
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে ‘এপারের চোখে মুজিব’ প্রকাশনা
সাল ১৯৭১। এরকমই এক শীতের সকাল। কুয়াশা থেকে ঠিকরে পড়ছে মৃদু আলো। সেই মুহূর্তে পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে ঘটে যাচ্ছে বিরাট এক ওলোটপালোট। কয়েক মাস ধরে চলতে থাকা বাঙালিদের জেদ, অহংবোধ আর স্বপ্নের লড়াইয়ে ভেসে আসছে একটা মুখ। দেশ ভেঙে নতুন দেশ। জাতি ভেঙে নতুন জাতি। বাংলা আর বাঙালি বুঝে নিচ্ছে অধিকারের লড়াই। এই লড়াইয়ের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
‘বিপুলা পৃথিবী’-র রচয়িতা আনিসুজ্জামান লিখছেন, ‘‘গোলাগুলির দাগ। ভাঙা সেতু। বিকল্প পথ। পাকিস্তানিদের তৈরি বাঙ্কার। ভারতীয় বা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ছাউনি।’’ রাস্তা জুড়ে জনতার উল্লাস, ‘জয় বাংলা’! মুজিবুর রহমান সেই নতুন জন্মানো দেশটির পিতা। দেশের মুখ।
রেডিওতে মুক্তির ঘোষণা, ১৬ ডিসেম্বর-১৯৭১, ছবিঃ আব্বাস আত্তার
২০২০ সালে চলছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ। সেই উপলক্ষ্যে কলকাতার কণ্ঠস্বর প্রকাশন আয়োজন করেছে দীর্ঘ স্মৃতিকথাধর্মী একটি বই ‘এপারের চোখে মুজিব’। সম্পাদক– সুমন ভট্টাচার্য। সম্প্রতি প্রকাশিত এই বইতে ভারতবর্ষের ৩৬ জন লেখক এবং ৫ জন প্রবাসী বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবীর নিবন্ধ রয়েছে। ভারতীয় লেখকদের মধ্যে আছেন প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী এবং বর্তমান সাংসদ এমজে আকবর, প্রাক্তন কংগ্রেস সাংসদ দেবপ্রসাদ রায়, সিপিএমের প্রাক্তন সাংসদ মইনুল হাসান, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মন্ত্রী/ নাট্যকার ব্রাত্য বসু, প্রখ্যাত গায়ক নচিকেতা চক্রবর্তী; পাশাপাশি রয়েছেন জয়ন্ত ঘোষাল, গৌতম ভট্টাচার্য, মহম্মদ সাদউদ্দিন, সৈয়দ তানভীর নাসরিন বা রুপক সাহার মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও সাংবাদিকরা। এই বইয়ের সহ-প্রকাশক ঢাকার সময় প্রকাশন।
প্রবাসীদের মধ্যে কলম ধরেছেন প্যারিসের বিশিষ্ট মূকাভিনয় শিল্পী পার্থপ্রতিম মজুমদার, মস্কোয় বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত সাইফুল হক, মুক্তিযোদ্ধা এবং অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী কামরুল আহসান খান, ভয়েস অফ আমেরিকার সাংবাদিক ও লেখক আনিস আহমেদ, শহিদ বুদ্ধিজীবী পুত্র ও নিউইয়র্ক প্রবাসী তৌহিদ রেজা নুর। বঙ্গবন্ধুর জীবন, কাজ, প্রাসঙ্গিকতা এবং বিদেশনীতিকে নিয়ে গবেষণাধর্মী ব্যাখ্যা আছে এই সংকলন গ্রন্থে।
এই সংকলনের সম্পাদক সুমন ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, তাঁরা এই শ্রদ্ধার্ঘ্য প্রচেষ্টায় মূলত প্রতিবেশী ভারতবর্ষের রাজনীতিক, কূটনীতিক, সাংবাদিক, নাট্যকার, কবি বা অধ্যাপকরা কীভাবে মুজিবের অবদানকে দেখেন, তাঁর মৃত্যুর ৪৫ বছর বাদেও কী মূল্যায়ন করেন, তা তুলে ধরতে চেয়েছেন নিপুণভাবে।
স্বাধীন বাংলাদেশে জয় বাংলার পদযাত্রা
বঙ্গবন্ধু বিজয়ের আগে বহু বছর ধরেই স্বাধীন দেশ ও স্বাধীন ভাষার জন্য লড়াই করেছেন। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর। ক্যালেন্ডারে কি দিনটা লাল কালিতে রাঙানো থাকে? কারণ এইদিনই এক সভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানের একটি নতুন নাম দিলেন, বাংলাদেশ। বললেন, ‘‘এক সময় এ দেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে ‘বাংলা’ কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকুও চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা হইয়াছে। … একমাত্র বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কোনো কিছু নামের সঙ্গে ‘বাংলা’ কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এর পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’।’’
আরও পড়ুন: বাংলাদেশে ৭১-এর ইতিহাস আজও জীবন্ত
বুকে বাজল বাঙালির। আবেগে, উন্মাদনায়, চোখের জলে। লক্ষ লক্ষ মুজিবুর প্রেমী। নতুন দেশকে স্বাগত জানাচ্ছেন প্রত্যেকে। সুমন ভট্টাচার্য সম্পাদিত এই সংকলনে চোখ রাখলে দেখা যাবে লক্ষাধিক শব্দ পাতার পর পাতা। এক একটা শব্দ যেন সেইসব শহিদের কান্না। ‘এপারের চোখে মুজিব’ সংকলনগ্রন্থে বহু অধ্যাপক, গবেষক বঙ্গবন্ধুর জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে যেমন বিশ্লেষণ করেছেন, তেমনই একটি নতুন দেশের বিজ্ঞানচিন্তা, খেলাধূলা, বিনোদন কীভাবে আবর্তিত হচ্ছিল, তার প্রামাণ্য দলিল তুলে ধরেছেন। মুজিবের কলকাতা বাস থেকে তাঁর ফুটবলপ্রেম, কিছুই গবেষকদের দৃষ্টি এড়ায়নি। আজ বাংলাদেশের বিজয় দিবসে এই আকরগ্রন্থ হাতে তুলে নেওয়ার মতো৷ তাঁকে সম্মান জানানোর মতো। দেশের প্রতি, বাংলার প্রতি এইটুকু ভালোবাসা বরং মিশে থাক। আর পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলা লেখা থাক স্বর্ণাক্ষরে।
এপারের চোখে মুজিব
মুদ্রিত মূল্যঃ ৪০০/-
প্রকাশকঃ কণ্ঠস্বর (ভারত), সময় প্রকাশন (ঢাকা)
হোম ডেলিভারির জন্য যোগাযোগঃ ৯৭৪৮৪ ১২৫১০

