ঘট, পট, সরা ও মূর্তি : পশ্চিম পুঁটিয়ারী পল্লী উন্নয়ন সমিতির পুজোয় ‘চারিকল্প’

শিল্পী সোমনাথ তামলির ভাবনায় বাংলার লোকজ শিল্প ঘরানা

বিষয়ভাবনা, আঙ্গিক, মণ্ডপ নির্মাণকে কেন্দ্র করে কলকাতার দুর্গাপুজো প্রতি বছরই নজির তৈরি করছে। বড়ো-ছোটো পুজো নির্বিশেষে সমাজ ও সংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয়ভাবনা বা থিম উঠে আসছে শৈল্পিক অভিনবত্বে। এ-বছর পশ্চিম পুঁটিয়ারীর পল্লী উন্নয়ন সমিতির আয়োজনও তেমনই। শিল্পী সোমনাথ তামলির ভাবনায় এ-বছর এখানে দেখা যাবে ‘চারিকল্প’। শিল্পীর মতে তাঁর এ-বছরের সৃষ্টি বাহিত হবে ঘট, পট, সরা ও মূর্তিতে, অর্থাৎ চারটি কল্পে। তাঁর মণ্ডপ পরিকল্পনা থেকে শুরু করে মূর্তি ভাবনা সবকিছুরই সঙ্গেই মিশে আছে চারটি পুজো নির্ভর শিল্পধারার বিভিন্ন উপাদান। যে উপাদান বাংলার ঐতিহ্য ও পরম্পরার সঙ্গে গভীর ভাবে সম্পৃক্ত।

‘দয়াময়ীর আখ্যান’ দুর্গা পটটি এঁকেছেন কৃপাময়ী কর্মকার। আঁকছেন দয়াময়ীর আখ্যান। রঙের উজ্জ্বল প্রভা, মাতৃরূপের দাপট এই পটুয়ার আসল সৃষ্টি। এই দুর্গা পটে মায়ের ঘর তৈরি হয়েছে বাংলার রথের আদলে কিন্তু ইসালামিক স্থাপত্যের ছায়া এখানে স্পষ্ট। বিষ্ণুপুরের বন বীরসিংহ গ্রামের এই গুণী শিল্পীর ছবি বহুল প্রশংসিত।

চারিকল্প-র চারটি কল্প আসলে বাংলার বিভিন্ন লোকজ শিল্প ঘরানার অংশ। একদিকে নাগরিক শিল্পচিন্তা অন্যদিকে যুক্ত হয়েছে গ্রাম বাংলার বিভিন্ন লোকজ শিল্প ঘরানা, একদল লোকশিল্পীর সৃষ্টি। যে সৃষ্টির মধ্যেই লুকিয়ে আছে সেইসব শিল্পীদের জীবন-জীবিকার অনুচ্চারিত শব্দ। লোকশিল্পের স্বরূপ আর এই অনুচ্চারিত শব্দের খোঁজেই পল্লী উন্নয়নের এবছরের পুজো পরিকল্পনায় যুক্ত করা হয়েছিল ক্ষেত্রসমীক্ষা পদ্ধতি। এই ক্ষেত্রসমীক্ষার কাজে শিল্পীর সহায়ক হিসেবে ছিলেন গবেষক-লেখক রিমি দত্ত বণিক দে ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প ইতিহাসের কৃতি ছাত্রী আলোক নূর ইভানা।

 

রিমি দত্ত বণিক দে এবং আলোক নূর ইভানা-র কথায়, আজ পুজো শিল্প বহুজনের। এই পুজো শিল্প আঙ্গিককে সঙ্গে নিয়েই নতুন চেহারায় রূপান্তরিত হয়। সেই যুক্তিতেই ‘চারিকল্প’ ভাবনায় আমাদের পুজো মাঠ ফিরে তাকিয়েছে গ্রাম সুবাদের চারটি শিল্প পরিকল্পনার দিকে। যে চারটি কল্পেরই নির্মাণ উপাদান হল মাটি ও প্রকৃতি। যেখানে মিশে থাকে বাংলার গন্ধ। সৃজন ভাবনার দিক থেকে এই মণ্ডপে একটি শিল্প আরেকটি শিল্পের সঙ্গে মিলে মিশে গেছে। যে কারণে বিষ্ণুপুরের ফৌজদারদের দুর্গা পটের শৈলীর ছায়ায় রচনা হয়েছে মূর্তি। এই প্রথম চিত্রকল্প আর মূর্তিকল্প একসঙ্গে মিলে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি সৃজনশীল নিরপেক্ষ শিল্প নির্মাণ করেছে। আবার মণ্ডপের গড়নে উঠে এসেছে ঘট। রীতি অনুসারে এমন ঘটের উল্লম্ব দাঁড়িয়ে থাকার বদলে বেছে নেওয়া হয়েছে এমন একটি অভিমুখ, যাতে সহজেই মনে হয় মা ভগবতী তাঁর ভাণ্ড উজাড় করে পৃথিবীর মাটিকে ফসলে ও প্রাণ শক্তিতে ভরিয়ে দিচ্ছেন। আর অবতল ভঙ্গিমায় সরা সেই উজাড় করা সম্পদ নিজের কোলে অবিরাম গ্রহণ করছেন। আবার উত্তল ভঙ্গিমায় সরা সেই সম্পদ সুরক্ষিত রাখতেও বদ্ধপরিকর। একই সঙ্গে পট ও পুতুলের নানা আঙ্গিকে সেজে উঠেছে মণ্ডপ। লোকায়ত রং, রেখার জৌলুস আর গঠন নকশার সৌন্দর্য নিয়েই গড়ে উঠেছে সমগ্র পরিকল্পনা।

‘চারিকল্প’ মণ্ডপ পরিদর্শনে এসছিলেন, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব রুবি পালচৌধুরী। ভারতীয় হস্তশিল্প প্রসারে এবং বাংলার লোক ঐতিহ্য-দর্শনকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। মণ্ডপ পরিদর্শনের পর তিনি বলেন, লোকশিল্প হল শিকড়ের টান, জীবনের ভিত। এই সব শিল্পের পিছনে আছে ঐতিহ্য এবং দর্শন। খুবই ভালো উদ্যোগ নিয়েছে পল্লী উন্নয়ন সমিতি। বাংলার ছোট্ট ছোট্ট জায়গার লোকশিল্পকে এখানে বৃহত্তর ক্ষেত্রে তুলে আনা হয়েছে।

Developed by DXDasia