বিশ্বজুড়ে বৈজ্ঞানিক মহলে হইচই ফেলেছে দিঘার মোহনায় পাওয়া নতুন প্রজাতির মাছ

দিঘার মোহনায় প্রায় ৩২২ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়

বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র দিঘা আবার উঠে এসেছে সংবাদের শিরোনামে। দিঘায় তৈরি হয়েছে নতুন পর্যটন হাব। তবে শুধুমাত্র সেই কারণেই নয়, এখানে পাওয়া গেছে নতুন প্রজাতির মাছ, যা সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীদের অবাক করে দিয়েছে। সম্প্রতি জ্যুওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার বিজ্ঞানীরা দিঘার মোহনা থেকে উদ্ধার করেছেন এই নতুন প্রজাতির মাছটিকে। মাছটি কমলা রঙের। এরা গভীর সামুদ্রিক জলে বসবাস করে। এই প্রজাতির নাম গার্নার্ড বা সি-রবিন, যারা ট্রিগ্লিডে প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। জ্যুওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-র বরিষ্ঠ বিজ্ঞানী এবং ওড়িশার গোপালপুরে অবস্থিত জ্যুওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ইস্টুরাইন বায়োলজি রিজিওনাল সেন্টারের ভারপ্রাপ্ত কর্তা অনিল মহাপাত্র জানিয়েছেন, “এই প্রজাতিটির বৈজ্ঞানিক নাম টেরিগোট্রিগ্লা ইন্টারমেডিকা। এর গড়ন ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, টেরিগোট্রিগ্লা হেমিস্টিক্টা প্রজাতির সঙ্গে অনেকাংশে মেলে।” তিনিই এই অনুসন্ধানে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

সারা বিশ্বজুড়ে ট্রিগ্লিডে বংশে মোট ১৭৮টি প্রজাতি রয়েছে। মহাপাত্রের কথায়, “নতুন এই প্রজাতিটি ভারতে খুঁজে পাওয়া চতুর্থ প্রজাতি, যা টেরিগোট্রিগ্লা বংশের অন্তর্গত।” মাছটি একজন স্থানীয় জেলের মাছ ধরার জালে ধরা পড়েছিল। গবেষকদল এই প্রজাতির মোট ২৪টি নমুনা সংগ্রহ করেছেন। বিশদ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা গেছে, মাছগুলি, গার্নার্ড প্রজাতির অন্যান্য মাছের থেকে অনেক ক্ষেত্রেই আলাদা। এই মাছগুলির শুঁড়ের আকার, ক্লেইথরাল মেরুদণ্ডের আকার ভিন্ন। গত ২০ সেপ্টেম্বর তারিখে মাছটি নিয়ে গবেষণালব্ধ ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বিজ্ঞানের জার্নাল থালাসাস-এ।

মাছগুলিকে গোপালপুরের জ্যুওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ইস্টুরাইন বায়োলজি রিজিওনাল সেন্টারে এবং কলকাতার মেরিন ফিশ সেকশনে সংরক্ষিত করা হয়েছে। গবেষকরা মাছটির শরীরে একটি স্বতন্ত্র পেক্টোরাল পাখনা খুঁজে পেয়েছেন, যাতে রয়েছে কালো রঙের ঝিল্লি। পাখনার পিছন দিকে রয়েছে প্রান্তরেখা এবং তিনটি সাদা বিন্দু। পাখনার রেখাগুলি ক্রিম এবং সাদা রঙ মেশানো। জার্নাল থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মাছগুলির ঝিল্লির অংশে রয়েছে লম্বা ওপেরকুলার হাড় এবং ছোটো ক্লেইথরিকাল হাড়। দেহে রয়েছে পার্শ্বীয় রেখা, উপরের পাখনার পাশের অংশে মইয়ের মতন ধাপে ধাপে সাজানো ফুলকা, নিচের অংশে ১২-১৩টি ফুলকা ইত্যাদি। 

 

দিঘার মোহনায় অনেক অদ্ভুত প্রজাতির মাছ দেখা যায়। কারণ এখানে বঙ্গোপসাগরের নোনা জল আর নদীর মিষ্টি জল একসঙ্গে মিশেছে। এমন একটি মাছ হলো লিজার্ড ফিশ, যার দেহ লম্বা, নলাকৃতি এবং পাখনাগুলি চর্বিযুক্ত। এদের মুখের আকৃতি অত্যন্ত বড়ো এবং ছোটো তীক্ষ্ণ দাঁত আছে, যাদের মুখ বন্ধ থাকা অবস্থাতেও দেখা যায়। মাছগুলির মুখের টাকরা আর জিভেও দাঁত রয়েছে। 

দিঘার উপকূলবর্তী অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের মাছের প্রাচুর্য থাকার একাধিক উপকারিতা রয়েছে। প্রথমত, তাদের খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করা যায়। দ্বিতীয়ত, এইসব মাছ সংগ্রহ করে অনেক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চালানো যায়। দিঘায় রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সর্ববৃহৎ মৎস অবতরণ কেন্দ্র, যেখানে পাইকারি হারে মাছ কেনাবেচা করা হয়। দিঘার দু’দিকে ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে এমন আরও দুটি কেন্দ্র রয়েছে। কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য বড়ো শহরগুলির থেকে দিঘার দুরত্ব অপেক্ষাকৃত কম। কাজেই দিঘা থেকে কলকাতা হয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে অনেক সামুদ্রিক মাছ রপ্তানি করা হয়। এখনও পর্যন্ত দিঘাতে ১৯৬টি বংশের অন্তর্গত ৩২২টি প্রজাতির মাছ পাওয়া গেছে। তারা ১০৪টি মৎস পরিবারের এবং ১৮টি অর্ডারের অন্তর্ভুক্ত। দিঘার মোহনা এবং মাছের বাজার পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয় গন্তব্য। পাইকারি মাছের বাজারে প্রতিদিন সকালে মাছের নিলাম হয়, আর তারপর মাছগুলি চালান হয় গোটা বাংলাজুড়ে, এমনকি বাংলার বাইরেও। 

Developed by DXDasia