পুরাণ ও বর্তমান সময়ের কোলাজে দেবরাজ নাইয়ার সিনেমা হয়ে উঠল এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল

দেবরাজ নাইয়ার স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি ‘ভয়েস অফ সাইলেন্স’

সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২০১৭ সালে পুলিশের কাছে ধর্ষণজনিত কেস জমা পড়েছিল ৩২,৫০০টি। অনুমান করা যেতে পারে, প্রতিদিন ৯০টি ধর্ষণ কাণ্ড। দ্য ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো ২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর এই রিপোর্ট পেশ করে। যেখানে এ-ও বলা হয়, প্রতিবছর প্রায় ৩৫৯,৮৪৯ কেস জমা পড়ে, যা প্রধানত নারীদের প্রতি মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার এবং অন্যান্যকে কেন্দ্র করে। ভাবতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি। এটাই বাস্তব চিত্র। যেখানে নারীমুক্তি বা নারী-স্বাধীনতা নিয়ে সোচ্চার হন দেশের গুণীজনেরা, রাস্তায় নামেন, মিছিল হয়, বক্তৃতা সভা হয়; কিন্তু তাদের প্রতি অত্যাচারের গ্রাফ প্রতিবছর বেড়ে চলেছে।

এতক্ষণে শ্রদ্ধেয় পাঠকরা নিশ্চয় ভাবছেন এই সব তথ্য উত্থাপনের দরকার কী? সাম্প্রতিক একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র দেখার পর একটু এদিক ওদিক কিছু তথ্য ঘেঁটে গবেষণা করা গেল। বিগত কয়েক বছরে এমন একটা দিনও আসেনি যেখানে সংবাদপত্রের পাতা উল্টোলে বা টেলিভিশনে চোখ রাখলে ধর্ষণ আর শ্লীলতাহানির খবর পাইনি বা পড়িনি। সেই খবর নজরে আসার পর শহর থেকে গ্রাম জুড়ে মানুষ ফেটে পড়েছেন প্রতিবাদে। তবে বেশিরভাগই মোমবাতি হাতে মৌন মিছিলেই থেমে থাকে। ধর্ষণ বা শ্লীলতাহানি আজকের বিষয় নয়। যখন থেকে স্ত্রীশিক্ষা নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন হয়েছে, বাল্যবিবাহ বা সহমরণ প্রথা নিয়ে দিকপালরা আন্দোলন শুরু করেছেন, সেই সময় থেকেই শুরু হয়েছে ধর্ষণের আধিক্য। ধিকিধিকি জ্বলত ছাইচাপা আগুন। তারপর একদিন রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়া শুরু হল। শুধু কি তাই? সাহিত্য থেকে সংস্কৃতি সবেতেই ভীষণ সোচ্চার হয়েছে এই বিষয়।

‘ভয়েস অফ সাইলেন্স’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য 

সম্প্রতি ইউটিউব মাধ্যমে মুক্তি পেয়েছে দেবরাজ নাইয়া পরিচালিত স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি 'ভয়েস অফ সাইলেন্স'। এই নামকরণটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। পরিচালক কি তবে নির্যাতিতার নীরবতার কণ্ঠ বা মৌন কণ্ঠকেই গুরুত্ব দিতে চাইলেন? নাকি গভীরে গিয়ে বললেন, নীরবতাই আসলে প্রকৃত সুর, যেখান থেকে বেরিয়ে আসে এক তেজি ঘোড়া, যে ঘুরে দাঁড়ায়, হাঁটে, ছোটে— আমার আপনার মতোই আমাদের পাশেই রাস্তায় চলাফেলা করে, বিতর্ক সভায় অংশগ্রহণ করে, এই পথেই সোচ্চার হয়।

এই ছবিতেও এক মেয়ের কথা বলা হয়। প্রতিনিয়ত টেলিভিশনে মহিলাদের উপর নির্যাতন দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে বেড়ায় মেয়েটিকে। সে ভাবতে থাকে কীভাবে সহমরণ প্রথায় যেতে বাধ্য করা হয় মেয়েদের, সে বুঝতে থাকে কীভাবে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হত অন্যায় অত্যাচার। সবাই কি সোচ্চার হতে পারে? এখনও তো সমাজের কণ্ঠস্বরকে চেপে ধরা হয়। এই ছবির প্রতিপাদ্য বিষয় এটিই। যেকোনো পরিচালকের পক্ষেই এই ধরনের বিষয় চলচ্চিত্রে উপস্থাপন করা খুব চ্যালেঞ্জিং। নির্যাতনের ঘটনা দেখাতে গিয়ে যেন নির্যাতনই মুখ্য বিষয় হয়ে না দাঁড়ায়, সেখান থেকে উত্তরণের পথ দেখানোই পরিচালককে ভাবতে হয়। এই ছবি ছাইচাপা আগুনের, তাই উত্তরণের ইঙ্গিত থাকলেও তা পরিপূর্ণতা পায়নি।

চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য

যৌননিগৃহে মৃত ভারতীয় নার্স অরুণা শানবাগকে এই ছবি উৎসর্গ করেছেন দেবরাজ। একদিকে পুরাণকে ব্যবহার করে বিনির্মাণ অন্যদিকে বর্তমান সময়কে তুলে ধরা— সমান্তরালভাবে এগিয়েছে এই ছবি। নির্দিষ্ট কোনো গল্প বলতে চান না দেবরাজ। তাঁর চলচ্চিত্র ভাবনায় কাজ করে অসামান্য কিছু ইমেজারি, যে কারণে এক একটি দৃশ্য হয়ে উঠতে পারে আলাদা আলাদা গল্প। চরিত্রকে সাধারণ বাস্তবতার ছকে না ফেলে তার মধ্যে বপণ করেন জাদুবাস্তবতার বীজ। তাই দেবরাজ নাইয়ার ছবি অতি ধীর লয়ে এগোয়।

'ভয়েস অফ সাইলেন্স' ছবির শক্তিশালী দিক ক্যামেরা এবং শব্দের ব্যবহার। এই দুটি জিনিসের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে গোটা ছবিটি। ছবিতে সেই অর্থে কোনো সংলাপ নেই। শুধু মনে পড়ছে খুবই আবছা কিছু সংলাপ (সাবটাইটেলে সংলাপগুলি দেখা যাবে),

— বন্ধুরা, খবর কী?
— রাজা এসেছেন।
— রাজা কেন এসেছেন?
— তিনি একটি মেয়ে চান।
— কীরকম মেয়ে তিনি চান?
— তিনি ওই মেয়েটিকে চান।

 

দেবরাজ নাইয়া পরিচালিত ‘ভয়েস অফ সাইলেন্স’

তারপরেই শিশুদের হট্টগোল — ভোকাট্টা ঘুড়ি — কাটা ঘুড়ির মাটিতে লুটিয়ে পড়া — রেডিওতে ঠিক সেই মুহূর্তে ঘোষিত হচ্ছে "অবশেষে মারা গেলেন সেই ধর্ষিতা"। কাটা ঘুড়ি রাস্তা থেকে তুলে আনে শিশুদের দল। এদিকে খবরে বলা হয়, মেয়েটিকে রাস্তা থেকে উদ্ধার করেন কিছু স্থানীয় মানুষ। এইভাবে কাটা ঘুড়ি আর নির্যাতিতা মেয়েটির আর্তনাদ মিলেমিশে যে হাহাকারের সিম্ফনি তৈরি হয়, এটিই এই ছবির বলতে চাওয়া। তাই এই দৃশ্যটি গোটা ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা বলে মনে হয়েছে।

চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য 

২০১২ সাল থেকে এই ছবির ভাবনা শুরু। নানা কারণে মাঝপথে থেমে যায়। বেশিরভাগ শ্যুটিং করেছেন ২০১৪-১৫ সালে। অবশেষে ২০১৮-তে কাজ শেষ হয়েছে। 'ভয়েস অফ সাইলেন্স' পৌঁছে গেছে সাউথ এশিয়ান শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে, সার্বিয়া ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার পায় এই ছবি। এছাড়াও মনোনীত হয় বেলারুশ, ব্রিটেন এবং কেরালার সাইন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। দেখানো হয়  কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের শর্ট ফিল্ম বিভাগেও।

‘ভয়েস অফ সাইলেন্স’ ছবির পোস্টার 

ছবিতে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন শর্মিষ্ঠা রায়। চিত্রগ্রাহক প্রসেনজিৎ কোলে, শমীক রায় চৌধুরী ও ঋদ্ধিক দত্তের সম্পাদনা, সুজয় দাসের শব্দ পরিকল্পনা, মেঘ ব্যানার্জির আবহ নির্মাণ এই ছবির পাওনা। গল্প, চিত্রনাট্য এবং পরিচালনা দেবরাজ নাইয়ার। এটিই তাঁর প্রথম কাজ। প্রযোজনার দায়িত্বে ছিলেন নীলাঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়। 

শেষ করি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ উত্থাপন করে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা মেয়েদের দুইভাবে দেখতে অভ্যস্থ। একদিকে তার দেবী রূপ এবং অন্যদিকে তার ডাইনি রূপ। ঠিক যেমনভাবে পুরুষতন্ত্র একটি মেয়েকে সিংহাসনে বসায়, তেমনভাবেই রাস্তায় ছুঁড়ে দেয়। সমস্যা এখানেই। আমরা প্রতিবাদ মিছিল করলেও মেয়েদের 'মানুষ' সত্ত্বাটিকে অগ্রাহ্য করে ফেলি। শিল্পে-সংস্কৃতিতে মহিলাদের মনুষ্যত্বের জায়গাটি ফোকাস করা হোক। যে দুইভাবে পুরুষ মেয়েদের সেলিব্রেট করছে, তাতে কোথাও গিয়ে তাদের বলতে চাওয়া কথাগুলো নষ্ট হচ্ছে, ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এই ছবির ক্ষেত্রেও এই সমস্যাটি ব্যক্তিগতভাবে আমায় ভাবিয়েছে। তাছাড়াও সহমরণ প্রথা বা দুর্গা বিসর্জনের চিত্রকল্প একাধিক চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হওয়ায় সেইসব দৃশ্যে গভীরতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই কথাগুলি যেমন একদিক থেকে সত্যি, অন্যদিকে এটাও ঠিক যে, এমন ছবি বাংলায় বিরল। এই ছবি আপনাকে চুপ করাবে, কাঁদাবে, অশান্ত করবে, আপনার ঘুম ওড়াবে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। সেইদিক থেকে পরিচালক দেবরাজ নাইয়া (যিনি নিজে একজন অভিনেতাও বটে) চূড়ান্তভাবে সফল হয়েছেন।
 

Developed by DXDasia