
‘বেঙ্গল গেজেট পত্রিকা’তে উল্লেখ পাওয়া যায় বীরকুলের
কথায় বলে, বাঙালির পায়ের তলায় সর্ষে। সময় সুযোগ পেলেই কটাদিন ঘুরতে বেরিয়ে পড়ে সে। মধ্যবিত্ত, ভ্রমণপিপাসু বাঙালির ঘুরতে যাওয়া নিয়ে আবার একটা পরিচিত শব্দ প্রায়ই লোকমুখে শোনা যায়, ‘দিপুদা’। অর্থাৎ ‘দিঘা’ (Digha), ‘পুরী’ (Puri), ‘দার্জিলিং’ (Darjeeling)। গ্রীষ্মের ছুটি হোক কিংবা শীতের, তালিকায় সবার ওপরে বোধহয় এই তিনটে জায়গারই নাম থাকে। যদিও ব্যস্ত জীবনে ছুটির ফুরসৎ এখন খুবই কম, তাই স্বল্প দিনের ভ্রমণের উপযোগী দিঘা এখন দার্জিলিংকে ছাড়িয়ে পুরীকেও চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। করোনা আবহ খানিকটা সামলে উঠতেই আবার মানুষের ঢল নেমেছে দিঘার সমুদ্র সৈকতে (Sea Beach)। পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর প্রায় ২৬ লক্ষ পর্যটক (Tourist) দিঘায় গিয়েছেন।
সময়ের সঙ্গে দিঘা হয়ে উঠেছে মোহময়ী। শহরে ঢোকার মুখে দর্শনীয় গেট, ঝাঁ চকচকে চওড়া রাস্তা। দক্ষিণে উত্তাল সমুদ্র, সশব্দে আছড়ে পড়ছে ঢেউ। উত্তরে সার দিয়ে পর পর অজস্র হোটেল। আলো ঝলমলে এ শহর আজ বিনোদনের আখরা। সায়েন্স সেন্টার, মেরিন অ্যাকোয়ারিয়াম, অমরাবতী পার্ক, টয় ট্রেন, ফিশ হারবার, আইস প্ল্যান্ট, ছোট বড় এগারোটা মার্কেট, নিউ দিঘা (New Digha), উদয়পুর (Udaypur), শঙ্করপুর (Shankarpur), তালসারি (Taalsari) সৈকত। অদূরে ওড়িশা সীমানায় প্রাচীন শিবমন্দির, সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ ভেঙে নানা রকম সি স্পোর্টস, শঙ্করপুর মৎস্য বন্দর সহ আরও কত কি!
কলকাতার গরমের হাত থেকে রেহাই পেতে এমন উপযুক্ত বিকল্প আস্তানা খুঁজে পেয়ে গভর্নর তো বেজায় খুশি। তখন অবশ্য এলাকার নাম ‘দিঘা’ ছিল না, বীরকুল পরগণা হিসেবেই চিনতো সবাই। ওয়ারেন হেস্টিংস এলাকার নতুন নাম রাখলেন ‘ব্রাইটন অফ ক্যালকাটা’।
একটা নির্জন উপত্যকা কি করে একটু একটু করে জনপদ হয়ে উঠলো তার ইতিবৃত্ত ঘাঁটলে হদিশ মেলে অজানা অতীতের। সেখানে প্রথমে একটা লোক কি করে হঠাৎ এসে পড়ে, কি করে আর কেনই বা সেখানে বাসা বাঁধে! হয়তো পেটের দায়ে, হয়তো শান্তির খোঁজে অথবা হয়তো বা অজানাকে জানতে। তারপর একজন একজন করে অনেক হয়, এইভাবেই একটা বসতি গড়ে ওঠে। বসতি হয় একটা গ্রাম, গ্রাম হয়ে ওঠে শহর। একটা সমুদ্র, একটা নদী, একটা পথ মানুষকে টেনে আনে তার কাছে। দিঘাও তার ব্যাতিক্রম নয়। কিন্তু এই ‘দিঘা’ নামটির উদয় কোথা থেকে এ প্রশ্নটার জবাব দিতে গেলে আজও যে বাঙালিকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হবে, এ কথা সত্যই। আজকের এই পরিচিত শহরের নামকরণের আড়ালে রয়েছে এক অজানা ইতিহাস।
সময়টা ১৭৭২ সাল। বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার মসনদে মীরকাশিমকে নবাব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কিন্তু নবাবের সাম্রাজ্যের মেদিনীপুরের চাকলার দায়ভার কোম্পানির হাতে। এরকম সময়ে শীতের দেশ ইংল্যান্ড থেকে বাংলায় গভর্নর হয়ে আসেন ওয়ারেন হেস্টিংস (Warren Hastings)। এসেই বাংলার গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। গ্রীষ্মকালীন আবাসস্থল হিসাবে তখনও দার্জিলিংয়ের পরিচিতি ঘটেনি। তার ওপর সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে হিজলি নগরীর ৯ মাইল এলাকা ততদিনে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। বিকল্প হিসাবে খেজুরিতে বন্দর তৈরি হয়েছে বটে, কিন্তু সেখানেও গরম থেকে নিস্তার নেই। খুঁজতে খুঁজতে ভাগীরথীর (Bhagirathi) মোহনা থেকে সমুদ্রের তীর ধরে আরও ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে এগিয়ে বীরকুল সৈকতে এসে পৌঁছালেন তিনি। এই এলাকার মনোরম আবহাওয়া সহজেই আকৃষ্ট করলো তাঁকে। কলকাতার গরমের হাত থেকে রেহাই পেতে এমন উপযুক্ত বিকল্প আস্তানা খুঁজে পেয়ে গভর্নর তো বেজায় খুশি। তখন অবশ্য এলাকার নাম ‘দিঘা’ ছিল না, বীরকুল পরগণা (Birkul Pargana) হিসেবেই চিনতো সবাই। ওয়ারেন হেস্টিংস এলাকার নতুন নাম রাখলেন ‘ব্রাইটন অফ ক্যালকাটা’ (Brighton of Calcutta)। এখানেই তিনি মনোরম পরিবেশে তৈরি করেন একটি বাংলো। কিন্তু পরবর্তীকালে সামুদ্রিক জলচ্ছ্বাসে তলিয়ে যায় বাংলোটি। তাই ১৭৯৬ সালে চার্লস চ্যাপম্যান যখন বীরকুলে যান, তিনি হেস্টিংসের বাংলোটি দেখতে পাননি।
জানা যায়, প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো পরিচিতি নিয়ে টিকে রয়েছে দিঘার সমুদ্র সৈকত। যদিও তখন নাম ছিল ভিন্ন। ১৫০০ খ্রিস্টাব্দে রাজা সাগর রায় ছিলেন এখানকার অধিপতি। ১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দের ভ্যালেন্তিনের মানচিত্রে জায়গাটি নরিকুল নামে চিহ্নিত। পাশ দিয়ে বয়ে যেত বীরকুল নদী। ১৭০৩ সালের পাইলট মানচিত্রে এই স্থানের নাম বীরকুল। ব্রিটিশ সেটেলমেন্ট রেকর্ডে বীরকুল হল একটি লবণ পরগনা। অগাস্টাস হিকি সম্পাদিত ‘বেঙ্গল গেজেট পত্রিকা’তেও (Bengal Gazette) উল্লেখ পাওয়া যায় বীরকুলের। এই বীরকুল গ্রামের সমুদ্র সৈকতই আজকের আধুনিক দিঘা। তবে বীরকুলের নাম দিঘা হওয়ার পেছনে রয়েছে স্থানীয় লোকের অবদান। এখানকার নদী ‘চম্পা’ বঙ্গোপসাগরে (Bay of Bengal) যেখানে মিশেছে, স্থানীয়রা সেই এলাকাকে দিঘি বলে ডাকতেন। মনে করা হয়, সেই ‘দিঘি’ই এখন দিঘা নামে খ্যাত।
দিঘাকে প্রথম খুঁজে পাওয়ার কৃতিত্ব হেস্টিংস সাহেবের হলেও, সেখানকার প্রথম বাসিন্দা ছিলেন ‘হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানি’র মালিক ফ্রাঙ্ক স্নেইথ। ১৯২৩ সালে বীরকুলের অস্তিত্ব জানার পর হাতির পিঠে চেপে তিনি হাজির হন এখানে। এখানকার মনোরম আবহাওয়ায় জড়িয়ে পরেন তিনি, তৈরি করেন শখের ‘রানসউইক হাউস’ (Runswick House)। এই বাড়িটিই বর্তমানে রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদ এর অতিথিশালা। যদিও আজকের আধুনিক দিঘার জনপ্রিয়তার অন্তরালে রয়েছেন, ডঃ বিধান চন্দ্র রায় (Dr. Bidhan Chandra Roy)। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তাঁর হাত ধরেই কলকাতা-দিঘা সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা পরিকাঠামোয় উন্নতি হয়। সেসময় থেকেই বাঙালির অন্যতম ‘টুরিস্ট স্পট’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে দিঘা।
আরও পড়ুন: ঘুরে আসুন দার্জিলিংয়ের জনপ্রিয় শুটিং স্পটে
সড়ক পথের পাশাপাশি রেলপথেও এখন সহজেই পৌঁছানো যায় দিঘায়। অনেকেই আবার নিজস্ব গাড়িতেও চলে যান। দুদিনের বিরতি মিললেই যান্ত্রিক জীবনকে টাটা করে চলে যাওয়াই যায় দিঘায়। পুরোনো ইতিহাস আর আধুনিক সাজের মেলবন্ধন নিয়ে দিব্যি উজ্জ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দিঘার সৈকত। ঢেউয়ের শব্দে বিভোর হয়ে সেখানে আজ “হারিয়ে যেতে নেই মানা”।
তথ্যসূত্র –
১। উইকিপিডিয়া
২। সববাংলা.কম
৩। আনন্দবাজার পত্রিকা
