
গান শেখাচ্ছেন শিলি আনন্দধারা সংগীত অ্যাকাডেমির সমাজসেবী অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায়
গান শিখছেন অসুররা। সড়গড় হচ্ছে সারেগামাপা। এমনকি রাগ সংগীতেও দখল আনছে অসুর সম্প্রদায়ের শিশুরা। ডুয়ার্সের নাগরাকাটা ব্লকের ঘন জঙ্গলের মধ্যে বসবাস অসুরদের। সেখানেই পিছিয়ে পড়া এই জনজাতির সংস্কৃতি বিকাশের চেষ্টা করছেন একদল সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ। এই সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের সংগীত শেখানোর গুরুভার গ্রহণ করেছে আনন্দধারা সংগীত অ্যাকাডেমি।
পদবী অসুর। যাঁদের নিয়ে বহু মত প্রচলিত আছে। তাঁরা সত্যিই মহিষাসুরের বংশধর কিনা, তার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বহু গবেষক পুঁথি দেখে, তথ্য জোগাড় করে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, এ সব নেহাতই কাল্পনিক। আর যা সত্যি, তা হল অসুর সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব। যাঁরা নিজেরাই নিজেদের মহিষাসুরের উত্তরসূরি বলে ভেবে নিয়েছিলেন। এঁরা মনে করেন, দুর্গা তাঁদের পূর্বসূরিদের যুদ্ধে বধ করেছেন। সে কারণে দুর্গাপুজোর দিনগুলোতে দরজা বন্ধ রাখেন, বাড়ি থেকে বেরোন না কেউই। এঁরা সাধারণত চা-পাতা তোলেন, কৃষিকাজ করেন, কেউ কেউ অন্যের দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। তাঁদের ভাষার নাম আসুরি। সেখানে চাল হয়ে যায় চাউল, ডাল হয়ে যায় ডাইল। তাঁদের জীবনচর্যায় জড়িয়ে বহু পুজো – সারনা পুজো, নাওয়া খানি, গোহালি পুজো, খালিয়ান পুজো, হোলি পুজো, শিকারি পুজো, বনগারি পুজো আরও কত কী!
পিছিয়ে পড়া এই অসুর সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের গান শেখাচ্ছেন শিলি আনন্দধারা সংগীত অ্যাকাডেমির সমাজসেবী অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায়। সম্প্রতি ডুয়ার্সের নাগরাকাটা কেরন চা বাগানে অনগ্রসর শিশুদের নিয়ে অনুষ্ঠানও হয়।

পিছিয়ে পড়া এই অসুর সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের গান শেখাচ্ছেন শিলি আনন্দধারা সংগীত অ্যাকাডেমির সমাজসেবী অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায়। সম্প্রতি ডুয়ার্সের নাগরাকাটা কেরন চা বাগানে অনগ্রসর শিশুদের নিয়ে অনুষ্ঠানও হয়। সেখানে আনন্দধারার কর্ণধার অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায়, লাটাগুড়ি গ্রিন ওয়েলফেয়ারের কর্ণধার ও আনন্দধারার কার্যকরী সদস্য অনির্বাণ মজুমদার-সহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
গান শেখানোর অনুষ্ঠান শুরু করার সঙ্গে ৪০ জন শিশুকে পেন্সিল, রবার, গানের খাতা প্রদান করেন অনিন্দিতা। গানের পরীক্ষায় বসানোর জন্য ফর্মও পূরণ করা হয়। অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায় বঙ্গদর্শনকে জানিয়েছেন, “অসুর সম্প্রদায়ের এই ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন গান শিখছে সাদ্রী ভাষায়। এমনকি কিছু বাংলা গানও সাদ্রী ভাষায় অনুবাদ করে অনগ্রসর এই সম্প্রদায়কে তালিম দেওয়া হচ্ছে।”

পিছিয়ে পড়া অসুর সম্প্রদায়ের সঙ্গে সঙ্গে চা বাগান ও বস্তির অন্য আদিবাসী শিশুদের মধ্যেও সংস্কৃতি প্রসারের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আদিবাসীদের গ্রামে গিয়ে শিশু ও পড়ুয়াদের গানের পরীক্ষায় বসানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গতবছর এভাবে ৪৮ জন পরীক্ষায় বসেছিল এবং তাদের যাবতীয় খরচ প্রদান করেছিলেন অনিন্দিতা।

গরুমারা, লাটাগুড়ি, রামসাই, বুধুরাম এলাকার প্রান্তিক শিশুরা গতবছর পরীক্ষা দিয়েছিল। এবছর নাগরাকাটা নন্দু মোড় চা বাগানের পাশে ঘাসমারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫০ জন স্কুল পড়ুয়া পরীক্ষায় বসবে বলে জানায়। আবার কেরণ চা বাগান থেকে পরীক্ষায় বসছে ১০ জন। সবমিলিয়ে এবছর ১০০ জনেরও বেশি পড়ুয়াকে পরীক্ষাতে বসানোর সুযোগ করে দেওয়া হবে বলে জানাচ্ছেন অনিন্দিতা। সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে এই অসামান্য প্রয়াস নিয়েছেন তিনি। সপ্তাহে দুদিন শিলিগুড়ি থেকে ১৮০ কিলোমিটার দূরে ডুয়ার্সের প্রত্যন্ত এলাকায় যাচ্ছেন অনিন্দিতা। অসুরদের গান শেখানোর এই উদ্যোগের পাশে দাঁড়িয়েছেন সমাজের সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ।
