মৃত গাছের ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ – যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঐতিহাসিক সবুজের অভিযান

কীভাবে কেন কোন সময় গাছ মারা যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখবে বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি

রাজনীতির ম্যানিফেস্টোতে গাছের কথা লেখা থাকে? বোধহয় না। মানুষ যেমন গাছ কাটে, সেই মানুষই কিন্তু আবার গাছের পরিচর্যা করে। হাতড়াতে থাকে শেকড়, যা মানুষের অধিকার। গাছেরা কথা বলতে পারে না, কিন্তু গাছের হয়ে কথা বলে যদি একদল মানুষ? স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে গাছ নিয়ে আলাদা পড়াশোনা কখনও হয়, কখনও হয় না। বইয়ের পাতার বাইরে বেরিয়ে যদি গাছকে ছুঁয়ে দেখা যায়, তখনই তৈরি হবে গাছের সঙ্গে মানুষের বন্ধুত্ব। তার সুযোগ করে দিচ্ছে কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (Jadavpur University)।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার স্নেহমঞ্জু বসু মারফত জানা যায়, ক্যাম্পাসে এই মুহূর্তে পূর্ণবয়স্ক গাছের সংখ্যা ১৬০৮টি। তার মধ্যে অনেক গাছই ঠিকঠাক যত্ন পায় না। এবার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গাছেদের যত্ন নিতে বদ্ধপরিকর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শুধু তাই নয়! মানুষের মতো গাছেরও ক্ষয় আছে, মৃত্যু আছে। তাই কোনো গাছ মারা গেলে, মৃত গাছের জন্য তৈরি হবে ডেথ সার্টিফিকেট। কীভাবে গাছটি মারা গেল, তাও খতিয়ে দেখা হবে।

গাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা – ঐতিহ্যবাহী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এ এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ। রেজিস্ট্রার স্নেহমঞ্জু বসু বঙ্গদর্শনকে জানিয়েছেন, “ক্যাম্পাসে বড়ো গাছগুলোর অডিট রিপোর্ট আছে আমাদের কাছে। নাম্বারিংও করা হয়েছে। কোন গাছ কেন মারা যাচ্ছে, এরপর সেখানে কোন গাছ পোঁতা হবে ইত্যাদি খতিয়ে দেখাই কমিটির কাজ। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাড়াও এই কমিটিতে রয়েছে কলকাতা পুরসভা, বনবিভাগ। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের মাস্টারমশাইরাও রয়েছেন।” তাঁর কথায় জানা গিয়েছে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে রয়েছে এমন কিছু গাছ, যাদের গড় বয়স পঞ্চাশের অধিক। স্বাস্থ্যপরীক্ষা করে তাদের ঠিক কেমন চিকিৎসার প্রয়োজন, কীভাবে স্বাস্থ্য রক্ষা করা যায়, কোন কোন কারণে মৃত গাছগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কীভাবে সেগুলির পুনঃস্থাপন সম্ভব – সব কিছু নিয়ে তৈরি হয়েছে এই বিশেষ কমিটি।

গাছ নিয়ে বিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে এমন উদ্যোগ দেশে এই প্রথম। গত দুই বছর বিধ্বংসী ঝড়ের সম্মুখীন হয়েছে বাংলার গাছ। আমফান-ইয়াস ঘূর্ণিঝড়ে শিকড় উপড়ে পড়ে গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক বয়স্ক গাছের। শুধু যে গাছগুলি মারা গেছে এমন নয়, মানুষেরও অনেকসময় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, বিল্ডিংয়ের ক্ষতি হয়েছে। আমফান-ইয়াস কবলিত গাছগুলিকে শুরুতেই শনাক্ত করা হচ্ছে। এবং আর কী কী গাছ রয়েছে, যেগুলি পরবর্তীকালে ঘূর্ণিঝড়ের কবলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তা দ্রুত চিহ্নিত করা হচ্ছে।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে রয়েছে এমন কিছু গাছ, যাদের গড় বয়স পঞ্চাশের অধিক। স্বাস্থ্যপরীক্ষা করে তাদের ঠিক কেমন চিকিৎসার প্রয়োজন, কীভাবে স্বাস্থ্য রক্ষা করা যায়, কোন কোন কারণে মৃত গাছগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কীভাবে সেগুলির পুনঃস্থাপন সম্ভব – সব কিছু নিয়ে তৈরি হয়েছে এই বিশেষ কমিটি।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে,

১। ক্যাম্পাসে নিয়ম না মেনে গাছ কাটা হলে শিক্ষক-ছাত্রদের অনুরোধ করা হয়েছে, দ্রুত সম্ভব কর্তৃপক্ষকে জানানো।
২। গাছগুলির মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করবে কমিটি। এমনকি মৃত গাছগুলির নাম নথিভুক্ত করা হবে।
৩। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে রয়েছে বহু দুষ্প্রাপ্য গাছ। সেগুলির মৃত্যু হলে তার পরিবর্তে কোন গাছ বসানো যায়, কীভাবে তাদের যত্ন নেওয়া যায়, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে কমিটি।
৪। কিছু বছর আগেই গাছগুলির অডিট করা হয়। প্রতিটি গাছের নম্বর অনুযায়ী তাদের প্রত্যেকের তথ্য সংগৃহীত রয়েছে।
৫। দুষ্প্রাপ্য গাছগুলির ম্যাপিং করা হচ্ছে।
৬। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চাইছে জিপিএস ট্যাগিং করাতে। তাতে অনলাইনেই জানা যাবে গাছগুলির অবস্থান।
৭। ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। মানুষের মতো এবার প্রয়াত গাছেরও ‘ডেথ সার্টিফিকেট’-এর ব্যবস্থা থাকবে। কবে, কীভাবে, কেন, কোন সময় গাছটির মৃত্যু হল – সে বিষয়ে লেখা থাকবে সার্টিফিকেটে।

অডিট রিপোর্টে জানা গিয়েছে, পূর্ণ বয়স্ক ও নতুন মিলিয়ে ১৮০০-র উপর গাছ আছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে। তার মধ্যে আমফানে প্রায় ১৮০টির বেশি গাছ পড়ে গিয়েছিল। তাতে প্রচুর বিল্ডিংও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এই কাজে বিশেষভাবে সহায়তা করেছেন স্থপতি বিদ্যার প্রাক্তন ছাত্র দীপঙ্কর সাহা। ইতিমধ্যেই ২৫টি গাছের পুনঃস্থাপন সম্ভব হয়েছে। কমিটির চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন অধ্যাপক আশিস মজুমদার, আহ্বায়ক রেজিস্ট্রার স্নেহমঞ্জু বসু।

বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরলে চোখে পড়বে কদম, রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া, কাঁঠাল, আম, জাম, নারকেল, মেহগনি, শিমুল, পলাশ, ছাতিম, অমলতাস, জারুল, নাগকেশর, দেবদারু, শিরিষের মতো অসংখ্য গাছ। যাদবপুরকে দেখে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও এই পথে হাঁটতে চাইছে। চাইছে গাছদের ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ তৈরি করা হোক। বলাই বাহুল্য, আগামীদিনে এইসব নথি গবেষণার কাজেও সহায়তা করবে। ২০১৯ সালে যাদবপুর ক্যাম্পাসে গাছ রক্ষার বিষয়ে একটি নির্দেশিকা প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে গাছ কাটা রুখতে কয়েকটি কড়া পদক্ষেপের কথা জানানো হয়। নির্দেশিকায় বলা হয়েছিল, কর্তৃপক্ষের অনুমতি না-নিয়ে ক্যাম্পাসের কোনও গাছ তো কাটা যাবেই না, এমনকি, কেউ ইচ্ছেমতো ডালপালাও ছাঁটতেও পারবেন না। যদি কোথাও এমন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে, তা হলে ওই সময় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা রক্ষী এবং আধিকারিকরা জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে খুশি প্রকৃতিপ্রেমী সকল মানুষ। এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজে সহায়তা করছেন ছাত্রছাত্রীরাও।

ছবিঃ নিজস্ব

Developed by DXDasia