৫ টাকায় জোড়া সিঙাড়া! হতদরিদ্রদের পাশে তুফানগঞ্জের ‘সিঙাড়া দিদা’

আশি বছর বয়সে আজ সকলের অনুপ্রেরণা সুরবালাদেবী ওরফে সিঙাড়া দিদা

থায় বলে, ব্যবসা শুরু করবার নির্দিষ্ট কোনো বয়স বেঁধে দিতে পারে না কেউ। কোনো কাজের প্রতি তীব্র ভালোবাসা ও তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জেদকে মান্যতা দিয়ে, আজ অবধি নজির গড়েছেন কত নামী ব্যবসায়ীরা। আর তাই যে বয়সে বেশিরভাগ মানুষ বিছানা আঁকড়ে হাজাররকম রোগের সঙ্গে লড়াই করে দিন কাটান, সেই বয়সে কোচবিহারের তুফানগঞ্জ নিবাসী এক বৃদ্ধা নিজের দমে চালাচ্ছেন একটি সিঙাড়ার দোকান। আশি বছর বয়সী এই বৃদ্ধাকে ভালোবেসে স্থানীয় মানুষ নাম দিয়েছে ‘সিঙাড়া দিদা’। শীতের কাঁপুনি, গ্রীষ্মের দাবদাহ – সমস্ত কিছু উপেক্ষা করে সারাদিন নিজের হাতে সিঙাড়া তৈরি করে যান তিনি। আর এত পরিশ্রমের মধ্যেও তাঁর ঠোঁটে লেগে থাকে হাসি।

বর্তমানে যেখানে নামী দামী খাবারের দোকানগুলি অত্যন্ত সাধারণ মানের খাবারের বদলে চেয়ে নিচ্ছে চড়া দাম, সেখানে দাঁড়িয়ে সিঙাড়া দিদা ওরফে সুরবালা মণ্ডল মাত্র আড়াই টাকায় বিক্রি করেন এক একটি সিঙাড়া! আর তৈরির সঙ্গে সঙ্গেই ‘হট কচুরিজ’-এর মতো বিক্রি হয়ে যায় সেগুলি। সিঙাড়া ছাড়াও বেশ কয়েক প্রকার স্ন্যাক্স পাওয়া যায় কোচবিহারের তুফানগঞ্জ মহকুমা এলাকায় সুরবালাদেবীর দোকানটিতে। গত ৩৫ বছর ধরে গনগনে আগুনের আঁচে কাজ করেন সুরবালা, তাঁর কথায়, “সত্যি বলতে এই কাজ আমার অত্যন্ত ভালোবাসার। এতখানি বয়সেও সিঙাড়া তৈরির কাজে কখনও ক্লান্তি আসে না আমার। আর সব চাইতে বড়ো কথা হল, আমি সবসময় চেষ্টা করি, আমার দোকান থেকে কেউ যেন পেটে খিদে নিয়ে না ফেরত যায়।” বিকেল হলেই ভিড় জমে সিঙাড়া দিদার দোকানের সামনে। আর ঠিক কোন মন্ত্রবলে বাইরের মুচমুচে আবরণের ভিতর সুস্বাদু আলুর পুর বন্দি করেন তিনি, সেই রেসিপি নিতান্তই গোপন রাখেন সুরবালা।

বর্তমানে যেখানে নামী দামী খাবারের দোকানগুলি অত্যন্ত সাধারণ মানের খাবারের বদলে চেয়ে নিচ্ছে চড়া দাম, সেখানে দাঁড়িয়ে সিঙাড়া দিদা ওরফে সুরবালা মণ্ডল মাত্র আড়াই টাকায় বিক্রি করেন এক একটি সিঙাড়া!

স্থানীয় বাসিন্দা মানসী মণ্ডল জানান, “আশি বছর বয়সেও যে একজন মহিলা একা হাতে একটি দোকান চালাতে পারেন, তা সত্যিই কল্পনার বাইরে। সিঙাড়া দিদা আমাদের গ্রামের মেয়েদের কাছে এক অনুপ্রেরণা। আমি কোনোদিন দিদাকে অসুস্থতার কারণে দোকান বন্ধ রাখতে দেখিনি। এমনকি ছুটির দিনেও অক্লান্ত ভাবে কাজ করে যান। ওঁর অদম্য জেদ ও জীবনীশক্তি যেমন আমাকে বারবার এই দোকানে আসতে বাধ্য করে, তেমনই আমায় টানে এই স্বাদে ভরা সিঙাড়াগুলি। আজকের দিনে যে মাত্র আড়াই টাকায় এত সুস্বাদু কোনো খাবার পাওয়া যেতে পারে, তা কখনও ভাবতেই পারিনি এর আগে। প্রায় প্রতিদিনই দিদার হাতে তৈরি সিঙাড়া কিনতে এখানে আসি আমরা।”

স্থানীয় মানুষের ভালোবাসায় আজ সুরবালাদেবী ও তাঁর সিঙাড়ার গল্প পাড়ি দিয়েছে তুফানগঞ্জের বাইরেও। তাঁর পরিশ্রম ও সাফল্যের গল্পে অনুপ্রাণিত হয়ে, বর্তমানে বহুদূর থেকেও তাঁর দোকানে সিঙাড়া কিনতে আসেন মানুষ। প্রত্যেককেই সহাস্য মুখে অভ্যর্থনা জানান তিনি। শোনা যায়, তাঁর দোকানে আসা কোনো শিশুর কাছে যদি পর্যাপ্ত টাকা না থাকে, তাহলে দিদা নাকি বিনা পয়সাতেই খাবার তুলে দেন তাদের হাতে।

স্থানীয় মানুষের ভালোবাসায় আজ সুরবালাদেবী ও তাঁর সিঙাড়ার গল্প পাড়ি দিয়েছে তুফানগঞ্জের বাইরেও। তাঁর পরিশ্রম ও সাফল্যের গল্পে অনুপ্রাণিত হয়ে, বর্তমানে বহুদূর থেকেও তাঁর দোকানে সিঙাড়া কিনতে আসেন মানুষ।

এই বয়সেও কেন দিন রাত এক করে খেটে যান সুরবালাদেবী? সংসার চালানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য কি একেবারেই নেই তাঁর? উত্তরে তিনি বলেন, “আমি যদি কাজ ছেড়ে বাড়িতে বসে পড়ি, তাহলেই বরং শরীর ভেঙে পড়বার সম্ভাবনা বেশি। হয়তো তারপর আর বেশিদিন বাঁচবই না। আমি রান্না করতে ভালোবাসি, মানুষকে খাওয়াতে ভালোবাসি। জীবনের শেষ নিশ্বাস অবধি কাজ করে যেতে চাই আমি।” প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অগ্নিমূল্য বাজারে ১ টাকার চপ আর ২ টাকার ঘুগনি বিক্রি করে হতদরিদ্রদের পাশে থেকেছেন পূর্ব বর্ধমান জেলার জামালপুরের হিমাংশু সেন

‘সিঙাড়া দিদা’র প্রসঙ্গেই মনে পড়ে যায় তামিলনাড়ুর বিখ্যাত ‘ইডলি আম্মা’র কথা। ৮০ বছর বয়সেও একা হাতে ইডলির দোকান সামলান তিনি। মাত্র এক টাকার বিনিময়ে এক প্লেট ইডলি ও চাটনি তুলে দেন খরিদ্দারদের হাতে। তাঁর গল্প ছড়িয়ে পড়তে, স্বয়ং আনন্দ মাহিন্দ্রা দেখা করতে আসেন তাঁর সঙ্গে। অশীতিপর এই বৃদ্ধার অদম্য জেদ ও সাহসিকতার পুরস্কার স্বরূপ তিনি একটা বাড়িই উপহার দিয়ে বসেন ইডলি আম্মাকে! আমরা আশা করি, সে গল্পের মতোই বাংলার সিঙাড়া দিদার গল্পও ছড়িয়ে পড়ুক; পৌঁছে যাক বাংলা ছাড়িয়ে ভারতবর্ষের ঘরে ঘরে। জীবনের শেষে এসে যেন এতদিনের পরিশ্রমের স্বীকৃতি পান সুরবালাদেবী, আর তাঁর গল্প শুনে অনুপ্রাণিত হোক আপামর জনসাধারণ।

Developed by DXDasia