
বাড়িওয়ালি (২০০০)
আধুনিক বাংলা সিনেমা মানেই বুঝি নারীকেন্দ্রিক আখ্যান। কিন্তু তার কারণটা কী? আধুনিক গল্প বলতে হলে নারীদের কেন প্রয়োজন, যেখানে নারীর জীবন আজও বিপন্ন। ৯০-এর দশক পেরিয়ে গিয়েও আজও নারী লাঞ্ছিতা, আজও সে ধর্ষিতা। আর কয়েক মাস পরেই আমরা আরও একবার মাতৃ-বন্দনায় মত্ত হয়ে উঠবো। পাড়ায় পাড়ায় রাস্তায় রাস্তায় আবার বাজবে দেবী দুর্গার মঙ্গল ধ্বনি। কিন্তু সমাজে মেয়েদের স্থান কি তাই বলে কোনো উন্নতি হবে? আমাদের জানা নেই। অন্ধকারে আলো খুঁজতে খুঁজতে গিয়ে বারবার যখন হোঁচট খাই, মুখ থুবড়ে পড়ি এই বিপন্ন সময়ের সামনে, তখন মন বারবার ফিরে যায় সিনেমাতে। আধুনিক বাংলা ছবিতে যখনই নারীর গল্প এসেছে সেখানে বারবার তার বিপন্নতার কথাই উঠে এসেছে, সেই ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০) বা ‘দেবী’ (১৯৬০) থেকে যদি একটা যাত্রার সঞ্চার হয়, তাহলে তা আরও আধুনিকতর হয়ে আমাদের মাঝখানে এসেছে ‘বাড়িওয়ালি’ (২০০০), ‘উত্তরা’ (২০০০)। গল্প বলার ধরন বদলেছে, বদলে গেছে চরিত্রের সমীকরণ। কিন্তু বিপন্নতার প্রশ্নের মুখে প্রত্যেকটি ছবি যেন নারীর সেই চিৎকারটাই তুলে ধরে। এই লেখায় মূলত আলোচনা করা হবে ২০০০-এর দশকে বাংলা নারীকেন্দ্রিক সিনেমা, যা আমরা দেখেছি, তার বাছাই করা কয়েকটি কাজ নিয়ে।
১।
বাংলা ছবিতে প্রথম বিপন্ন যে নারীর মুখ ভেসে ওঠেন, তিনি ইন্দির ঠাকুরণ। অশীতিপর বৃদ্ধা, যার চাল নেই চুলো নেই। তাকে দেখবার কেউ নেই, পরিবার অপেক্ষায় আছে কবে ঘাটের মরা বিদেয় হবে। থাকার মধ্যে আছে এক ভাইঝি আর ভাইপো, যারা প্রাণ দিয়ে পিসিকে ভালোবাসে। ইন্দির ঠাকুরণের বিষয়ে বলতে গিয়ে বিভূতিভূষণও বলেছেন, ‘বল্লালি বালাই’। অর্থাৎ বল্লাল সেনের বালাই। মানে বল্লাল সেনের বিপদ। কেন এরা বিপদের কারণ? কারণ বুঝি ওই একটা অভুক্ত পেট যেটা সারাক্ষণ হাঁড়ির দিকে চেয়ে বসে আছে খাবারের আশায়। যে পেটের প্রতি কারো দরদ নেই। এই রকমই এক নারীর গল্প ‘বাড়িওয়ালি’ (২০০০)-তে আমরা দেখতে পাই। ছবির কেন্দ্রবিন্দু হলেন প্রায় পরিত্যক্ত ভিটের এক মালকিন, বনলতা।
আধুনিক বাংলা ছবিতে যখনই নারীর গল্প এসেছে সেখানে বারবার তার বিপন্নতার কথাই উঠে এসেছে, সেই ‘মেঘে ঢাকা তারা’ বা ‘দেবী’ থেকে যদি একটা যাত্রার সঞ্চার হয়, তাহলে তা আরও আধুনিকতর হয়ে আমাদের মাঝখানে এসেছে ‘বাড়িওয়ালি’, ‘উত্তরা’। গল্প বলার ধরন বদলেছে, বদলে গেছে চরিত্রের সমীকরণ। কিন্তু বিপন্নতার প্রশ্নের মুখে প্রত্যেকটি ছবি যেন নারীর সেই চিৎকারটাই তুলে ধরে।
শুরু থেকেই এই ছবিতে ঋতুপর্ণ ঘোষ স্টিরিওটাই ভাঙতে শুরু করলেন, যেটা এই ছবির সবথেকে বড়ো জোরের জায়গা। মুখ্য চরিত্রে যে নারী অভিনয় করবেন তাঁকে তথাকথিত টেক্সটবুক সুন্দরী হতে হবে, এই স্টিরিওটাইপ থেকে ঋতুপর্ণ বেরিয়ে এলেন। সত্যজিৎ বা ঋত্বিক ছিলেন একেবারে কট্টরপন্থী। কিন্তু মৃণাল সেনের কাজে দেখি এই বিষয়গুলো তিনি ভাঙছেন। ঋতুপর্ণ গল্পের মুখ্য চরিত্রে আনলেন যাঁকে, তিনি চিরাচরিত ‘সুন্দর’ মুখের নন। কিরণ খের-এর মতো একজন অবাঙালিকে আপাদমস্তক বাঙালি বাড়িওয়ালির চরিত্রে উত্তীর্ণ করে এমন এক স্তরে কাজটিকে নিয়ে গেলেন ঋতুপর্ণ, তা ভাবা যায় না! বনলতা একলা মানুষ। সঙ্গী বলতে বৃদ্ধ চাকর আর ঘরের মাইনে করা ঠিকে ঝি মালতী (অভিনয়ে সুদীপ্তা চক্রবর্তী)। একা একা, বান্ধবহীন, প্রণয়হীন এক জীবন বনলতার। কিন্তু তাই বলে কি সেই একাকী নারীদের সাধ আহ্লাদগুলোও পুরোনো বাড়ির পলেস্তরার মতো খসে খসে পড়ে? বনলতার জীবনে এমন একজন আসে, কিন্তু প্রণয় ঘটে না। নিষ্ঠুর শিল্পীর মতো ঋতুপর্ণ জানিয়ে দেন, সমাজের যে ব্যবস্থা তা যেন কোনোদিন বাংলার এই মেয়েদের পরিত্রাণ ঘটাতে দেবে না।

উত্তরা (২০০০)
২।
বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘উত্তরা’ (২০০০)-তেও তার নিস্তার নেই। এই ছবিতে নামভূমিকায় অভিনয় করেন জয়া শীল ঘোষ। উত্তরা এক রুক্ষ বাংলার গল্প। এই আখ্যানের কেন্দ্রবিন্দুতে এক নারী, যার নাম উত্তরা। কিন্তু উত্তরা কি শুধুই একজন নারী বা আপামর নারীকূলের প্রতীক! নাকি উত্তরা আসলে মাতৃভূমি, যে মা-ভূমি প্রতিনিয়ত রিক্ত, তার চোখের জল শুকোয় না। উত্তরার স্বামী বলরাম, আর বলরামের বন্ধু ও সহকর্মী নিমাই। বলরাম আর নিমাইয়ের সংসার ভালোই ছিল। কিন্তু পুরুষ মন জানোয়ারের স্বরূপ, সে শুধু চেনে শরীর, সে শুধু বোঝে তার খিদে, সে শুধু উপভোগ করতে চায়, মসৃণ ত্বক। কিন্তু সেই ত্বকের নিচে যে একটা মন আছে, একটা কোমল হৃদয় আছে, সেটা তার গোচরে আসে না। পুরুষ মন ‘সরল’। পার্থিব জিনিস ছাড়া তারা কিছু দেখে না, বোঝে না। তাই এই দুই পুরুষ লিপ্ত হয় অনন্তকালের এক লড়াইয়ে। যে লড়াই পুরাতন, বর্বরোচিত, যে লড়াই হয়েছিল কুরুক্ষেত্রে এবং আজও তা হয়ে চলেছে। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত সর্বদাই দেখাতে চেয়েছেন প্রান্তিক মানুষদের জীবন। তাঁর কাজগুলির মধ্যে উত্তরা আজও ভারতীয় চলচ্চিত্রে মহাকাব্য হয়ে থেকে গিয়েছে।
পারমিতার একদিন (২০০০)
৩।
তবে এই সমস্ত আখ্যান তাঁদের মনের গহীনে থাকা নারীমন দিয়ে বুনেছেন পুরুষরা। কিন্তু সেই বছরই আরেক কালজয়ী ছবি মুক্তি পায়, অপর্ণা সেনের ‘পারমিতার একদিন’ (২০০০)। এ যাবৎ আমরা যে নারীকেন্দ্রিক ছবিগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি, সে সমস্ত পুরুষ-নির্মাণ। পারমিতার একদিনে নারীদের মনস্তত্ত্ব বুনছেন একজন নারী নির্মাতা। তাই এই ছবি ব্যতিক্রম। অপর্ণা সেন শহুরে। তাঁর পক্ষে আরবান গল্প অনেক বেশি জোড়ালো ভাবে বলা সম্ভব। এক্ষেত্রেও তাই। সিনেমার নামে পারমিতা থাকলেও তার সঙ্গে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে তার শাশুড়ি ও ননদের জীবনও। এই ছবি হয়ে ওঠে তিন নারীর জীবন কাব্য। তিন নারী তিনরকম ভাবে জীবনকে খুঁজে চলে, সমীকরণও ভিন্ন।
‘দহন’-এর পর আবার একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্রে দেখা যায় ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তকে। মূলত এর আগে তাঁকে বাঙালি দর্শক দেখেছে হার্ডকোর কমার্শিয়াল ছবিতে রংচঙে উচ্চকিত অভিনয়ে। কিন্তু পারমিতার একদিন বাস্তবিক ধারার ছবি, সাবলীল অভিনয়, তার সঙ্গে উপযুক্ত শব্দ প্রয়োগ এবং আধুনিক সংগীতের ব্যবহার ও প্রয়োগ এক অন্য শৈল্পিক কাজের দিকনির্দেশ করে। তবে পারমিতার শাশুড়ির ভূমিকায় অপর্ণা সেন ও ননদের ভূমিকায় সোহিনী সেনগুপ্ত – এই দুটি চরিত্রও একুশ শতকের অন্যতম দুই শক্তিশালী নারী চরিত্র। চরিত্রগুলি সাধারণ, যেন পাশের বাড়ির কেউ; কিন্তু সিনেদুনিয়ায় নতুন। ২০০০ সালে এসে বাঙালি বাড়িতে মেয়েদের ঘোমটা দেবার চল প্রায় চলেই গিয়েছিল, সেখানেই অপর্ণা সেন দেখালেন বাঙালির চিরাচরিত হেঁশেল, মধ্যবিত্তের আসবাবপত্র, অগোছালো শোবার ঘর। এই সমস্ত ডিটেইলিংয়ের জন্য পারমিতার একদিন হয়ে উঠল এই শতকের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি। চরিত্রগুলোর সংঘাত জন্ম দিল এক অসামান্য ড্রামার।
ভালো থেকো (২০০৩)
৪।
ভারত মূলত পুরুষপ্রধান দেশ। এখানে ছবি নির্মাণের ক্ষেত্রে মূল শর্ত ছিল, একজন রাগী পুরষের জীবনযুদ্ধকে তুলে ধরতে হবে। তাতেই যেন অভিষ্ট লাভ করতে পারবে প্রযোজক কূল। কিন্তু গৌতম হালদারের ‘ভালো থেকো’ (২০০৩) সেই স্টিরিওটাইপকেই চ্যালেঞ্জ করে। এই ছবি বিদ্যা বালানের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছায়াছবি। এই ছবি দেখায় আনন্দীর জীবন ও তার পারিপার্শ্বিকতাকে। আনন্দী তার গঙ্গাপারের এই দুনিয়াতে যেন রক্তকরবীর নন্দিনী। ছবিটি আমরা দেখি আনন্দীর লেন্স থেকে, যা এটিকে অন্যান্য ছবি থেকে অনেকটা আলাদা করে দেয়। আনন্দী এক জায়গায় বলে, “তোমরা আমাকে বড়ো হতে কেন বলছো?” মেয়েদের জীবনে এই বড়ো হয়ে যাওয়া একটা দায় বটে। শরীর বদলে যায়, বদলে যায় মন, আশেপাশের পুরুষরা ভিন্ন রূপে তাকে দেখতে শুরু করে। শুরু হয় অন্য লড়াই, সে হাঁপিয়ে ওঠে, আর তখনই তার বন্ধু হয় প্রকৃতি।
দোসর (২০০৬)
৫।
তবে ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘দোসর’ (২০০৬) এই অবস্থান থেকে সরে এসে, অনেকটাই মারমুখী বিদ্রোহী এক নারীমূর্তিকে আমরা দেখতে পাই। কঙ্কনা সেন শর্মা সেখানে একজন এলিট গৃহবধূ। ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালক হিসাবে বারবার নিজেকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করেছেন। এই ছবিতে কৌশিক আর কাবেরীর শহুরে জীবন রঙীন নয়, সাদাকালো। কারণ আপাত দৃষ্টিতে শহরের জীবন বুঝি অনেক বেশি বর্ণহীন। কাবেরী নতুন যুগের নারী, স্বামীর পরকীয়ার খবর শুনে সে ভেঙে পরে না। তার মাথায় এই দুশ্চিন্তা আসে না যে এর পরে কী হবে, সে কোথায় যাবে। সারা ছবি জুড়ে কাবেরী জানায় তার আপত্তির কথা। দোসর তাই একুশ শতকের নারীকেন্দ্রিক ছবিগুলির থেকে একেবারেই আলাদা হয়ে যায়। কারণ কাবেরীকে করুণার লেন্সে নয়, ঔচিত্যের আতসকাচে ধরবার চেষ্টা করি।
যদিও শেষে ঋতুপর্ণ ঘোষ মনে করিয়ে দেন, আপসহীনতায় এসে পৌঁছালেও তার চরিত্রের অন্যতম মূল পরিচয় যেন অপরের ব্যথায় দুঃখ পাওয়া। তাই স্বামী অন্য একজনের প্রেমে পড়েছে জেনেও তাকে পরিত্যাগ করতে পারে না। প্রশ্ন জাগে, এই একই ঘটনা যদি কাবেরীর সঙ্গে ঘটতো, কৌশিক কি একই ভাবে মেনে নিতে পারত? নাকি রামচন্দ্রের মতো অপেক্ষা করতো অগ্নিপরীক্ষার।
আবহমান (২০০৯)
৬।
দোসরের পরে ‘আবহমান’-এও (২০০৯) আমরা প্রায় একই প্রকারের একটা প্রচ্ছন্ন পরকীয়ার আভাস পাই। তবে নারীর প্রতি প্রেম, বা আরও পরিষ্কার করে বলতে গেলে, নায়িকাকে নিয়ে প্রেম, যেন আবহমান; তা পিতা থেকে পুত্রে কি সঞ্চারিত হয়? হয়তো হয়। কারণ নায়িকা কে? ড্রিম গার্ল? পরিচালক যখন নায়িকা নির্মাণ করেন, তখন বুঝি তিনিও তার প্রেমে পড়েন, নাহলে ছবির সঠিক নির্মাণ হয় না। নিশ্চয়ই সবার সঙ্গে এমন হয় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে এমনও হয়, যেখানে রক্তমাংসের নায়িকা পর্দা ছাপিয়ে, ন্যারেটিভ ছাপিয়ে নির্মাতার মনে ছাপ ফেলে। এই ছবিতে অনন্যা চট্টোপাধ্যায়-এর অভিনয় চোখে পড়ার মতো। আবহমানে শিখার চরিত্রের জন্য কাঠিন্য ও লাবণ্যের একটা সংমিশ্রণ দরকার ছিল, আর জরুরি ছিল নায়িকার বখাটেপনা। তার ঠিক বিপরীতে দেখি মমতা শঙ্করকে। একই গল্পের পুনরাবৃত্তি। গল্পের নায়ক অনিকেত একজন জনপ্রিয় চিত্র নির্মাতা, এক কালে ছবি বানাতে গিয়ে দীপ্তির প্রেমে পড়েন, তারপরে বিয়ে। কিন্তু কালের ফেরে আবার সেই এক অবস্থার সম্মুখীন হন অনিকেত। বর্তমান যেন প্রশ্ন করে অতীতকে, তোমার স্থান ঠিক কোথায়? তুমি কি আজও আছো? নাকি তুমি ফুরিয়ে গেছিলে বলেই আমি এলাম!
আরেক কালজয়ী ছবি মুক্তি পায়, অপর্ণা সেনের ‘পারমিতার একদিন’। এ যাবৎ আমরা যে নারীকেন্দ্রিক ছবিগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি, সে সমস্ত পুরুষ-নির্মাণ। পারমিতার একদিনে নারীদের মনস্তত্ত্ব বুনছেন একজন নারী নির্মাতা। তাই এই ছবি ব্যতিক্রম।
অবশেষে (২০১১)
৭।
ক্রমাগত নারীকেন্দ্রিক কাজ করে যাবার জন্য ঋতুপর্ণ ঘোষ একেবারে ইন্সট্রুমেন্টাল। একইসঙ্গে একুশ শতকে আমরা দেখি বাংলার তথাকথিত হার্ডকোর কমার্শিয়াল ছবির পালাবদল। মেজাজের পালাবদল, আবার মুখেরও পালাবদল। ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন হাওয়া নিয়ে এলেন জিৎ ও দেব। কলকাতার বাইরে বেরিয়ে আবার বাংলা ছবি গ্রাম-মফস্সলেও উদযাপিত হতে শুরু করল। এই ধরনের সুপারহিট সিনেমাগুলি যেখানে হিরোকেন্দ্রিক, সেখানে টেলিভিশনের সিরিয়াল সম্পূর্ণ নারীকেন্দ্রিক (আজও)। একটা বিভাজন লক্ষ করা গেল, শহর ও মফস্সলের নব্য বখাটে ছেলে ও মেয়েদের জন্য সজ্জিত পুরুষ হিরো এবং বাড়ির মহিলাদের জন্য মধ্যবিত্ত নারীকেন্দ্রিক সিরিয়াল।
নির্বাসিত (২০১৫)
একুশ শতকে মেয়েদের মুখ্য করে বানানো ছবিগুলির তালিকায় উঠে আসবে রূপা গাঙ্গুলি অভিনীত ‘অবশেষে’ (২০১১)। বলাই বাহুল্য যে, রূপা বাংলার একজন প্রথমসারির অভিনেত্রী দের একজন। একজন মধ্যবয়স্ক মহিলার বোহেমিয়ান সত্তা এ ছবির মূল কেন্দ্রে। একইসঙ্গে সেই চরিত্রের মধ্যে কাজ করেছে ঘর আর বাইরের দ্বন্দ্ব। অবশেষের পর জোরালো ভাবে যে ছবি সমাজে বিদ্রোহী নারীর অবস্থান নিয়ে কথা বলে তা হল ‘নির্বাসিত’ (২০১৫)। প্রথমবার আমরা চূর্ণি গাঙ্গুলিকে দেখলাম একইসঙ্গে অভিনেতা ও পরিচালকের আসনে। তসলিমা নাসরিনের জীবনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই ছবি চূর্ণি ছাড়া অন্য কোনো বাঙালি অভিনেত্রী এই ভূমিকায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হতে পারতেন না।
মায়ানগর (২০২৪)
৮।
শেষ করব আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্তের ‘মায়ানগর’ (২০২৪) দিয়ে। এভাবেই এখনও টিমটিম করে বাংলায় নারীকেন্দ্রিক ছবি তৈরি হচ্ছে। তবে ঋতুপর্ণ-পরবর্তী যুগে দাঁড়িয়ে সংখ্যায় অনেক কম। মায়ানগর উত্তর কলকাতাবাসী এক মধ্যবয়স্ক মহিলাকে ঘিরে। যে মহিলা স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্ন যা প্রতিদিন অসংখ্য মধ্যবিত্ত চোখ বুজলেই দেখতে পায়। এলার স্বপ্ন একটু অন্যরকম। এলা বুঝি এক মরীচিকাকে ধরতে চায়। এলার সংসার গ্যাদগেদে। একমাত্র মেয়েকে সে হারিয়েছে। এলা দুঃখ পায়, কিন্তু এক জায়গায় আটকে না থেকে স্বপ্নের সন্ধানে এগিয়ে যায়। ‘যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল’ যেখানে প্রতিবাদের নারীকে দর্শায়, মায়ানগর দেখায় আধুনিক বাঙালি নারীর ডিজায়ারকে। এমন বিষয় নিয়ে খুবই কম ছবি তৈরি হয়েছে বাংলায়। মেয়ের ডিজায়ারকে সর্বদাই ভদ্র বাঙালি আলোচনাতে অছ্যুৎ করেই রেখে দেওয়া হয়েছে। তবে এই ছবিতে আমরা এলার জিতে যাওয়ার গল্প দেখি না। কোথাও গিয়ে এলা হয়ে ওঠে মায়ানগর কলকাতার একপ্রকার প্রতিরূপ। এই ছবিতে আমরা একেবারে নতুন করে আবিষ্কার করি শ্রীলেখা মিত্রকে। এলার চরিত্র যেন তাঁরই প্রাপ্য। একইসঙ্গে এই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নারীকেন্দ্রিক ছবি হয়ে থেকে যাবে মায়ানগর।
_______________
*একুশ শতকের বাংলা নারীকেন্দ্রিক সিনেমার বাছাই বঙ্গদর্শন কর্তৃপক্ষের নিজস্ব

