মেটিয়াবুরুজের এই ফুটবলারই প্রথম ভারতীয় হিসাবে বিদেশি দলের জার্সি পরেছিলেন!

বিতর্ক-ডামাডোলের মাঝে হারিয়ে যায় ফুটবলার মোহাম্মদ সেলিমের গল্প

কলকাতার মেটিয়াবুরুজের গলি থেকে স্কটল্যান্ডের ‘কেলটিক’ ফুটবল ক্লাব। অনেকটা মতি নন্দীর ‘স্ট্রাইকার’কে মনে পড়িয়ে দেওয়া। উপন্যাসের নায়ক প্রসূন স্বপ্ন দেখছিল, ব্রাজিলের ‘কসমস’ থেকে তার ডাক এসেছে। বাংলার ছেলে খেলতে যাবে বিদেশি ক্লাবে। ফুটবলবোদ্ধারা স্মরণ করেন ‘বাইচুং ভুটিয়া’কে। যিনি নাকি বিদেশি দলে খেলা প্রথম ভারতীয়। বিতর্ক-ডামাডোলের মাঝে হারিয়ে যায় মোহাম্মদ সেলিমের গল্প।

না, ইনি রাজনীতিবীদ নন। এঁর জন্মকম্ম মেটিয়াবুরুজে। ১৯১১ সালে গোরাদের খালি পেয়ে খেলে হারিয়ে দিয়েছিল একটি ভারতীয় ক্লাব। ছ’বছরের সেলিমের চোখে স্বপ্ন বুনে দিয়েছিলেন শিবদাস-বিজয়দাস ভাদুড়িরা। দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসকদের বিরুদ্ধে ‘দেশের জবাব’ হয়ে উঠতে চাইত ছোট্ট ছেলেটা। শুরু হল কঠোর অনুশীলন। প্রতিভা তো ছিলই, কিন্ত তার চেয়েও বেশি ছিল একবগগা জেদ। প্রথমে বউবাজার ক্লাবে শুরু করেছিলেন খেলা। মোহামেডান বি-টিম থেকে পঙ্কজ গুপ্ত সেলিমকে নিয়ে আসেন স্পোর্টিং ইউনিয়নে। এরপর ইস্টবেঙ্গলে একবছর কাটিয়ে ছোনে মজুমদারের ‘এরিয়ান্স’। এরিয়ান্স-এর মায়া কাটিয়ে সেলিম মহামেডানে ফিরলেন। তাঁর পায়ের জাদুতে মুগ্ধ ময়দান। অপ্রতিরোধ্য মহামেডান। 

১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮, টানা পাঁচবার কলকাতা ফুটবল লীগ জয়। সেলিমের চোখধাঁধানো পাস, ছবির মতো লব, পরিচ্ছন্ন ড্রিবল, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা নজর কেড়েছিল দেশি বিদেশি ফুটবল অনুরাগীর। সবাই ছুঁয়ে দেখতে চায় তাঁকে। অক্লেশে মিশে যাচ্ছেন গ্যালারিতে। ধর্মের ভেদাভেদ নেই, চামড়ার রং নেই, শুধুমাত্র সবুজ মখমলে ঘাসে খালি পায়ের লড়াই। শোনা যায়, পঞ্চমবারের জন্য মহামেডান যখন শিল্ড তুলছিল, নিঃশব্দে তাঁর গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে পানি…

কিছুদিন পরেই সেলিমকে দুটো এক্সিবিশন ম্যাচ খেলতে ডাকা হয়। প্রতিপক্ষ, চীনা অলিম্পিক দল। প্রথম ম্যাচেই কামাল করে দিয়েছিলেন, সেলিম, আব্বাস, রহিমরা। ভারত না জিতলেও চীনা প্রতিনিধিরা প্রশংসায় পঞ্চমুখ। 

দ্বিতীয় ম্যাচ শুরু হবে। কিন্ত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সেলিমকে! অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জানতে পারা গেল, তিনি কায়রো হয়ে পালিয়েছেন ব্রিটেন। সেলিমের আত্মীয় হাশিম থাকতেন ইংল্যান্ডে। তিনি যোগাযোগ করেন, স্কট ক্লাব ‘কেলটিকে’র ম্যানেজার ‘উইলিয়াম ম্যালি’কে। বুটজুতোর বিরুদ্ধে খালি পা? রাজি হচ্ছিলেন না কোচ। হাশিম, স্মিতমুখে অনুরোধ করেন, “একবার সুযোগ দিয়েই দেখুন না!”

প্রায় একহাজার খেলোয়াড়, তিনজন কোচ ও কর্মকর্তাদের সামনে ‘খেল’ দেখিয়েছিলেন সেলিম। তৎক্ষণাৎ দুটো চ্যারিটি ম্যাচ খেলতে বলা হয় তাঁকে। টিমে তাঁর জায়গা পাকা। গ্ল্যাসটনের বিরুদ্ধে খেলতে নামলেন, পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে। সেই ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছিলেন, শ্বেতাঙ্গ ট্রেনার জিমি ম্যাকিনিমি। ভাবলেই কাঁটা দিয়ে ওঠে গায়ে। মাঠে অসামান্য কেরামতি, টাচ দেখে হাততালিতে ভরে গিয়েছিল স্টেডিয়াম। স্কটল্যান্ড জয় করে নিলেন খালি পায়ের জাদুকর।

কিন্ত দেশের জন্য মন কেঁদে উঠেছিল সেলিমের। চ্যারিটি ম্যাচের টাকা, প্রায় ১৮০০ পাউন্ড, অনাথ শিশুদের দিয়ে ফিরে এলেন কলকাতা। জার্মানি থেকেও ডাক এসেছিল তাঁর। যেতে পারেননি।

‘কেলটিক ক্লাব’ মনে রেখেছিল তাঁকে। সেলিম তখন মৃত্যুশয্যায়। মেজো ছেলে রশিদ আহমেদ ক্লাবকে চিঠি লেখেন, বাবার অসুস্থতার খবর জানিয়ে। উত্তর আসে কিছুদিন বাদেই। রশিদ ভেবেছিলেন, অজ-কলোনির কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলারকে ভুলে গিয়েছে ক্লাব। কিন্ত তাঁর চিঠির উত্তরে এসেছিলে একটি ১০০ পাউন্ডের ব্যাংক ড্রাফট নোট। কেলটিক কর্মকর্তাদের চিঠির ছত্রে ছত্রে ছিল উদ্বেগ। “কেমন আছেন যাদুকর?” রশিদের বুক ভরে গিয়েছিল গর্বে। জাত খেলোয়াড়রা তো পৃথিবীর যেকোনো মাঠেই রাজা। 

১৯৮০ সালে চলে গিয়েছিলেন তিনি। ৭৬ বছর বয়সে। অবসর জীবনে কোচিং করিয়েছেন। তৈরি করেছেন একঝাঁক ফুটবলার।

সেলিমকে আমরা আজ মনে রাখি না। কিন্ত ময়দান সেদিন ধর্ম মানেনি। দেখেনি গায়ের রং। তাই তো মেটেবুরুজের কৃষ্ণাঙ্গ, মুসলমান এক যুবক, গায়ে গলিয়েছিল বিদেশি দলের জার্সি। প্রথম ভারতীয় হিসেবেই।

তথ্যঋণঃ Bleacher Report, Telegraph UK,  A Social History of Indian Football : Striving to score (Routledge)

চিত্রঋণঃ Celtic Wiki

Post Tags
Developed by DXDasia