
বাংলা ছবির হাল-হকিকত | ২য় কিস্তি
এই পর্যন্ত | মুম্বাইয়ের বেশ কিছু প্রযোজনা সংস্থা মাল্টিপ্লেক্সগুলিতে একরকম একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে বলল যে, তাদের ছবি প্রদর্শন করতে চাইলে আঞ্চলিক ছবি বা অন্য কোনো ছবি দেখানো যাবে না। দেখানো গেলেও সেই ছবি হয়তো রাত ১০টায় অথবা সকাল ৮টায় একটি মাত্র স্লট পাবে। সুতরাং কলকাতা ও গুটিকয়েক জেলার সদর শহরগুলির মাল্টিপ্লেক্সের মালিকরা ব্যবসার স্বার্থেই নিরুপায় হয়ে হিন্দি ছবিকে অধিক প্রাধান্য দিতে বাধ্য হলেন। ঠিক এই সময়ই আরেকটি ঘটনা ঘটে গেল।
__________________
বাংলা ছবির হাল-হকিকত | দ্বিতীয় কিস্তি
দেশের একটি বৃহদাংশের মানুষের মুঠোফোনে অন্তহীন ডেটার অন্তর্ভুক্তিকরণ হলো। ফলে অচিরেই মানুষ প্রাদেশিকতা ও জাতীয়তার সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বসিনেমার সঙ্গে পরিচিত হতে লাগলো। বিনোদনের ক্ষেত্রটি যেন মুহূর্তেই অত্যধিক প্রশস্ত হয়ে উঠল। এযাবৎকাল পর্যন্ত হয়তো টেলিভিশন ও ফিল্ম সোসাইটিগুলির সূত্রে বাঙালি কিছু মার্কিনি ও ইউরোপিয়ান ছবির সঙ্গে পরিচিত ছিল কিন্তু এবারে তার মননে ঢুকে পড়তে লাগলো মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ আমেরিকা, পূর্ব ইউরোপ, তৎকালীন সোভিয়েট, বর্তমানের চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানান নিরীক্ষামূলক ছবিগুলি। এই ছবিগুলি আমাদের বুঝতে শেখালো, কীভাবে প্রায় শূন্য বাজেটে, রাষ্ট্রীয় শোষণযন্ত্রের জাঁতাকলের মধ্যে থেকেও সিনেমাকে সাধারণ মানুষের কাছে প্রাসঙ্গিক করে তোলা যায়। এর ফলে আমরা আমাদের আঞ্চলিক ছবির ভাবনা চিন্তার অগভীরতাকে ও তার নির্মাণের পেছনে থাকা অযত্নটিকেও চিনতে শিখছিলাম। এই প্রসঙ্গে পরিচালক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী বছর পাঁচেক আগের একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, এই সময়ের বাংলা ছবির সাধারণ দর্শক ছবির নির্মাতাদের থেকে ফিল্ম-শিক্ষার নিরিখে এতোটাই এগিয়ে গেছে, যে তাদের যা হোক কিছু একটা দেখিয়ে বোকা বানানোর বৃথা চেষ্টা না করাই ভালো।
কিউ পরিচালিত গান্ডু (২০১০) এবং আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্তের আসা যাওয়ার মাঝে (২০১৪)
রণি সেনের জাপানি স্থিরচিত্রের “প্রোভোক” ফটোগ্রাফির আদলে তৈরি করা “ক্যাট স্টিকস”-এ শহর কলকাতার প্রান্তভাগ ও সেখানে অনবরত চলতে থাকা নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্য ব্যাবহারের ইমেজ উঠে এসেছে। ঈশান ঘোষও তাঁর ছবি “ঝিল্লি”-তে কলকাতার আরেকটি প্রান্তিক এলাকা ও সেখানকার প্রান্তিক মানুষদের স্বপ্ন, আকাঙ্খা, দুঃখ, বিষাদের একটি সামগ্রিক চেহারার অভূতপূর্ব উপস্থাপনা করেছেন।
বাংলা ছবি দিকভ্রান্ত হয়ে কানাগলিতে ঢুকে যাওয়ার পরেও গতদশকে “গান্ডু”, “বাকিটা ব্যাক্তিগত”, “ফড়িং”, “আসা যাওয়ার মাঝে”-র মতো কিছু ভালো এবং জরুরি ছবি তৈরি হয়েছে। প্যাস্টিসধর্মী ছবির মধ্যে রোশনি সেন ও অনিকেত দত্ত’র “সোনাঝুরির ভূত” ছবিটি গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের চিত্রপরিচালক কানেতো শিন্দোর “ওনিবাবা” ছবিটির মোড়কে মুড়ে দেওয়া হয়েছে অনিকের দত্ত’র একটি মৌলিক ছোটোগল্প ও বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটোগল্প “মায়া”-কে। প্যাস্টিসধর্মী হলেও ছবিটির থেকে রাজনীতি ও শ্রেণির চেতনাকে মুছে দেওয়া হয়নি, আর এখানেই “সোনাঝুরির ভূত” একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি হয়ে উঠেছে। একুশ শতকে দাঁড়িয়ে ছবিটি বিশ শতকের বাংলায় ফিরে গেছে ও তৎকালীন ইতিহাসকে পুনরুল্লেখ করার চেষ্টা করেছে।
এছাড়া রণি সেনের জাপানি স্থিরচিত্রের “প্রোভোক” ফটোগ্রাফির আদলে তৈরি করা “ক্যাট স্টিকস”-এ শহর কলকাতার প্রান্তভাগ ও সেখানে অনবরত চলতে থাকা নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্য ব্যাবহারের ইমেজ উঠে এসেছে। ঈশান ঘোষও তাঁর ছবি “ঝিল্লি”-তে কলকাতার আরেকটি প্রান্তিক এলাকা ও সেখানকার প্রান্তিক মানুষদের স্বপ্ন, আকাঙ্খা, দুঃখ, বিষাদের একটি সামগ্রিক চেহারার অভূতপূর্ব উপস্থাপনা করেছেন। ঈশান ঘোষের ছবিটি বিশেষ করে মনে রাখতে হয় কারণ ছবিটি চাইলেই তার সারবত্তাকে চিরাচরিত মেলোড্রামার ফর্মে মুড়ে আমাদের কনজিউম করতে বাধ্য করতে পারত। তা না করে পরিচালক একরকম শিকলভাঙা “রেবেল” ফর্মের সাহায্য নিয়েছেন যা আখেরে তাঁর কাহিনির দ্যোতনাটিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। কিন্তু এই সবই হচ্ছিল সেই পূর্বেকার ঢঙে – একে অপরের থেকে সংযোগহীনভাবে। সেই কারণেই এই ছবিগুলির থেকে তাদের নির্মাণের সময়কার একটি সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক দ্বন্দ্বভাষ্য খুঁজে পাওয়া যায় না।
রণি সেনের ক্যাট স্টিকস (২০১৯) এবং ঈশান ঘোষের ঝিল্লি (২০২১)
’৭০-এর দশক আমাদের বুঝতে শিখিয়েছে যে উন্নত কৃষ্টির মোড়কে মোড়া আর্থ-সামাজিক দ্বন্দ্ব সমূহের সামগ্রিক পটচিত্র কখনোই একজন একাকী মানুষের সৃষ্ট একটি মাত্র শিল্পকর্মে খুঁজে পাওয়া যায় না।বৈজ্ঞানিকভাবেই সেটা অসম্ভব। সমান্তরাল ছবি ও বানিজ্যমুখী ছবির মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ঐক্যের অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা আছে, নাহলে সিনেমা থেকে তার সমাজচেতনার বোধটি বিযুক্ত হয়ে যায় এবং তা সর্বসাধারণের কাছে একটি স্থূল বিনোদনের অসাড় জড়বস্তুতে রূপান্তরিত হয়। এবং, এর ফলে সর্বার্থেই সিনেমা শিল্পমাধ্যম হিসেবে তার গুরুত্ব হারায়, যেটা সাম্প্রতিক বাংলা ছবির ক্ষেত্রে হয়েছে।
এখনকার বাংলা ছবিতে রিমেক, দক্ষিণ কলকাতার প্রেম ব্যাতীত আরেকটি উল্লেখযোগ্য ধারা রয়েছে, সেটি হলো ডিটেকটিভ থ্রিলার বা গোয়েন্দা গল্প, যা প্রতি বছরই নিয়ম করে মুক্তি পায়। এই ধারাটির সমস্যা হলো ছবিগুলির পিছুটানমুখী হওয়া বা নস্ট্যালজিয়ার উপাসনা করতে চাওয়া। সত্যজিৎ রায় বা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোয়েন্দা চরিত্রগুলিকে পুনরায় বড়োপর্দায় ফিরিয়ে এনে একরকম অতীতচারণই শুধু করা হয় এবং একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক দর্শক সেগুলি দিনের পর দিন কনজিউমও করে। আজকাল তার সঙ্গে যোগ হয়েছে কিছু অভিনেতা বাছাই করে অথবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বাংলা ছবির ইতিহাসের বিশেষ বিশেষ কিছু চরিত্রদের (যেমন মৃণাল সেন, সত্যজিৎ রায় বা উত্তম কুমার) জীবনীমূলক ছবি বা তাঁদের জীবনের কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা নিয়ে একটি আস্ত ফিচার ফিল্ম তৈরি করা। আসলে, মুম্বাইতে গত দশকে বায়োপিক একটি ব্যবসায়িক সাফল্যের ফর্মুলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। মুম্বাই এখন সেটা ছেড়ে ব্ল্যাক কমেডি, মার্ডার মিস্ট্রি, নতুন আদলে প্রেমের গল্প – এসব ফর্মুলাগুলো নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করছে। তবে এই পরীক্ষাগুলি বানিজ্যমুখী হলেও ছবিগুলির থেকে নান্দনিকতার আঙ্গিকটিকে নির্মাতারা একেবারে বাদ দিয়ে দেননি। আর এদিকে, পশ্চাৎমুখী বাংলা ছবি মুম্বাইয়ের ফেলে দেওয়া একটি ফর্মুলাকে উঠিয়ে প্যাস্টিসধর্মী বা ট্রিবিউটধর্মী ছবি বানিয়ে মধ্যবিত্ত বাঙালিকে শহুরে মাল্টিপ্লেক্সে ফেরানোর চেষ্টা করছে। বাংলা ছবির এই দক্ষিণ পন্থামুখী টান, অর্থাৎ প্রয়োজনীয় সামাজিক ক্রাইসিসগুলিকে উপেক্ষা করে পঞ্চাশ বছর আগের অতীতচারণ করা ও মুম্বাইয়ের পরিত্যক্ত ফর্মে ছবি তৈরি করতে চাওয়ার প্রবণতাটি আমাদের ছবির প্রভূত পরিমাণে ক্ষতি করছে।
একই কথা কিছু সমান্তরাল ছবির ক্ষেত্রেও খাটে। তারা বিদেশের ফেস্টিভ্যাল সার্কিটে ছবিগুলিকে নিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় বিদেশ কর্তৃক বর্জিত মন্থর গতির আদলে নিজেদের গল্পগুলো বলেন। মূল সমস্যাটা হচ্ছে, যে ফর্মগুলি দিয়ে আমরা আমাদের কনটেন্টকে মুড়ে বিক্রি করতে ছাইছি সেই ফর্মগুলিতে আর পাঁচটা ধনতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় চলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আমাদের থেকে অনেক বছর ধরেই অনেকটা এগিয়ে রয়েছে। এই অনুকরণের কণ্টিন্যিয়ুটি বজায় থাকলে আমাদের যাবতীয় সমস্যাগুলির থেকে সুদূর ভবিষ্যতেও সুরাহা মিলবে না।
কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় পরিচালিত ধূমকেতু (২০২৫)
এখনকার বাংলা ছবিতে রিমেক, দক্ষিণ কলকাতার প্রেম ব্যাতীত আরেকটি উল্লেখযোগ্য ধারা রয়েছে, সেটি হলো ডিটেকটিভ থ্রিলার বা গোয়েন্দা গল্প, যা প্রতি বছরই নিয়ম করে মুক্তি পায়। এই ধারাটির সমস্যা হলো ছবিগুলির পিছুটানমুখী হওয়া বা নস্ট্যালজিয়ার উপাসনা করতে চাওয়া।
বাংলা সিনেমার সামনে এই মুহূর্তে যেটুকু পথ দৃষ্টিগোচর হচ্ছে তা অবিসংবাদিতভাবেই দুর্গম। এই পথ এক লাফে পেরনো অসম্ভব। কাজেই, এই মুহূর্তে নির্মাতাদের আশু কাজটিই হলো বিনোদনমূলক, তবে অসাড় বা জড় নয়, কিছু ছবির নির্মাণের দ্বারা ইন্ডাস্ট্রির পুঁজির বৃদ্ধি ঘটানো। এক্ষেত্রে সুজিত দত্তর গত বছরের “খাদান” ছবিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। গুণগত মানের নিরিখে ছবিটি হয়তো আজকালকার তামিল বা হিন্দি লার্জার-দ্যান-লাইফ ছবিগুলির থেকে পিছিয়েই থাকবে, কিন্তু “খাদান” তার গল্পের প্রাসঙ্গিকতার সাহায্যেই মানুষকে পুনরায় হল-মুখী করতে পেরেছিল। এখন “ধূমকেতু” ছবিটিকে ঘিরেও তৈরি হয়েছে উচ্ছ্বাস, বাংলা সিনেমার জন্য আবার টিকিট বিক্রি হচ্ছে ব্ল্যাকে, রাজ্যের বহু শো প্রায় হাউজফুল।
দেবালয় ভট্টাচার্যের বাদামি হায়নার কবলে (২০২৪).
সম্প্রতি আরও দুটো ছবি অত্যন্ত আশাব্যাঞ্জক বলে মনে হয়েছে। একটি তথাগত মুখার্জির “পারিয়া, ভলিউম ওয়ান” ও আরেকটি দেবালয় ভট্টাচার্যর “শ্রী স্বপনকুমারের বাদামী হায়নার কবলে”। প্রথম ছবিটি নবারুন ভট্টাচার্য’র “লুব্ধক” উপন্যাসের একার্থে ভিস্যুয়াল তরজমা। তবে ছবিটি মেইনস্ট্রিম ছবির আদলে নির্মিত। আর দ্বিতীয়টি বাঙালির কেতাদুরস্ত গোয়েন্দাদের সাংস্কৃতিক দাপটের মধ্যে আমাদের স্মৃতি থেকে বিস্মৃত পাল্প গোয়েন্দা কাহিনির লেখক সমরেন্দ্র পাণ্ডের গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জির প্রত্যাবর্তন। স্যাটায়ারের ধাঁচে তৈরি ছবিটিতে হিউমারের মাধ্যমে দীপক বারবার বাঙালির অতি আধুনিকতাকে প্রশ্ন করে এবং আমাদের সংস্কৃতির অতীত আঁকড়ে বসে থাকার প্রবণতাটিকে ফেলুদা ও ব্যোমকেশের কিছু অক্ষমতার দিকে নির্দেশ করে তুলে ধরে।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই ধরনের পরীক্ষাগুলি আরেকটু নিয়মিতভাবে হলে মানুষ ফের বাংলা ছবি দেখার উৎসাহ ফিরে পাবে। এই মুহূর্তে এই ধরনের বিনোদনমূলক ছবির সাহায্যে বানিজ্যিক পুঁজি তৈরির কাজে নির্মাতারা মন দিলে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সম্ভাব্য সমান্তরাল ছবির নির্মাতাদেরও এক জায়গায় নিয়ে আসা যাবে। তবে, বাণিজ্যের প্রতি যত্নশীল হওয়া ও সেই যত্নকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লালন করতে শেখাটা অত্যন্ত জরুরি। ’৬০ ও ’৭০-এর দশক দূরদৃষ্টির অভাবে কালচারাল পুঁজি তৈরিতে মগ্ন থেকে আর্থিক পুঁজিকে যেভাবে উপেক্ষা করেছিল সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটলে একই সমস্যাগুলিরও পুনরাবৃত্তি ঘটবে ভবিষ্যতে।
যে সূত্র ধরে নিবন্ধটি শুরু করেছিলাম সেই সূত্র ধরেই শেষ দু-চার কথা বলে শেষ করব। সিনেমা এখনও আর পাঁচটা শিল্প মাধ্যমের মধ্যে নবীনতম মাধ্যম। এখনও তার নিজস্ব ভাষা সম্পূর্ণভাবে তৈরি হয়ে ওঠেনি এবং বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখনও বাকি। কাজেই, সিনেমার জাতে উঠতে পারাটা অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করে থাকে তার আশেপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অন্যান্য শিল্পমাধ্যমগুলির ক্রমবর্ধমান বিবর্তন ও তাদের এস্থেটিক্সের উন্নতির ওপরে। গত শতকের প্রায় প্রতিটি উন্নত থেকে উন্নততর বাংলা ছবিই দাঁড়িয়ে ছিল সেকালের কোনো না কোনো গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস বা নাটকের ভিত্তির ওপরে। শিল্পের এই ফর্মগুলিও তো পরবর্তীকালে যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার ফলে বাংলা ছবির বুনিয়াদকেও ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। আইপিটিএ-এর নাট্যকর্মী ও গীতিকাররা অনেকাংশেই অতীতে বাংলা ছবির রাজনৈতিক অভিমুখ নির্ধারণ করতে সাহায্য করেছিলেন। সাম্প্রতিককালে সেই ধরনের রাজনৈতিক চেতনামূলক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অভাবও বাংলা ছবিকে দিকভ্রান্ত করে তুলেছে। ফিল্ম নির্মাতাদের পাশাপাশি আমাদের সাহিত্যিক, নাট্যকার, গীতিকাররাও তো সমাজের ক্রাইসিসগুলোকে উপেক্ষা করে শেষ কয়েক বছর ধরে ইনিয়ে-বিনিয়ে বলে চলা এক ধরনের ম্যাড়ম্যাড়ে প্রেমের গল্পের প্লটেই বুঁদ হয়ে থেকেছেন। নকশালবাড়ির পরে তো আরও একটি অতি-বাম সশস্ত্র আন্দোলনে রাজ্যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। জনজীবন বিপন্ন হয়েছিল। এই পথ ও লক্ষ্যভ্রষ্ট বাম আন্দোলনের ফলে বিপন্ন জনজীবন থেকে তো একটাও “হাজার চুরাশির মা” বা “অপারেশন? বসাই টুডু” উঠে এলো না। নবারুণের ক্ষুরধার ভাষার প্রয়োগও আর কেউ করল না। বাদল সরকারের মতো এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটারও আর দেখা গেল না, আবার অনুভূতির জগৎটাও দেউলিয়া হয়ে পড়ে রইল। এতো বছরেও তো আরেকটা “ফিরে এসো চাকা”-র কাছাকাছি কোনো কাব্যগ্রন্থ লেখা হয়নি বা অমলচন্দ, বলরাম বসাকদের মতো গদ্যের ফর্ম নিয়ে সেভাবে কেউ নাড়াচাড়া করেনি। কাজেই, আমাদের অভিসম্পাতের সবটুকু নিশ্চয়ই চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রাপ্য নয়?
_______________
মতামত লেখকের নিজস্ব | বাংলা ছবির হাল-হকিকত, ক্রমশ…
