ক্যালিফোর্নিয়ার ‘পূর্বা’ দুর্গোৎসবে এ-বছর কুমোরটুলির ডাকের সাজের প্রতিমা

সদস্যরা নিজেরাই তৈরি করেছেন আলোকসজ্জা

প্রবাসে বসে বছরে কখনও কখনও মনে হয়, দূরের আকাশ যেন অন্য রঙে রাঙানো। আমেরিকায় এখন ফল (Fall) সিজন। নীল আকাশে ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘ, আর ঝরে পড়া হলদে পাতারা যেন এই প্রবাসেও আমাদের কাছে আসে দুর্গার আগমনী বার্তা নিয়ে। এখানে বাতাসে শিউলির গন্ধ ভেসে আসে না। তবু প্রত্যেকটি বাঙালি মন জানে, শরতের আকাশ মানেই হৃদয়ে এক অদৃশ্য টান। মা আসছেন… কিন্তু প্রবাসে থেকে সেই আনন্দ, বা টান কি একইভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব? ক্যালিফোর্নিয়ার সেন্ট্রাল ভ্যালির মাউন্টেন হাউসে দাঁড়িয়ে, প্রবাসী মনের সেই তাঁকে আশ্রয় দিয়েছে এক নাম ‘পূর্বা’। যা আমাদের প্রবাসী বাঙালিদের প্রাণের দুর্গাপুজো। (ক্যালিফোর্নিয়ার সেন্ট্রাল ভ্যালির মাউন্টেন হাউসের দুর্গাপুজো)

পূর্বার এই দুর্গাপুজো আজ প্রবাসের আঙিনায় এক অনন্য আবেগের নাম। পূর্বার এই দুর্গাপুজো, চার বছরে পা দিল। চার বছর মানে ইতিহাসে বড়ো সময় নয়, কিন্তু প্রবাসে যেখানে প্রতিটি আয়োজন শুরু হয় শূন্য থেকে—সেখানকার প্রতিটি বছরই একেকটি অধ্যায়। পূর্বার দুর্গাপুজো শুধুই উৎসব নয়, এটি এখানকার সমস্ত বাঙালির আশ্রয়, যেখানে প্রবাসী বাঙালির হৃদয়ের টান আর একাত্মতার স্বপ্ন মিলেমিশে গেছে ফেলে আসা কলকাতার আনাচ কানাচ। (ক্যালিফোর্নিয়ার সেন্ট্রাল ভ্যালির মাউন্টেন হাউসের দুর্গাপুজো)

পূর্বার এই দুর্গাপুজো, চার বছরে পা দিল। চার বছর মানে ইতিহাসে বড়ো সময় নয়, কিন্তু প্রবাসে যেখানে প্রতিটি আয়োজন শুরু হয় শূন্য থেকে—সেখানকার প্রতিটি বছরই একেকটি অধ্যায়।

এই বছর ক্যালিফোর্নিয়ার এই দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ, সাত সমুদ্র পেরিয়ে কুমোরটুলি থেকে আসা, সাবেকি ডাকের সাজের দুর্গা প্রতিমা, এবং তার সঙ্গে রয়েছে আরও একটি আকর্ষণ- পূর্বার সদস্যদের নিজেদের পরিশ্রমে তৈরি করা অপরূপ আলোকসজ্জা। (ক্যালিফোর্নিয়ার সেন্ট্রাল ভ্যালির মাউন্টেন হাউসের দুর্গাপুজো)

বিদ্যুৎবাতির শৃঙ্খল যেন সোনার মালা হয়ে জড়িয়ে যায় দেবীর আসনে। এই আলোকসজ্জা কারিগরের হাতে বানানো নয়— পূর্বার সদস্যদের ভালোবাসা, শ্রম আর আনন্দ দিয়ে বোনা। একেকটি আলো যেন শুধু তারের সঙ্গে বাঁধা বাতি নয়, বরং প্রতিটি আলোয় লুকিয়ে আছে ক্লাবের সদস্যদের স্বপ্ন, শ্রম আর অগাধ ভালোবাসা। কারও হাত ধরে এসেছে নকশার ভাবনা, কারও হাতে জেগে উঠেছে রং, আর কারও শ্রমে সেজে উঠেছে অপরূপ আলোর মালা। (ক্যালিফোর্নিয়ার সেন্ট্রাল ভ্যালির মাউন্টেন হাউসের দুর্গাপুজো)

এই পুজো ঘিরে সারা বছর বাঙালিদের মনে জমে থাকে এক অদ্ভুত টান। কত আলাপ, কত পরিকল্পনা, কত হাসি-ঠাট্টা, আর কত অগণিত ফোনকল ও মিটিং। কে কোন দায়িত্ব সামলাবে। কারা সামলাবে পুজোর কাজ, কারা  সামলাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সব ঠিক হয় আন্তরিক আলোচনায়। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু আবেগের ধার কমেনি এক বিন্দুও। প্রতি বছর এই উৎসব প্রমাণ দেয়, দূরত্বে থেকেও বাঙালির রক্তে উৎসবের ঢেউ থামে না। সব মিলেই তৈরি হয় এই কয়েক দিনের আমাদের এক আনন্দমেলা। যেন সারা বছর ধরে আমরা সবাই একটা বড়ো পরিবারের মতো বেঁধে থাকি এক সুতোয়, আর উমা মায়ের আগমনে, সবার সঙ্গে সবার সেই সম্পর্ক আরও উজ্জ্বল, আরও গভীর হয়ে ওঠে।

গত চার বছরে পূর্বার এই দুর্গাপুজো আমাদের অনুভব করিয়েছে, এই পুজো শুধুই কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়— এ এক আত্মপরিচয়ের মহোৎসব। যেখানে বাঙালি, অবাঙালি এমনকী বহু আমেরিকান মানুষও সমানভাবে এই উৎসবে সামিল হন।

প্রবাসে দুর্গাপুজো পুজো মানেই এক ভিন্ন রকমের অনুভূতি। এখানে নেই ঢাকিদের ভোরবেলা ঘুরে বেড়ানো, নেই পাড়ার ঠাকুর দেখতে বেরোনোর ভিড়। তবু আছে এক অন্য রকমের উষ্ণতা। পূর্বার প্যান্ডেলে গিয়ে দেখা যায়, পরিচিত-অপরিচিত বাঙালিরা মিলে যেন হয়ে উঠেছে এক বিশাল পরিবার। মেয়েরা ব্যস্ত ভোগ রান্নায়, একদল ব্যস্ত মায়ের পুজোর আয়োজনে, কেউ আবার মঞ্চে ব্যস্ত আমাদের কচিকাঁচাদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। আর এই সবকিছুর মাঝে থাকে একটাই অনুভূতি— আমরা একসঙ্গে, আমরা উৎসবে, আমরা বাঙালি।

পূর্বার পুজো কমিটির অন্যতম মুখ, গৌরব বসু। গৌরবদা এই পুজো নিয়ে কথা প্রসঙ্গে বললেন, “আসলে আমাদের এই মাউন্টেন হাউসে যেমন অসংখ্য বাঙালি রয়েছেন, তেমনই এখানে আছেন ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের, বিভিন্ন ভাষার মানুষ। তাদের সবাইকে নিয়ে, একসঙ্গে আমাদের এই পুজোর আবহে আনন্দ দেওয়াটাই একমাত্র লক্ষ্য।”

গত চার বছরে পূর্বার এই দুর্গাপুজো আমাদের অনুভব করিয়েছে, এই পুজো শুধুই কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়— এ এক আত্মপরিচয়ের মহোৎসব। যেখানে বাঙালি, অবাঙালি এমনকী বহু আমেরিকান মানুষও সমানভাবে এই উৎসবে সামিল হন। বিদেশের মাটিতে জন্ম ও বড়ো হয়ে ওঠা ছোটোদের চোখে এখানে জেগে ওঠে অচেনা হলেও গভীরভাবে এক সংস্কৃতি। আর আমরা ফিরে পাই, আমাদের সেই ফেলে আসা শিকড়ের স্মৃতি, আর প্রবীণদের মনে জেগে ওঠে বাংলার সেই প্রাচীন দিনের নস্টালজিয়া। যেন এই কয়েকদিনে আমরা সবাই ফিরে যাই আমাদের প্রত্যেকের শৈশবের পুজোর দিনগুলিতে।

প্রবাসের পুজোয় শুধু দেবীই আসেন না, সঙ্গে আসে এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন। মা যেন এখানে আসেন একে অপরের সঙ্গে বন্ধুত্বের মিলনে। পরিচিত-অপরিচিত সবাই আমরা মিলেমিশে এক হয়ে যাই এই পুজোকে ঘিরে। এ যেন এক সম্মিলিত হৃদয়ের মহামিলনের উৎসব— যেখানে চক্ষুদানের পর দেবীর বোধনের সঙ্গে, শঙ্খধ্বনি আর আরতির ধূপের পবিত্র শিখায়, এক নব চেতনা জ্বলে ওঠে প্রতিটি বাঙালি প্রাণে।

তাই আমার চোখে পূর্বার পুজো মানে শুধু প্রবাসের এক আয়োজন নয়, বরং ফেলে আসা শিকড়কে আবার নতুন ভাবে ফিরে পাওয়া। বাংলা থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও আমরা যেন ছুঁয়ে থাকি আমাদের মাটির গন্ধ, আলোর ঝলকে দেখি শৈশবের পুজোর দিনগুলো। প্রথম বছরের সেই ছোট্ট পদক্ষেপ আজ চার বছরে, একটু একটু করে আমাদের সেন্ট্রাল ভ্যালির বাঙালিদের কাছে হয়ে উঠেছে প্রবাসের এক নিবিড় আশ্রয়। প্রবাসের বুকে দাঁড়িয়ে আমরা যখন দেখি মণ্ডপের আলোয় ঝলমল করছে দেবীর মুখ, তখন মনে হয়— বাংলা আমাদের থেকে দূরে নেই, বাংলা আমাদের ভেতরেই বেঁচে আছে।
 

Developed by DXDasia