
বাংলা ছবির হাল-হকিকত | প্রথম কিস্তি
বাংলা ছবির হাল-হকিকত | প্রথম কিস্তি
বাংলা ছবি যে দুর্বিপাকে পড়েছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই দুর্বিপাকে পড়ার কার্যকারণগুলো সাম্প্রতিক পত্র-পত্রিকায় ও অন্তর্জালে যেভাবে উঠে এসেছে তা নিয়ে বিশেষ আপত্তি না থাকলেও, যেটা অপ্রত্যাশিতভাবে খানিকটা হতাশ করেছে, সেটা হল এই প্রবন্ধ-নিবন্ধগুলির নিজেদেরকে শুধুমাত্র সিনেমার নান্দনিকতার পরিধির মধ্যে সীমিত রাখার প্রবণতা। বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে আলোচনা শুধুমাত্র সিনেমার নির্মাণ ও নান্দনিকতার বৃত্তে সীমাবদ্ধ থাকতেই পারে, কিন্তু বাংলা ছবির অধোগতি সংক্রান্ত আলোচনায় ছবির শৈলীর পাশাপাশি বাঙালির ইদানিন্তন মনন ও দর্শনেরও যে ক্রমবর্ধমান অবনমন ঘটছে, সেটা উপেক্ষিত হওয়া কাম্য নয়।
আলোচনাটি একটু গোড়া থেকে শুরু করা যাক। ’৯০-এর দশকে ভারতীয় বাজারে নব্য উদারনীতি রূপায়িত হওয়ার পর থেকেই শিল্পে তার ছাপ প্রকট হয়ে উঠতে লাগল। দেশে এক ধরনের সারবত্তাহীন, বিপণনমুখী শিল্পের উৎপাদন শুরু হল। এই প্রভাব বাংলার বাজারেও দ্রুত পরিব্যাপ্ত হয়ে পড়ল, যার ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হল বাংলা ছবি; কারণ, ছয় ও সাতের দশকে সবথেকে চর্চিত এই মাধ্যমটির শরীর থেকে চেতনা ও সমকালীন রাজনীতির গন্ধ যেন একটা যুগেই উবে গেল। এই ক্ষতির স্বরূপ, আলোচনায় পরে উঠে আসবে, কিন্তু এখানে যেটা বলা জরুরি সেটা হল এই নব্য উদারনীতির প্রকোপে বাঙালি আর পাঁচটা জাতির চেয়ে তর্কাতীত ভাবেই অধিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। তার কারণটা সহজ। ভারতের অন্যান্য জাতিগুলির কেউই বি-উপনেবিশকরণের পরেতাদের আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে নিজেদের একমাত্র পুঁজি বলে মনে করেনি। আর উল্টোদিকে, বাঙালি অন্তত দেড়শ বছর ধরে সংস্কৃতিকেই তার একমাত্র পুঁজি বলে মনে করে এসেছে। কাজেই তার কৃষ্টিতে যখন আঘাতটা লাগল তখন তার দেউলিয়া হয়ে পড়াটাও শুধু সময়ের অপেক্ষাই ছিল।
বাঙালি অন্তত দেড়শ বছর ধরে সংস্কৃতিকেই তার একমাত্র পুঁজি বলে মনে করে এসেছে। কাজেই তার কৃষ্টিতে যখন আঘাতটা লাগল তখন তার দেউলিয়া হয়ে পড়াটাও শুধু সময়ের অপেক্ষাই ছিল।

সত্যজিৎ রায়ের প্রতিদ্বন্দ্বী, রাশিয়া থেকে ১,২৪,৯৯৮ টাকা লাভ করেছিল
এবারে ফিরে যাওয়া যাক ৬ ও ৭-এর দশকে। এই দশক দুটিতেই আমাদের চিত্রনির্মাতারা ভারতীয় নব্যতরঙ্গকে পথ দেখাচ্ছিল। দুর্ভিক্ষক্লিষ্ট দেশভাগ-পরবর্তী বাঙালির রিয়্যালিস্ট ইমেজারির শিকড় ছবিগুলির উৎপাদনের ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে প্রোথিত হচ্ছিল জনমানসে। তবে এই মধ্যগগণে থাকা কৃষ্টির দশক দুটি থেকেও আমরা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বুনিয়াদ শক্ত করার মতো পুঁজি সংগ্রহ করতে পারিনি। ফিল্মবেত্তা অমিতাভ নাগ তাঁর একটি সাম্প্রতিক প্রবন্ধে জানিয়েছেন যে সাতের দশকেও ব্যবসার নিরিখে বিদেশ থেকে প্রাপ্ত অর্থের হিসেব অনুযায়ী মালায়ালম ও তামিল ছবি আমাদের থেকে বেশ খানিকটাই এগিয়ে ছিল। মনে রাখার মতো একটি পরিসংখ্যান হল সত্যজিৎ রায়ের “প্রতিদ্বন্দ্বী”, যা রাশিয়া থেকে ১,২৪,৯৯৮ টাকা লাভ করতে পেরেছিল (তবে এই অংকটিও খুব আশাব্যঞ্জক বলে মনে হয় না)।
এর কারণ কি নন্দন তত্ত্বে মগ্ন বাঙালির ফিল্মের বাণিজ্যিকতার মধ্যে দেখতে পাওয়া ভালগারিজম? ও তাকে খারিজ করতে পারার মধ্যে লুকিয়ে থাকা একধরনের উন্নাসিকতা? এখানে প্রাসঙ্গিক হতে পারে তৎকালীন মহাজাতি সদনের একটি সভায় দেবকীকুমার বসুর দেওয়া ভাষণের এই অংশটি: “যাঁরা মনে করেন অন্য আর ব্যবসার মতো ফিল্মও শুধুমাত্র একটা ব্যবসা – এবং ব্যবসার ধর্ম মেনে মুনাফার লোভে যা খুশি তাই করা যেতে পারে – একটা কথা তাঁরা জেনে রাখুন। বিধবার হবিষ্যান্নের ঘিয়ে সাপের চর্বি মিশিয়ে যারা ভাবেন এ-ও একটা ব্যাবসা, ফিল্ম ঠিক সে ধরনের ব্যবসা নয়।”
মুনাফার জন্যে যা খুশি তাই করাটা বাঞ্ছনীয় বা রুচিসম্মত নয়, কিন্তু ফিল্মের নির্মাণটাই যখন নির্ভর করে থাকে প্রযোজকের পকেটের জোরের ওপর তখন নির্মিত একটি ছবির থেকে মুনাফা অর্জন করতে চাওয়াটা তো একজন নির্মাতা বা প্রযোজকের মৌলিক দাবি হওয়া উচিৎ। এই দাবিটিকে অস্বীকার করলে তার খেসারৎ আগামী প্রজন্মকেই মেটাতে হয়। যেমনটা পশ্চিমবঙ্গের হালের পরিচালকদের মেটাতে হচ্ছে।

দেব অভিনীত চাঁদের পাহাড়, বক্সঅফিসে সুপারহিট
এই সময় বাংলা ছবির পপুলার স্পেসটি, অর্থাৎ শহরতলির একক প্রেক্ষাগৃহগুলিতে “বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না” বা “বাবা কেন চাকরে”-র মতো সহজপাচ্য ছবিগুলির দাপট যেমন বাড়ল, তেমনই সমান্তরাল স্পেসটি, অর্থাৎ কলকাতার মাল্টিপ্লেক্সগুলি ভরে উঠতে লাগলো একধরনের মৃদু চিত্রভাষ্যে ব্যক্ত বুর্জোয়া ছবিতে।
বাংলা ছবির সমস্যাটা মূলত চোখে পড়তে আরম্ভ করলো সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক, তপন সিংহ, অজয় কর, রাজেন তরফদারদের পরবর্তী জামানায়। যখন নতুন একদল নির্মাতা ছবি নির্মাণের কাজে হাত দিলেন। এঁদের মধ্যে একটি দল দেবকীকুমার বসুর দেওয়া নিদানের সম্পূর্ণ উল্টো রাস্তাতেই হাঁটলেন। অর্থাৎ মুনাফার লোভে ফিল্মের নান্দনিকতার দিকটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এঁরা তৎকালীন বাংলা ছবিকে একটি হাস্যকর যাত্রার প্যারডিসুলভ চেহারা দিলেন। অন্যদিকে আরেকটি দল উচ্চবিত্তের বসার ঘরের শোভাকে (ঝাড়লণ্ঠন, দেওয়ালের পেইন্টিং) প্রদর্শন করার কাজেই এমন বুঁদ হয়ে থাকলেন যে না চাইতেও তাঁদের প্রচেষ্টাগুলি বাংলা সিনেমাকে একরকম বিপণনমুখী করে তুলল। বাংলা ছবির ধারাবাহিক দর্শকের (মধ্যবিত্ত শ্রেণি) কাছে এসব ইমেজ একধরনের মোহ হিসেবেই কাজ করল ও তাদের মধ্যে মই বেয়ে নিজের শ্রেণি ত্যাগ করে উপরের শ্রেণিটির অংশ হতে পারার সুপ্ত আকাঙ্খা – ইতিহাসের নিয়মেই – পুনরায় চাগাড় দিয়ে উঠলো। আরেকদিকে বাংলা পপুলার ছবিও দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ায় পশ্চিমবঙ্গে ভূমি সংস্কারোত্তর বিপুল কৃষক শ্রেণির হাতে যে সামান্য হলেও পুঁজি এসেছিল তা বিনষ্ট হলো তা কিছু অশালীন সস্তা বিনোদনমূলক ছবির পেছনে।

বাংলা সিনেমায় এক সময়ের ট্রেন্ড- বাবা কেন চাকর
এই সময় বাংলা ছবির পপুলার স্পেসটি, অর্থাৎ শহরতলির একক প্রেক্ষাগৃহগুলিতে “বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না” বা “বাবা কেন চাকর”-এর মতো সহজপাচ্য ছবিগুলির দাপট যেমন বাড়ল, তেমনই সমান্তরাল স্পেসটি, অর্থাৎ কলকাতার মাল্টিপ্লেক্সগুলি ভরে উঠতে লাগলো একধরনের মৃদু চিত্রভাষ্যে ব্যক্ত বুর্জোয়া ছবিতে, যার গা থেকে ঝরে পড়া মেদুরতা ক্রমশ আছন্ন করতে লাগল শহুরে বাঙালিকে। এই দ্বিতীয় ধারাটির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ।
যে বিশেষ মিলটি আশ্চর্যজনকভাবে ’৯০-এর দশক ও একুশ শতকের প্রথম দশকে এই দুটি ধারার বাংলা ছবির মধ্যেই চোখে পড়ে তা হলো ছবির গা থেকে রাজনৈতিক চেতনার দগদগে দাগটার অচিরেই বিলুপ্তি ঘটা। তবে, অবশ্যই এই সময় গৌতম ঘোষ কিছু ভালো ছবি করেছিলেন। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত একরকম “লোন ওয়ারিয়র” হয়ে মাটি আঁকড়ে তাঁর মতো করে গল্প বলে যাচ্ছিলেন। অঞ্জন দত্তর কিছু ছবিতে নানান প্রয়োজনীয় যুক্তি-তর্ক উঠে আসছিল, কিন্তু এসবই ঘটছিল একে অপরের বিছিন্নভাবে। এই সেতুহীনতার ফলে এক-একটা দীর্ঘ বিরতির পরে কদাচিৎ যদিও বা এক-আধটা ভালো ছবি উঠে আসছিল, তবুও সেগুলো ধূমকেতুর মতোই জনমানসে উদিত হয়ে আবার ধূমকেতুর মতোই বিস্মরণে তলিয়ে যাচ্ছিল।
কাজেই স্বাভাবিকভাবেই এই দুটি প্রয়াসের একটিও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। তার অবশ্য আরেকটি কারণও ছিল। মোটামুটি ’৯০-এর দশকেই, শ্রেণিগত অবস্থান নির্বিশেষে, টেলিভিশন পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশের ঘরেই ঢুকে পড়েছিল। তার ফলে, হিন্দি ছবি (যার একটি তাৎপর্যপূর্ণ বাজার আগের থেকেই পশ্চিমবঙ্গে ছিল) বাঙালির চেতনে-অবচেতনে বেশ গভীরভাবেই তার প্রভাব বিস্তার করতে লাগলো। শীঘ্রই হিন্দি ছবির পাশাপাশি তামিল ও তেলেগু ছবিও হিন্দি ডাবিঙে দেখানো শুরু হলো। এই ছবিগুলির সঙ্গে খানিকটা সময় কাটিয়েই বাংলার দর্শক তাদের স্থানীয় পপুলার ছবির নির্মাণের পেছন থেকে উঁকি মারতে থাকা অযত্নটিকে চিনতে শিখল। হয়তো সেই কারণেই একুশ শতকের প্রথমার্ধেই রবি কিনাগি, রাজ চক্রবর্তীর হাত ধরে যে ধারাবাহিক রিমেকের ট্রেন্ডটি শুরু হয়েছিল সেটি এক দশকও ঠিক করে দর্শককে ধরে রাখতে পারেনি। কারণ দর্শক টেলিভিশনের দৌলতে মৌলিক ছবিগুলি তাদের পুনর্নিমাণের আগেই দেখে ফেলছিলেন। তবুও এই ছবিগুলি যেটা করতে পেরেছিল সেটা হলো প্রসেনজিৎ-তাপস পাল-উত্তর দুই নায়ককে (দেব এবং জিৎ) শহরতলি ও গ্রামের মানুষদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। সেই কারণেই ধুঁকতে থাকা শহরতলির একক-হলগুলিও “দুই পৃথিবী” বা “চাঁদের পাহাড়ের” মতো ছবির সময় ভালোই ব্যবসা করতে সক্ষম হয়েছিল। উল্টোদিকে সমান্তরাল ধারার মুষ্টিমেয় ছবিগুলি ঋতুপর্ণ ঘোষের মৃত্যুর পরে বিবর্তিত হয়ে যে ধরনের ছবিতে পরিণত হল তা থেকে (উচ্চ) মধ্যবিত্তরাও ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিতে লাগলেন।
এই ছবিগুলির প্রতি দর্শকের প্রধান অনীহার কারণটি ছিল এদের ভৌগোলিক সংকীর্ণতা। প্রায় প্রতিটি ছবিই যোধপুর পার্ক থেকে রবীন্দ্র সরোবরের মধ্যেই ঘুরপাক খেত আর একই ধরনের প্রেমের গল্প বলত। সম্পর্কের নিবিড়তার আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণে না গিয়ে সারবত্তাহীন এই ছবিগুলি কিশোর-কিশোরীর প্রেম বা জেন জি’র যৌবনকে বিপণনের মতো করে বিক্রি করার চেষ্টাতেই লিপ্ত ছিল। কাজেই, অনিবার্যভাবে ছবিগুলির ভবিতব্যই ছিল মুখ থুবড়ে পড়া।
ধুঁকতে থাকা শহরতলির একক-হলগুলিও “দুই পৃথিবী” বা “চাঁদের পাহাড়”-এর মতো ছবির সময় ভালোই ব্যবসা করতে সক্ষম হয়েছিল। উল্টোদিকে সমান্তরাল ধারার মুষ্টিমেয় ছবিগুলি ঋতুপর্ণ ঘোষের মৃত্যুর পরে বিবর্তিত হয়ে যে ধরনের ছবিতে পরিণত হল তা থেকে (উচ্চ) মধ্যবিত্তরাও ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিতে লাগলেন।

মেনকার মতো সিঙ্গেল স্ক্রিনে হিন্দি ছবির রাজত্ব
গত পনেরো-ষোলো বছর ধরে বাংলা ছবির ক্রমাগত দর্শক সংখ্যা যে হারে হ্রাস পেয়েছে তাতে বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সিঙ্গল স্ক্রিনগুলি। উল্টোদিকে শহুরে মাল্টিপ্লেক্সগুলিও বেশিদিন একই ধাঁচের ছবি দেখিয়ে দর্শককে ধরে রাখতে পারেনি। কাজেই রাজ্যজুড়ে ধুঁকতে থাকা বাংলা ছবিকে অনায়াসেই সরিয়ে হিন্দি ছবি – মূলত শহরের বড়োপর্দায় – রমরমিয়ে তার ব্যবসা ফেঁদে বসলো। মুম্বাইয়ের বেশ কিছু প্রযোজনা সংস্থা মাল্টিপ্লেক্সগুলিতে একরকম একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে বলল যে, তাদের ছবি প্রদর্শন করতে চাইলে আঞ্চলিক ছবি বা অন্য কোনো ছবি দেখানো যাবে না। দেখানো গেলেও সেই ছবি হয়তো রাত ১০টায় অথবা সকাল ৮টায় একটি মাত্র স্লট পাবে। সুতরাং কলকাতা ও গুটিকয়েক জেলার সদর শহরগুলির মাল্টিপ্লেক্সের মালিকরা ব্যবসার স্বার্থেই নিরুপায় হয়ে হিন্দি ছবিকে অধিক প্রাধান্য দিতে বাধ্য হলেন। ঠিক এই সময়ই আরেকটি ঘটনা ঘটে গেল।…
_____________________
বাংলা ছবির হাল-হকিকত, ক্রমশ…
