অগ্নিমূল্য বাজারে ১ টাকার চপ আর ২ টাকার ঘুগনি! হতদরিদ্রদের পাশে দোকান-মালিক

পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরের কাছে রয়েছে এই তেলেভাজার দোকান

বাজারে আগুন। পেট্রোলের দাম ১০০ ছুঁয়েছে। এরপর আরও কত বাড়বে, এতসব ভেবে ভেবে নাভিশ্বাস উঠছে৷ অগ্নিমূল্য দৈনন্দিন সাংসারিক সামগ্রী৷ জ্বালানির আঁচে চোখের জলে মুখের জলে অবস্থা। এমন অবস্থায় মাত্র ১ টাকার চপ! এ তো স্বপ্ন! স্বপ্নের মতো মনে হলেও তা বাস্তব করেছেন পূর্ব বর্ধমান জেলার জামালপুরের হিমাংশু সেন। তাঁর দোকানে গরম গরম চপের দাম মাত্র ১ টাকা।

জামালপুর থানার পাঁচড়ায় বাড়ি হিমাংশু সেনের। বাজার দর যতই বাড়ুক, তিনি চপের দাম ১ টাকায় নেবেন। এ যেন তাঁর সংকল্প। শুধুমাত্র আলুর চপ নয়; বেগুনি, ফুলুরি, সিঙারাও পাওয়া যাবে। হিমাংশুবাবু জানিয়েছেন, এলাকার বেকারদের কাছে এটা একরকম ‘আত্মনির্ভরতা’। বাড়ির নিচেই ছোট্ট একটা তেলেভাজার দোকান। প্রতিদিন নিয়ম করে দুপুর ৩টে নাগাদ চপ, সিঙারা ভাজতে বসে পড়েন। রাত ৯টা অবধি দোকান খোলা। এর মাঝে ফুরসত নেই৷ দেখার মতো ভিড়। হিমাংশুবাবু একা নন, চপ তৈরি থেকে অন্যান্য কাজে কাজে তাঁকে সাহায্য করেন স্ত্রী বন্দনা সেন, ছেলে কাশীনাথ সেন এবং পুত্রবধূ শম্পা সেনও।

এই মুহূর্তে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হিমাংশুবাবুর দোকানের চপ। নাম শুনে আশেপাশের এলাকা থেকেও অনেকে যাচ্ছেন। চেখে আসছেন মুচমুচে তেলেভাজা। ভালো লাগলে নিয়ে আসছেন পরিবারের জন্য৷ এই দোকানে গেলে দেখা যাবে একদিকে গ্যাসের উনুনে ভাজা হচ্ছে চপ, সিঙারা, ফুলুরি, বেগুনি। আরেকদিকে বিক্রি হচ্ছে রসগোল্লা, ল্যাংচা, মাখা সন্দেশ এবং ঘুগনি। চপের দাম ১ টাকা আর ঘুগনির দাম ২ টাকা। বর্তমানে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হিমাংশুবাবু এবং তাঁর পরিবার। একটা সময় খাবার জুটত না তাঁদের। হিমাংশু সেনের বাবা বিশ্বনাথ সেন তেলেভাজার দোকান দিয়েছিলেন। তখন চপের দাম ছিল ৮০ পয়সা। সে বহু আগের কথা। ৩০ বছর ধরে হিমাংশুবাবু সামলাচ্ছেন এই দোকান। মাত্র ২০ পয়সা দাম বাড়িয়েছেন। যাঁরা হতদরিদ্র, ঠিকমতো খাবার জোটে না যাঁদের, তেলেভাজা খাওয়া যাঁদের কাছে এখনও রূপকথার মতো – তাঁদের জন্যই এত কম দামে তেলেভাজা বিক্রি করেন হিমাংশু সেন। শুধুমাত্র একপ্লেট ঘুগনির দাম ২ টাকা। হিমাংশুবাবু জানান, জামালপুর এলাকার গরিব, নিম্নবিত্তরাই তাঁর দোকানের সবচেয়ে বড়ো ক্রেতা। এবং এর জন্য তিনি গর্বিত। প্রতিদিন এখানে প্রায় দশ কেজি বেসনের চপ বিক্রি হয়। ব্যয় থেকে ৫০০-৭০০ টাকা লাভ থাকে, তাতেই সংসার চলে। যদিও এতে কোনো অসুবিধা হয় না হিমাংশুবাবু ও তাঁর পরিবারের। এইভাবে মেয়ের বিয়েও দিয়েছেন। দোতলা বাড়ি বানিয়েছেন।

আজকের এই অগ্নিমূল্য বাজারে যেখানে চারদিকে শুধুই ভেজাল, সেখানে হিমাংশুবাবুরা তাক লাগিয়ে দেন। আর বারবার বলেন ইচ্ছা থাকলে সবই সম্ভব। কিন্তু শুধুই কি ইচ্ছা? আস্ত একটা মনও তো দরকার। দিলখোলা এই মন নিয়ে হতদরিদ্র মানুষের মুখে তেলেভাজার স্বাদ দিতে পেরে হিমাংশু সেন আপ্লুত। আপ্লুত আমরাও, যাঁরা বাজারে বেরিয়ে অনবরত দীর্ঘশ্বাস ফেলি। রাষ্ট্র বোধহয় এই দীর্ঘশ্বাস আর স্বপ্নগুলোকে বিশেষ পাত্তা দেয় না। নাহলে তো এই বিশ্ব হত সোনায় মোড়া।

ছবিঃ সংগৃহীত

Developed by DXDasia