
৮০-র দশকের পর থেকে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন আসে বাংলা ছবির ভাষায়
বাংলা সিনেমায় একাধিক জনপ্রিয় দোলের গান আছে। সেসব গানে ‘হোলি’র উল্লেখই বেশি। এখন রসিক জনেরা বলবেন, রং দেওয়া-নেওয়া নিয়ে তো কথা, তা সে ‘দোল’ হোক বা ‘হোলি’, সবই এক! ঠিকই তো। শুধু, ভিন্ন সংস্কৃতি-রুচি অনুযায়ী এক এক জনের চাহিদা এক এক রকম। তবে, ‘খেলব হোলি রং দেব না’ এবং ‘ও শ্যাম যখন তখন’ –একান্ত আপন (১৯৮৭) ও বসন্ত বিলাপ (১৯৭২) ছবির এই দুটি গান প্রজন্ম পর প্রজন্ম ধরে দোলের গান হিসেবে একইভাবে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে, এ বিষয়ে কোনও বাঙালিরই সন্দেহ থাকার কথা নয়। কিন্তু, এছাড়া?
এছাড়া আরও অনেক গানই রয়েছে যা দোল বা হোলির গান হিসেবে বাংলা ছবির জগতে সমাদৃত হয়েছে। ১৯১৯ সালের প্রথম বাংলা নির্বাক চলচ্চিত্র ‘বিল্বমঙ্গল’। কথা, শব্দ, গান কিছুই না থাকায় দর্শকের মনোরঞ্জনের কথা ভেবে প্রতিটি সিনেমাহলে থাকতো একটা করে অর্কেস্ট্রার দল। সিনেমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারা গানবাজনা পরিবেশন করতো। বাংলা ছবি সবাক হওয়ার পরবর্তী সময়ে বাঙালির জীবন, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ধর্ম -এসব নিয়ে বাংলায় সিনেমা তৈরি হলেও তাতে বাঙালির দোল উৎসব বা ভারতীয় সংস্কৃতির হোলির গান ঠাঁই পেতে সময় লেগেছিল।
প্রমথেশ বড়ুয়া পরিচালিত ‘মুক্তি’ ছবিটি রিলিজ করেছিল ১৯৩৭ সালে। কানন দেবী সেই ছবির নায়িকা ছিলেন আর নায়ক প্রমথেশবাবু নিজে। তাঁর লিপে এবং কণ্ঠে সেই প্রথম ‘আজ সবার রঙে রং মেশাতে হবে’ রবীন্দ্রসঙ্গীতটির হাত ধরে অচেতনেই বাংলা ছবিতে ঢুকে পড়ে দোল বা হোলির অনুষঙ্গ। সংগীত পরিচালনা করেছিলেন পঙ্কজ মল্লিক। দেবকী কুমার বসুর পরিচালনায় ১৯৫৬ সালে মুক্তি পায় ‘নবজন্ম’। এই ছবিতে সরাসরি দোল উৎসব বা দোলের গান না থাকলেও, অরুন্ধতীদেবীকে হারমোনিয়াম বাজিয়ে বৈষ্ণব পদাবলীর রাধিকার রূপ বর্ণনার গান শুনিয়েছিলেন উত্তমকুমার। এই প্রথমবার উত্তমকুমারকে নিজের কণ্ঠে গাইতে শোনা যায়। গান শেষে অরুন্ধতী বলে ওঠেন, ‘উঠি ঠাকুরপো, সামনে দোল আসছে, ঐদিন সকালে তোমার দোলের গান শুনব’। ১৯৬৩-তে অসিত সেন পরিচালিত, উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত বিখ্যাত বাংলা ছবি ‘উত্তর-ফাল্গুনী’। সেই ছবিতেই সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে পান্নাবাইয়ের ভূমিকায় সুচিত্রা সেন লিপ মেলালেন ‘কৌন তারাহ সে তুম খেলাত হরি’। গানের কথায় রয়েছে হোলির প্রসঙ্গ।
১৯৬৭-তে দোল উৎসব প্রথম দেখা যায় তরুণ মজুমদারের পরিচালনায় ‘বালিকা বধূ’-তে। ‘লাগ লাগ লাগ লাগ রঙের ভেল্কি লাগ, পরানে লেগেছে ফাগুয়া’ গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা এই গানটির গায়ক ও সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ইন্টারনেটে এখনও শোনা যায় এই গান।
১৯৭০ সালে মুক্তি পায় অগ্রদূত পরিচালিত ‘মঞ্জরী অপেরা’। এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন উত্তম কুমার, সাবিত্রী চ্যাটার্জি, অজয় ব্যানার্জি, সত্য ব্যানার্জি, গীতা দে প্রমুখ। সংগীত পরিচালনা করেছিলেন সুধীন দাশগুপ্ত। নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী ছিলেন ছবি বন্দ্যোপাধ্যায়, আরতী মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘আজ হোলি খেলবো শ্যাম তোমার সনে’ তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। গানটির গীতিকার ছিলেন সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।
১৯৭৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত দীনেন গুপ্তর পরিচালন ‘বসন্ত বিলাপ’-এর কথা শুরুতেই বলেছি। বাঙালি মননে এ ছবি কালজয়ী রোমান্টিক-কমেডি। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় কথায়, সুধীন দাশগুপ্ত-র সুরে সাদাকালো এই ছবির বিখ্যাত রঙিন গানটি হল-‘ও শ্যাম যখন তখন, খেলো না খেলা এমন’। অপর্ণা সেন ও অন্যান্য অভিনেত্রীরা ঠোঁট মিলিয়ে ছিলেন আর গানটি গেয়েছিলেন আরতি মুখোপাধ্যায়। ১৯৭৮ সালে ফের একটি সাদাকালো ছবি পরিচালনা করেন দীনেন গুপ্ত। নাম- ‘তিলোত্তমা’। অভিনয়ে রঞ্জিত মল্লিক, কল্যাণী মণ্ডল, সুমিত্রা মুখার্জি প্রমুখ। এই ছবির হোলির গানটি হল- ‘রঙ শুধু দিয়েই গেলে আড়াল থেকে অগোচরে’। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় সুরে গানটি গেয়েছিলেন মান্না দে ও অরুন্ধতী হোম চৌধুরী। লিপ দিয়েছেন রঞ্জিত মল্লিক ও কল্যাণী মণ্ডল।
১৯৭৮ সাল। আলো সরকারের পরিচালনায় মুক্তি পায় রঙিন ছায়াছবি ‘বন্দী’। সেই প্রথম কোনও রঙিন বাংলা ছবিতে জায়গা করে নেয় দোল উৎসব। শ্যামল মিত্রর সুরে, আশা ভোঁসলে ও কিশোর কুমারের গাওয়া- ‘মনে রঙ না লাগলে তবে, এ হোলি কেমন হোলি’ গানটিতে লিপ দিয়েছিলেন সুলক্ষনা পণ্ডিত ও উত্তম কুমার।
এরপর ১৯৮০-তে মুক্তি পায় তরুণ মজুমদারের ক্লাসিক ছবি ‘দাদার কীর্তি’। কালী ব্যানার্জি, তাপস পাল, মহুয়া রায়চৌধুরী, দেবশ্রী রায়, অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুপ কুমার, সন্ধ্যা রায়, শমীত ভঞ্জ, রুমা গুহঠাকুরতা অভিনীত এই ছবিতে ভাগলপুরের পটভূমিকায় প্রভাতফেরিতে হোলি খেলার একটি দৃশ্য আছে, যেখানে রং খেলতে খেলতে একদল পুরুষকে গাইতে দেখা যায় ‘হোলি আয়ি রে’। গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শক্তি ঠাকুর ও অন্যান্যরা। সুর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের, কথা পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় ও হৃদয়েশ পাণ্ডের।
এছাড়াও ১৯৮২-তে মুক্তিপ্রাপ্ত পরিচালক পার্থপ্রতিম চৌধুরীর ‘রাজবধূ’ ছবির ‘আজো রঙ্গ খেলত মেরে রঙ্গলাল’ গানটিও উল্লেখ্য। সুর অভিজিৎ বন্দোপাধ্যায়ের, গেয়েছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। বাঙালিয়ানা বজায় রেখে এটিই বোধহয় শেষ চলচ্চিত্র যেখানে হোলি উদযাপন করা হয়। এরপর ১৯৮৯-এ ‘প্রণমি তোমায়’ ছবির ‘সকাল হতে না হতে কেন এলে রং দিতে’, ২০০৯-এ ‘লক্ষ্যভেদ’-এর ‘এলো রে এলো রে হোলি এল রে’, ২০১০-এ ‘বদলা’ ছবির ‘অলিতে গলিতে’ কিংবা ২০০৮-এ ‘জনতার আদালত’ ছবির ‘শ্যাম নাচে রাধা নাচে’ –দোল বা হোলি উৎসব কেন্দ্র করে আরও বেশ কিছু গান তৈরি হয় বাংলা সিনেমায় কিন্তু, সেগুলি শ্রোতাদের মন ছুঁতে পারেনি এবং মোটামুটি ৮০-র দশকের পর থেকে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন আসে বাংলা ছবির ভাষায়। বাঙালির দোল খেলার যে সংস্কৃতি তা হারিয়ে যেতে থাকে গানের সুর, কথা, দৃশ্য থেকে।

