
উদ্দেশ্য প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ
পঞ্চাশ বছরেরও বেশি পুরোনো সাতটি গাছকে ক্রেনের সাহায্যে উপড়ে তোলা হচ্ছে। নিয়ে যাওয়া হচ্ছে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। নিষ্পত্তির জন্য নয়, বরং প্রতিস্থাপনের উদ্দেশ্যে। জুলাই, ২০২৪-এর শেষার্ধে এমন নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী রইল সমগ্র হাওড়া স্টেশন চত্বর। উন্নয়ন যেন প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের পথে অন্তরায় না হয়ে দাঁড়ায়, সে বিষয়টি নজর রাখলো পূর্ব রেলওয়ে (Eastern Railways – ER)-এর অন্তর্গত হাওড়া ডিভিশন।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন স্টেশনের গাছগুলি নির্বিচারে কেটে দেওয়ার জন্য বারংবার খবরের শিরোনামে উঠে আসছিল হাওড়া ডিভিশনের নাম। যদিও ঝড়ে গাছের ডালপালা ভেঙে রেললাইনে পড়ে যাওয়ার ফলে সংঘটিত বিপদগুলি থেকে বাঁচতেই এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল কর্তৃপক্ষের তরফে, তবুও এতে বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি হওয়ার কারণে পরিবেশপ্রেমীরা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। এমতাবস্থায় প্যাটফর্ম সংলগ্ন গাছেদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে ইতিহাস রচনা করলো হাওড়া ডিভিশন।
গাছ পুনর্বাসনের এই পদক্ষেপটি যথার্থ অর্থেই নজিরবিহীন, কারণ এটিই ভারতীয় রেলের তরফে গাছ প্রতিস্থাপনের প্রথম ও একমাত্র উদ্যোগ।
হাওড়া জংশন। পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের সবচাইতে কর্মব্যস্ত রেল স্টেশন। ১৮৫৪ সালে কর্মসম্পাদনা শুরু করেছিল স্টেশনটি। সে বছরেরই ১৫ই অগাস্ট হাওড়া-হুগলী মেইন লাইনে চলেছিল প্রথম পাব্লিক ট্রেনটি। এটি একাধারে ভারতের প্রাচীনতম রেলওয়ে স্টেশনও বটে। সময়ের সঙ্গে জুটেছে ‘হেরিটেজ’ তকমা। হাওড়া স্টেশনের নাম শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে গঙ্গা-ঘেঁষা লাল ইটে গাঁথা স্টেশন চত্বর আর এ সংলগ্ন বড় গাছগুলো, যেগুলো কয়েক দশক ধরে শিকড় ছড়িয়েছে স্টেশনের চারপাশ জুড়ে।
পরিবেশের বেড়ে চলা তাপমাত্রার দিকে নজর রেখে, ২০১৭ থেকে রেল কর্তৃপক্ষ এই স্টেশনটির সবুজায়নের উদ্যোগ নেন। চলতি বছরের শুরুতেই দেশের মধ্যে প্রথম ‘গ্রিন স্টেশন’-এর সম্মান পেয়েছিল হাওড়া স্টেশন। বরাবরই সংশ্লিষ্ট ডিভিশনাল রেল কর্তৃপক্ষ পরিচ্ছন্নতা ও সবুজায়নের কথা মাথায় রেখে, রেলস্টেশনটিকে পরিবেশবান্ধব করে তুলতে বিভিন্ন সময়ে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছেন। প্রযুক্তিগত সাহায্য নিয়ে ২৩টি প্ল্যাটফর্ম এবং মূল স্টেশন ভবনের ছাদে মোট তিন মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরপ্যানেল বসানো হয়েছে। এই প্যানেল স্টেশনের দিনের বেলার বিদ্যুতের চাহিদা (মোট ছয় হাজার ওয়াট) যোগান দেয়।
এছাড়াও, বৃষ্টির জল ধরে রাখবার জন্য জল সংরক্ষনের উপযোগী ছাউনি ও ছাদের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে এই জল পরবর্তী সময়ে স্টেশন চত্বর ধোয়ার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। হাওড়া স্টেশনের ২৩ নং প্ল্যাটফর্মটির সামনে নির্মিত হয়েছে ‘কন্সট্রাকশন পিট’ যাতে বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করে পিভিসি ট্যাঙ্কে পাথর ও বালি ভরাট করে প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টির জল পরিশোধন করা যায়।
কিছু মাস আগে শুরু হয়েছে হাওড়া স্টেশনের ২৪ নং প্ল্যাটফর্মের নির্মাণকার্য। কিন্তু এ কাজে বাধ সেধেছিল নির্বাচিত এলাকায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল সাতটি প্রাচীন গাছ। এগুলির মধ্যে রয়েছে তিনটি অশ্বথ, তিনটি বট ও একটি কদম গাছ। গাছগুলির বয়স অনুমান করা যায়, পঞ্চাশ বছরের চাইতেও বেশি। তাই না কেটে, সেগুলিকে প্রতিস্থাপন করবার সিদ্ধান্ত নিলো রেল কর্তৃপক্ষ। যদিও এ কাজ যতখানি ব্যয়বহুল, ততটাই সময়সাপেক্ষ।
গাছগুলি চিরস্থায়ী ভাবে প্রতিস্থাপনের জন্য দুই মাস আগে থেকেই প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয়। গাছের গোড়া থেকে কাণ্ডের স্তরের উপরের কয়েক ফুট ছেড়ে রেখে, এর উপরিভাগ ছাঁটাই করা হয়। নতুন পাতা গজানোর জন্য প্রয়োগ করা হয় সাফ (SAAF) ও নিমসিল তেলের মতো রাসায়নিক। নির্মীয়মাণ স্টেশন চত্বর থেকে সরিয়ে, রেল মিউজিয়ামের বিপরীত দিকের জমি বেছে নেওয়া হয়েছিল গাছগুলিকে প্রতিস্থাপনের জন্য। উক্ত জমিতে আগে থেকেই পরিখা খনন করে, সেখানে জৈব রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা হয়েছিল। প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার শুরুতে গাছের চারপাশে প্রায় দুই মিটার গভীর অবধি মাটি খনন করা হয়। এ ক্ষেত্রে শিকড়গুলি যাতে অক্ষত থাকে, সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এরপর ক্রেনের সাহায্যে গাছগুলিকে টেনে তোলা হয় ও আনুমানিক এক কিলোমিটার দূরে নতুন জায়গায় নিয়ে গিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়। পরিখার মধ্যে গাছ বসিয়ে, মাটি দিয়ে শিকড়গুলি ঢেকে দেওয়া হয় এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে জল ঢালা হয় তাতে। সমস্ত প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে সময় লেগে যায় প্রায় দশ ঘণ্টা।
পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নের মাঝে সমতা বজায় রাখতেই এই উদ্যোগ। এই প্রাচীন গাছগুলি বায়ু পরিশোধন করে, বাস্তুতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে এবং জলবায়ু পরিবর্তনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বৃক্ষরোপণ ব্যতীত পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করবার অন্য কোনো উপায় নেই। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে যে গাছ রোপিত হবে, তার উৎপাদিত অক্সিজেন প্রাণের যোগান দিয়ে চলবে আগামী প্রজন্মগুলিকে। এমনটাই মনে করেন ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজার সঞ্জীব কুমার মহাশয়।
গাছ পুনর্বাসনের এই পদক্ষেপটি যথার্থ অর্থেই নজিরবিহীন, কারণ এটিই ভারতীয় রেলের তরফে গাছ প্রতিস্থাপনের প্রথম ও একমাত্র উদ্যোগ। আশা রাখা যায়, গাছেদের পুনর্বাসনের এই ঘটনা ভবিষ্যতের সমজাতীয় সম্ভাবনাগুলিকে পথ প্রদর্শন করবে।
