঁরা কলকাতা থেকে অনেক দূরে থাকেন বা যাঁরা তরুণ প্রজন্ম, বছরে একবার রাজ্যের প্রানকেন্দ্রে প্রবীণ শিল্পীদের সঙ্গে তাদের কাজ মিলেমিশে যাচ্ছে, তাই এটা সমগ্র শিল্প জগতের জন্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা উৎসব—তিলোত্তমায় শিল্পী ও শিল্পের মিলনোৎসব।

ছবি- নিজস্ব

Developed by DXDasia