যদিও ঝাড়খণ্ডে সরকারি স্তরে বা প্রশাসনিক কাজকর্মে বাংলার কোনো ব্যবহারিক কার্যকারিতা নেই
“বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা—
সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক হে ভগবান।।”
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যে স্বপ্ন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) দেখেছিলেন বাঙালিদের জন্য, তা কিন্তু বাংলার বাইরে মুখ থুবড়ে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ডেই (Jharkhand) তা দেখা গেল। এই রাজ্যে সরকারি স্তরে বা প্রশাসনিক কাজকর্মে বাংলার কোনো ব্যবহারিক কার্যকারিতা নেই। সর্বত্র হিন্দি ভাষার রাজত্ব। স্থানীয় স্কুলগুলিতে হিন্দি, ইংরেজি, সংস্কৃত ভাষাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হলেও সেখানে নেই বাংলার কোনো স্থান।
অথচ ঝাড়খণ্ডে প্রচুর বাঙালির বাস৷ কয়েক প্রজন্ম ধরে তাঁরা অবিভক্ত বিহার তথা অধুনা ঝাড়খণ্ডে বসবাস করছেন৷ ফলে তাঁদের শিশুপাঠ্যে নেই বাংলা ছড়া, কবিতা বা গদ্য৷ ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’ কিংবা ‘পাখি সব করে রব’-এর অমোঘ ছন্দ বাঙালি শিশুদের অজানা৷ এ-ও কি কম যন্ত্রণার! এরকম অবস্থায় স্থানীয় বাঙালিরা ভাষা নিয়ে বহু আন্দোলন করলেও তার ফল আদতে কিছুই মেলেনি৷ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী রঘুবর দাস বাংলা ভাষাকে ঝাড়খণ্ডের দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে চালু করার কথা বললেও তা বাস্তবায়িত হয়নি৷ বাঙালির সন্তান, অথচ বাংলা ভাষায় লেখাপড়ার কোনো সুযোগ নেই। এর সমাধানে ঘাটশিলায় (Ghatshila) বাঙালিরাই বিভূতিভূষণের (Bibhutibhushan Bandyopadhyayp) স্মৃতি বিজড়িত গৌরীকুঞ্জে চালু করেছেন ‘অপুর পাঠশালা’ (Apur Pathshala)।

পাঠশালার পড়ুয়ারা
মাতৃভাষা যে কোনো জাতির কাছে কতটা প্রিয়, তা বলার অপেক্ষা থাকে না। বিশেষ করে বাংলা ভাষার সম্মানে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম দেখেছে বাংলাদেশ বা ভারতের আসামের বরাক উপত্যকা (Barak Valley)। কাজেই ঘাটশিলার বাঙালিরাই যে ভাষার জন্য কিছু করবেন, তা বলাই বাহুল্য। তাঁরাই সাহিত্যিক বিভূতিভূষণের ১২৫তম জন্মদিবস উপলক্ষ্যে ২০১৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর থেকে কচিকাঁচাদের বাংলা শেখার জন্য শুরু করেছিলেন ‘অপুর পাঠশালা’। বাঙালি সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যকর্মে যেমন ঘাটশিলার বিভিন্ন অঞ্চল বারেবারে উঠে এসেছে, তেমনি তাঁর ব্যক্তিজীবনেও ছিল ঘাটশিলার দারুণ প্রভাব। তিনি ঘাটশিলার গৌরীকুঞ্জেই (Gaurikunj) তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। সেই গৌরীকুঞ্জের ভিটেতেই শতরঞ্জি পেতে সপ্তাহের একটি দিন (রবিবার) করে শুরু হয়েছে ‘অ-আ-ক-খ’ শেখার অবৈতনিক ‘অপুর পাঠশালা’।
তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী রঘুবর দাস বাংলা ভাষাকে ঝাড়খণ্ডের দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে চালু করার কথা বললেও তা বাস্তবায়িত হয়নি৷ বাঙালির সন্তান, অথচ বাংলা ভাষায় লেখাপড়ার কোনো সুযোগ নেই।

গৌরীকুঞ্জের প্রবেশদ্বার
বর্তমানে এই পাঠশালায় ১২০ জন ছাত্রছাত্রী। শিক্ষক রয়েছেন ছয় জন। গৌরীকুঞ্জ উন্নয়ন সমিতির সভাপতি তাপস চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, “এখানে শহরের কিছু এলাকা বাদ দিয়ে ৮০ শতাংশ মানুষ বাংলায় কথা বলেন। বিগত ২০ বছর ধরে বাংলা ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আগে স্কুলগুলোতে বাংলা পঠনপাঠন থাকলেও এখন স্কুলে বাংলা পড়ানো হয় না। এমনকি এখানে বাংলা বইও পাওয়া যায় না। অথচ বাংলাই এখানে সবচেয়ে বড়ো মাধ্যম। নিজেদের মধ্যে আদানপ্রদানটুকুও হয় বাংলার মাধ্যমে। নতুন প্রজন্ম তো বাংলা পড়তে পারে না। এমন অবস্থা হয়েছে যে পঞ্জিকা দেখতে গেলে বাংলা জানা লোক আনতে হবে বাইরে থেকে।”
গৌরীকুঞ্জের কেয়ারটেকার তথা উন্নয়ন সমিতির সদস্য প্রদীপ ভদ্র বলেন, “বিভূতিভূষণের বাড়ি ঘিরে ঘাটশিলার পাঁচটা বাংলাভাষী ক্লাব মিলে এই গৌরীকুঞ্জ উন্নয়ন সমিতি তৈরি হয়েছিল। তখন থেকেই এই গৌরীকুঞ্জের দেখভালের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কাজকর্মের চিন্তা ছিল। বাংলা ভাষার অধিকারের জন্য আন্দোলনও হয়েছে। বিভূতিভূষণের পুত্রবধূ মিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্মতিতে আমরা অপুর পাঠশালা নিয়ে এগিয়েছি।”

পাঠশালার বাইরের দৃশ্য
প্রতি রবিবার গৌরীকুঞ্জে অপুর পাঠশালায় হাজির হয় পড়ুয়াদের দল। নিচু থেকে উঁচু শ্রেণির পড়ুয়া সকলেই নিয়ম মেনে আসে। এদের মধ্যে সবাই যে শুধু বঙ্গ সন্তান, তা কিন্তু নয়। তাপস বলেন, “উড়িয়াভাষী, হিন্দিভাষী, আদিবাসী সব শিশুদেরই ভাষা শেখার প্রবল আগ্রহ। আসলে ভাষা সকলেই শিখতে চায়। ঘাটশিলা কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান-সহ আরও অনেক অধ্যাপক, শিক্ষক এখানে এসে পড়ান।”
পড়ুয়াদের কেমন লাগে বাংলা পড়তে? সপ্তম শ্রেণির ছাত্র শুভম মণ্ডলের কথায়, “প্রতি রবিবার করেই এখানে আসি বাংলা শেখার জন্য। আমি যে স্কুলে পড়ি, সেখানে বাংলা পড়ানো হয় না। এখানে অ-আ-ক-খ শিখছি। ভালোই লাগছে বাংলা শিখতে।” শুভমের মতো বিশাল কুমার, কবিতা প্রধানরা প্রত্যেকেই হাজির হয় ভাষার টানে। তারা আপাতত ‘বর্ণপরিচয়’ চিনেছে। লিখতেও পারছে অক্ষরগুলো। বাকিটা? তাপস চট্টোপাধ্যায় বলেন, “আমাদের বাংলা শেখার কোনো কার্যধারা নেই। বাচ্চারা মনের আনন্দে যাতে ভাষা শিখতে পারে, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। কোনো জোরজবরদস্তি নেই। নেই আপাতত পরীক্ষা পদ্ধতি। বর্ণপরিচয় দিয়ে শুরু করেছি। মুখে মুখে বাংলা কবিতা, গল্প বলা হয়। বাংলার মহাপুরুষদের জীবনীও শোনানো হয়।”

পাঠশালার ছাত্ররা
ওরা যেন সব ছোটো ছোটো অপু। গ্রামের প্রসন্ন গুরুমশাইয়ের মুদিখানাও কি দেখতে পেলাম, ওই সপাসপ বেত চালাচ্ছেন! কিন্তু কোথায় সেই ‘পথের পাঁচালি’-র পাঠশালায় ভীত অপু, সাহিত্যিকের ভিটায় কচিকাঁচাদের কলরব সুবর্ণরেখা ছুঁয়ে ফেরার সময় কানে বাজতে থাকল।
ছবিঃ প্রতিবেদক