ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : এলেম নতুন দেশে

বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ১০

  গত পর্বের পর  

ক্যাপ্টেন টমাস বুশির  পাঠানো ‘প্ল্যান অফ দ্য ডে’ (Plan of the day)-তে আজ সকাল সাড়ে পাঁচটায় ছিল রেভিল (Reveille)। আগেকার দিন হলে বাগপাইপের বাজনায় সকলকে ঘুম থেকে তোলা হতো। আজকাল সেই বাদ্যযন্ত্রও নেই আর সেই বাজিয়েরাও উধাও৷ তাই জাহাজের লাউডস্পিকারে একটি পুরুষ কণ্ঠ ঠিক সকাল সাড়ে পাঁচটায় ঘুম ভাঙিয়ে বলল ‘নাউ হিয়ার দিস’ (Now hear this!)৷ সব ঘোষণার  গোড়াতেই এই কথাগুলি বলা হয়। পুরুষ কণ্ঠ জানালো,

“রেভিল (Reveille)! দ্য টাইম ইজ নাউ ফাইভ থার্টি এ এম (The time is now 5:30 AM)। মুরিং স্টেশনস! (Mooring stations!)”

এই নির্দেশ পাওয়া মাত্র কিছু নির্দিষ্ট ছাত্র-ছাত্রীর দায়িত্ব হলো তরাক করে ঘুম থেকে উঠে, জাহাজের দড়িদড়া গুছিয়ে ফেলা যাতে বন্দরে পৌঁছেই আমাদের জাহাজকে কষে বেঁধে ফেলা যায়। বুঝলাম আমরা পুয়ের্তো রিকো (Puerto Rico) পৌঁছে গেছি। আর কিছুক্ষণের ভেতরে আমাদের জাহাজ নোঙর ফেলবে সান হুয়ান (San Juan) বন্দরে। প্ল্যান অফ দ্য ডে-তে  লেখা ছিল সকাল সাতটায় পাইলট আমাদের জাহাজে উঠবেন। উনি এই অঞ্চলের নাব্যতার সব ঘোতঘাত জানেন। তাই ওনার সাহায্যে আমরা নিরুপদ্রবে বাঁধা পড়বো এই নতুন ঘাটে। জানালা দিয়ে ঘুমন্ত সান হুয়ানকে দেখে মনে হল সত্যিই এক নতুন দেশে এসে পড়েছি। আমাদের জাহাজটা বাঁধা হবে পুরোনো সান হুয়ান এলাকায়। দূরের বাড়িগুলি বেশিরভাগই হালকা গোলাপি অথবা হলুদ রঙের। আমেরিকার তুলনায় অনেক ছোটোখাটো বাড়ি দেখা যাচ্ছিল বন্দরের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে। এর মধ্যে ব্যস্তসমস্ত হয়ে যে টাগ বোটটি আমাদের ঠেলাঠেলি শুরু করলো, উঁকি মেরে দেখলাম, তার নাম ব্রুকলিন ম্যাকালিস্টার (Brooklyn McAllister)।

হাতে কিছুটা সময় থাকায় বিছানায় গড়িমসি করে ভাবছিলাম গত কয়েকটা ব্যস্ত দিনের কথা। ক্লাস চলছিল পুরোদমে৷ গতকাল ছিল পরীক্ষার দিন। গত কয়েক সপ্তাহে আমাদের ক্লাস করেছে বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী। কুড়ি পঁচিশ জনের এক একটি দল দুদিন করে আমাদের ক্লাসে ছিল৷ এছাড়া অন্য দিনগুলিতে প্রতিটি ছাত্র ঘুরে ঘুরে অন্যান্য দপ্তরে শিক্ষা প্রাপ্ত হয়েছে। ট্রেনিং নিয়েছে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং, মেরিন ট্রান্সপোর্টেশন ইত্যাদি বিভাগে। এইসব বিষয়ে একটা পরীক্ষা ছিল গতকাল। আমাদের বিভাগের পরীক্ষা ছিল সকাল সাড়ে নটায়৷ কিন্তু তার আগে সকাল আটটায় একটা মুশকিলের কাজ করতে হলো আমায়। বছর কুড়ি বয়সের এক ছাত্র গত বছরে দুবার মাতাল অবস্থায় কলেজে ধরা পড়েছিল। আমেরিকায় যদিও ছেলেমেয়েরা ষোলো বছরে গাড়ি চালায়, আঠেরো বছরে যুদ্ধে যোগ দিয়ে নরহত্যার অনুমতি পায়, কিন্তু মদ খাবার বেলায় বয়স বাধা আছে একুশে। তার ওপরে আমাদের কলেজ হল রেজিমেন্টেড (regimented)। অর্থাৎ আধা মিলিটারি কায়দায় ডিসিপ্লিনের ওপর কড়া নজর রেখে এখানে শিক্ষাব্যবস্থা চলে। ক্লাসের লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাডেট ডিসিপ্লিনের নিয়ম এবং নিয়মভঙ্গের যাবতীয় শাস্তি বিশদভাবে লেখা আছে রেজিমেন্টাল ম্যানুয়ালে (regimental manual)। ছেলেটি সেই সব নিয়মকানুন উপেক্ষা করে গত বছরে দুবার শাস্তি পাওয়া সত্ত্বেও ট্যাম্পা বন্দরে অতিরিক্ত মাত্রায় মদ্যপান করে তৃতীয়বার একুশে আইনে ধরা পড়েছে।

সকাল আটটায় ছিল সেই ছাত্রটির বিচার সভা আর সেইখানে ওর ভাগ্য নির্ধারণের দায়িত্বে ছিলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন, চিফ ইঞ্জিনিয়ার এবং অন্যান্য বিভাগীয় প্রধান শিক্ষকেরা। এদের মধ্যে একজন ছিলাম আমি৷ নির্দিষ্ট সময়ে ছাত্রটি সাদা ধবধবে ইউনিফর্ম পরে আমাদের সামনে শুকনো মুখে উপস্থিত হল৷ ওকে আত্মপক্ষ সমর্থন করে কিছু বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়াতে জানালো যে নিজের কৃতকর্মের জন্যে ও বিশেষ অনুতপ্ত। আগুপিছু চিন্তা না করে ও যে কাজ করেছে তা ক্ষমার অযোগ্য তবু যদি আমরা ওকে মাফ করি তাহলে ও ভবিষ্যতে এই ধরনের শৃঙ্খলা ভঙ্গ আর কিছুতেই করবে না। চকচকে বিশাল কাঠের টেবিলের এক প্রান্তে বসে ছাত্রটিকে তখন খুব অসহায় আর শীর্ণকায় মনে হচ্ছিল। ক্যাপ্টেন ঠান্ডা গলায় ওকে জানালেন যে কলেজের নিয়ম অনুযায়ী যে শাস্তি প্রাপ্য সেটা ওকে দেওয়া হবে। শেষ সিদ্ধান্ত অবশ্যই নেবেন কলেজের প্রেসিডেন্ট। ছাত্রটি আমাদের ধন্যবাদ জানিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পরে শুরু হল আলোচনা আর ভোট। বেশিরভাগই চাইছিলেন ছেলেটিকে তখনই জাহাজ থেকে বের করে দিয়ে এক বছরের জন্য কলেজ থেকে সাসপেন্ড করতে। আমার বিশেষ অনুরোধে ওরা ছাত্রটিকে এই যাত্রাটুকু শেষ করবার সুযোগ দিতে রাজি হলেন। যেহেতু এই সমুদ্রযাত্রা বেশ খরচসাপেক্ষ তাই এখনই ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলে ওর পরিবারের খুব আর্থিক ক্ষতি হত। ওর এক বছরের নির্বাসন ও সমস্ত ক্লাসের ছাত্রদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ার কথা ভেবে বড়ো ভারাক্রান্ত লাগছিল। পরীক্ষার খাতা দেখতে দেখতে ভাবছিলাম মস্ত চকচকে কাঠের টেবিলের এক কোনায় শুকনো মুখে বসে থাকা ধীরে ধীরে শীর্ণ হয়ে যাওয়া ছেলেটির কথা।

বেশিরভাগই চাইছিলেন ছেলেটিকে তখনই জাহাজ থেকে বের করে দিয়ে এক বছরের জন্য কলেজ থেকে সাসপেন্ড করতে। আমার বিশেষ অনুরোধে ওরা ছাত্রটিকে এই যাত্রাটুকু শেষ করবার সুযোগ দিতে রাজি হলেন। যেহেতু এই সমুদ্রযাত্রা বেশ খরচসাপেক্ষ তাই এখনই ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলে ওর পরিবারের খুব আর্থিক ক্ষতি হত।

দুপুরের ভেতরে সব খাতা দেখে, ফলাফল অফিসের বাইরে নোটিশবোর্ডে টাঙিয়ে দেবার পরে ঠিক করলাম জাহাজের শিক্ষক এবং অন্যান্য অফিসারদের জন্য রান্না করবো। এর আগে একদিন ওদের মাংস রেঁধে খাইয়েছিলাম। জাহাজে বিশাল বিয়ে বাড়ির মতো পাত্রে রান্না হয় আর সেই পাত্রে খুন্তি নাড়তে গেলে মনে হয় কোদাল দিয়ে কোপাচ্ছি যেন। আমাকে এই কাজে সাহায্য করে জাহাজের পাকা রাঁধুনি। ঠিক করেছিলাম পাঁচফোড়ন, ধনে, জিরে, আদাবাটা দিয়ে আলু ফুলকপির ডালনা রেঁধে খাওয়াব। তাতে থাকবে টমেটো আর কড়াইশুঁটি। অনেকদিন ধরে সেদ্ধ আলু, সেদ্ধ গাজর, সেদ্ধ ব্রাসেলস স্প্রাউট, সেদ্ধ বাঁধাকপি, সেদ্ধ ফুলকপি অস্থির করে মারছিলো। আলু ফুলকপির ডালনার সঙ্গে আর একটু সময় দিতেই হয়ে গেল কিশমিশ দেওয়া হলুদ মিষ্টি পোলাও। সন্ধেবেলার ডিনারটা বেশ দেখার মতো হয়েছিল। কোথায় পড়ে রইল পাস্তা, সেদ্ধ সবজি আর সেদ্ধ মাংস। সকলে চেটেপুটে পোলাও আর আলু ফুলকপির ডালনা রসিয়ে রসিয়ে খেলো৷ থার্ড ইঞ্জিনিয়ার একটা ছোটো এলাচ চিবিয়ে ফেলে একটু কেলেঙ্কারি করেছিলেন বটে তবে মোটের উপরে সকলে তরিবত করে খেয়েছে বলা চলে।

হঠাৎ জাহাজের তলায় ঘড়-ঘড় শব্দে বুঝলাম ব্রুকলিন ম্যাকালিস্টার তার কাজে সফল হয়েছে। ছাত্ররাও দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলেছে ইউ.এস.টি. এস কেনেডিকে সান হুয়ান বন্দরে৷ স্নান সেরে, এক গ্লাস লেবুর রস আর একটা ক্রিম চিজ মাখানো বেগেল খেয়ে, হাতে গোয়েন্দা ব্রেসলেট পরে, আমি সান হুয়ানের ফুটপাতে। বাইরে বেরিয়ে আবিষ্কার করলাম যে এখানেও পর্যটকদের জন্য ট্রলি বাস আছে। এই সবুজ রঙের বাসে উঠলে কোনো পয়সা দিতে হয় না। আমাদের বাস পুরোনো সান হুয়ানের উত্তর কলকাতামার্কা কবলস্টোনের সরু সরু রাস্তা ধরে এগোলো আর আমার চোখের সামনে আর এক নতুন দেশ ধীরে ধীরে তার সব রহস্য উন্মোচন করতে লাগল৷ এখানে আঠেরো বছর বয়েস হলেই সুরাপানের স্বাধীনতা রয়েছে। রেজিমেন্টাল ম্যানুয়ালের তাই কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। যস্মিন দেশে যদাচরেৎ। কেবল বেহেড মাতাল হয়ে লটরপটর না করলেই হলো। দেখলাম আমাদের জাহাজের কদমছাঁট চুলের ছাত্রগুলি পিলপিল করে ছড়িয়ে পড়েছে শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে। সদ্যশাস্তিপ্রাপ্ত ছাত্রটির কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে তারা ঝকঝকে নরম গরম সূর্য গায়ে মেখে, চেখে নিচ্ছে ক্যারিবিয়ানের মিষ্টি রাম। দোকানের লাউডস্পিকারে গান গাইছে বব মার্লি। টাইট জিন্সের হাফপ্যান্ট আর অতিসংক্ষিপ্ত টপ পরে অলিভ রঙা পুয়ের্তো রিকান সুন্দরীরা বাজনার তালে তালে ভেসে বেড়াচ্ছে রোদ ঝলমলে কবলস্টোনের রাস্তায়।

“এলেম নতুন দেশে–
 তলায় গেল ভগ্ন তরী, কূলে এলেম ভেসে॥
…
নাম-না-জানা প্রিয়া
নাম-না-জানা ফুলের মালা নিয়া    
হিয়ায় দেবে হিয়া।
……
এলেম নতুন দেশে–
 তলায় গেল ভগ্ন তরী, কূলে এলেম ভেসে॥”

*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ (Madhubani Ghosh)। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

Developed by DXDasia