
বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্র, উত্তমকুমার, ছবি বিশ্বাস – সকলেই মজেছিলেন চাচা’স-এর স্বাদে
কলকাতার চিরন্তন বিবেকানন্দ রোড (Vivekananda Road)। বিবেকানন্দের বাড়ির উল্টোদকের ফুটে তাকালেই বিশাল লাল রঙের চকচকে সাইনবোর্ডটা এতদিন সকলেরই নজরে পড়েছে। লাল ব্যাকড্রপে সাদা রঙে লেখা – ‘চাচাস হোটেল’ (Chacha’s Hotel)। ওয়ান ওয়ে রাস্তায় যে দিকেই গাড়ি-বাস-ট্রাম যাক না কেন, এই বিশাল লাল সাইনবোর্ডটাই এতদিনের কলকাতার ঐতিহ্যের স্বপ্ন নিয়ে সকলের চোখে ধরা দিত। একে একে নিভিছে দেউটি। এখন ওই রাস্তায় গেলে সাইনবোর্ডের ঔজ্জ্বল্য আর চোখে পড়বে না, ব্যাকড্রপ খসে পড়েছে একদিকে। ঐতিহ্যবাহী চাচাস হোটেলের ঝাঁপ বন্ধ। এই চাচা যে আসলে কে, তা নিয়ে আজও রয়ে গেছে হাজার প্রশ্ন।
শোনা যায় স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ যৌবনে এই চাচার হোটেলে বানানো ফাউল কাটলেটের অন্যতম অনুরাগী ছিলেন। সুভাষচন্দ্র বসুও এখানে শিক কাবাব খেতে আসতেন।

২০২২ সালের ১১ মে পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে গেছে কলকাতার (Kolkata) বুকে ইতিহাস-মাখা এই চাচাস হোটেল। হোটেল বন্ধ, তবু হোটেলের গল্প-হোটেলের স্মৃতি আর ইতিহাস আজও অটুট। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের (Narayan Gangopadhyay) ‘টেনিদা’ (Tenida) যারা পড়েছেন তারা প্রায়ই শুনেছেন টেনিদার অমোঘ ফরমায়েশের কথা – চাচার হোটেল থেকে প্যালারামকে আনতে হবে ফাউল কাটলেট। বিধান সরণীর (Bidhan Sarani) যেখানে এই দোকান, তার কিছুদূরেই পটলডাঙা লেনের চাটুজ্জেদের রোয়াকে বসে আড্ডা জমাতো পটলডাঙার চারমূর্তি। সঙ্গে থাকতো এই চাচাস হোটেলের ফাউল কাটলেট (Foul Cutlet)। আর এই ফাউল কাটলেটের জন্যেই গোটা কলকাতা চিনেছিল একসময় এই চাচাস হোটেলকে।

সাল ১৮৭৫। উত্তর কলকাতায় যেখানে বিবেকানন্দের বাড়ি তার পাশেই জমি কেনেন এক বাঙালি ভদ্রলোক – গোঁসাইদাস পাত্র। ঐ জমির উপরেই ছিল চাচার চায়ের দোকান। এখন এই চাচার আসল নাম যে কী তা কেউ জানে না। তা গোঁসাইদাস যখন জমি কিনলেন, সেই চাচার চায়ের দোকান বন্ধ হয়ে তার নিজের একটা হোটেল তৈরি হল। হোটেলের নাম-ধাম কিছু সেভাবে তখনও ঠিক হয়নি। গোঁসাইদাস নিজেও কোনও নাম দেননি প্রথমে। কিছুদিনের মধ্যেই স্থানীয় মানুষজনেরাই মুখে মুখে সেই হোটেলকে বিখ্যাত করে তুললো চাচাস হোটেল নামে। একই জমিতে আগে ছিল চাচার চা-দোকান, এবার হল চাচাস হোটেল। ফিশ ফ্রাই, ফাউল কাটলেট আর শিক কাবাব দিয়ে শুরু হয়েছিল এই হোটেলের শুভযাত্রা। শিক কাবাব হত পাঁঠার মাংস দিয়ে। বলতে গেলে তখনকার কলকাতায় খুব কম বাড়িতেই মুরগির মাংস উঠতো। আর এখানকার সেই অনাস্বাদিতপূর্ব ফাউল কাটলেটের নেশা গেল কলকাতার। ব্যবসার ইউএসপি হয়ে উঠল এই ফাউল কাটলেট। শোনা যায় স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ (Swami Vivekananda) যৌবনে এই চাচার হোটেলে বানানো ফাউল কাটলেটের অন্যতম অনুরাগী ছিলেন। সুভাষচন্দ্র বসুও (Subhas Chandra Basu) এখানে শিক কাবাব খেতে আসতেন। তখন একটা রমরমে ব্যাপার। ছবি বিশ্বাস (Chobi Biswas), উত্তমকুমার (Uttam Kumar) শ্যুটিং থেকে ফাঁক পেলেই চলে আসতেন এই হোটেলে। আসতেন বিধান রায়ও (Bidhan Chandra Roy), তাঁর প্রিয় ডিশ ছিল চিকেন ক্লিয়ার স্যুপ।
এর মাঝেই মারা গিয়েছেন গোঁসাইদাস পাত্র। হোটেলের ভার তখন পুত্র রামদাসের উপর, পরে তাঁর পুত্র প্রদ্যুতকুমার পাত্র হোটেলের ভার নেন। ধীরে ধীরে হোটেলের খাবার-দাবারেও পরিবর্তন হচ্ছিল। যুগের চাহিদা অনুসারে কিছু কিছু নতুন খাবার বানানো শুরু হল। হোটেলের ভোল আমূল পালটে ফেললেন নতুন প্রজন্মের গৌতম পাত্র এবং অনুজ পাত্র। ফাউল কাটলেট, শিক কাবাবের পাশাপাশি তাঁরা চালু করলেন চাচাস ক্যাটারিং। হোটেলে চিরাচরিত খাবার তো ছিলই, তার সঙ্গে শুরু হল চিনা ও থাই খাবার। এতদিন পর্যন্ত বিবেকানন্দের বাড়ির পাশেই চলছিল এই হোটেল, কিন্তু ২০০৭ সালে তা চলে আসে উল্টোদিকের ফুটে, আজকের জায়গায়।
এত ঐতিহ্য, এত ইতিহাস জড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও কেন বন্ধ হয়ে গেল চাচাস হোটেল? প্রশ্ন তৈরি হয় বই কি! আসলে সমস্যা দানা বেঁধেছিল অনুজ পাত্রের স্ত্রীর মৃত্যুতে। ২০১৮ সালে মারা যান তিনি। এদিকে অনুজবাবুর প্রবাসী পুত্র খাবারের ব্যবসায় অনাগ্রহী। ফলে তাঁদের অবর্তমানে কে বয়ে নিয়ে যাবে এই ঐতিহ্য? তাছাড়া দিনে দিনে প্রতিযোগিতাও বাড়ছে আর তার সঙ্গে টেক্কা দিয়ে নিত্য-নতুন ব্যবসায়িক আইডিয়া নিয়ে আসার জন্যেও তো লোক চাই। অনুজ এবং গৌতমবাবুর বয়স হয়েছে। বুকচাপা কষ্ট নিয়েও একপ্রকার বাধ্য হয়েই ঝাঁপ বন্ধ হয়ে গেছে চাচাস হোটেলের। স্মৃতি আছে, কিন্তু হোটেলের পাশ দিয়ে গেলে আর ফিরে পাওয়া যাবে না ফাউল কাটলেটের গন্ধ। হোটেল সংলগ্ন ফুটপাথ এখনে একদল ঘরহীন মানুষের আস্তানা। ঐতিহ্য আর খোলা আকাশের নীচে রাত্রিবাস কি এতই শান্তিদায়ী?
তথ্যসূত্র –
১। এই সময়
২। The Times of India
