ঠগিনী : তরুণ মজুমদারের ‘বোল্ড’ সিনেমা

বাংলা সিনেমায় নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভ

সারা পৃথিবীর ফিল্মি দুনিয়া জুড়ে এই মুহূর্তে একটা প্রশ্ন চারিদিকে আবার করে রব তুলছে, চলচ্চিত্র নির্মাতারা কোন দিকে ঝুঁকবেন? তাঁদের পাথেয় কী হওয়া উচিত? শিল্প না বাণিজ্য? তার থেকেও বড়ো কথা দর্শক কী দেখতে চাইছে? যে দর্শক সত্যজিৎ রায়ের ভাষায় ‘হুইমসিক্যাল’, যাদের রোড রোলার চালিয়ে ফ্ল্যাট করে দেওয়া উচিত। সহজ প্রশ্ন তার সহজ উত্তর হয়তো আছে, কিন্তু এই প্রশ্ন উত্তরের সন্ধান করতে গিয়ে এমন একটা ছবি সম্পর্কে কথা বলবো যা নিয়ে বাংলার মানুষ খুব কম চর্চা করেছে, হয়তো যে সময় ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল, তখনও খুব একটা আলোচিত হয়নি। তাই বোধহয় সেই ছবির নির্মাতা সেই রকম জটিল মনস্তত্ত্বের ন্যারেটিভ নিয়ে আর কাজ করলেন না।

সাধারণত তরুণ মজুমদারের কথা যখনই ওঠে বা আলোচিত হয় তখন মূলত তাঁর পারিবারিক বা সামাজিক বা শিশুদের নিয়ে বানানো ছবিগুলো নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা হয়। আর ঠগিনী হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতল গহ্বরে।

আলোচ্য ছবিটির নাম ঠগিনী (১৯৭৪), পরিচালক তরুণ মজুমদার (Thagini by Tarun Majumdar)। মনে রাখা দরকার সেই একই বছর ‘সোনার কেল্লা’-ও মুক্তি পেয়েছিলো। সাধারণত তরুণ মজুমদারের কথা যখনই ওঠে বা আলোচিত হয় তখন মূলত তাঁর পারিবারিক বা সামাজিক বা শিশুদের নিয়ে বানানো ছবিগুলো নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা হয়। আর ঠগিনী হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতল গহ্বরে। তার আরেকটা বড়ো কারণ বোধকরি নব্বইয়ের দশকে যে সময় দূরদর্শনে রবিবার করে যে সমস্ত বাংলা ছবি দেখানো হতো, তখনও খুব বেশি এই ছবিটিকে সম্প্রচারিত করা হয়নি।

ঠগিনী বোধহয় বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম প্রথম নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভ। ক্রিস্টোফার নোলানের দৌলতে নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভ কী সেটা নিয়ে আশাকরি খুব বেশি বাক্য ব্যয় করতে হবে না। ঠগিনীর মূল বিষয় ছাড়াও এই ট্রিটমেন্টটাও ছবিটাকে ভীষণ ভাবে ‘ইউনিক’ করে রাখে। বাংলা সিনেমাতে খুব বেশি নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভের কাজ দেখা যায়নি। যদিও ঋতুপর্ণ ঘোষ তাঁর ‘রেনকোট’ ও ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’-কে সেইভাবেই ট্রিট করেছিলেন।

ঠগিনী দেখার পরে, যে সংলাপ মাথায় এল তা হল, “গোলি নাহি মারেঙ্গে সালে কো, কেহকে লেঙ্গে উস্কি।” তাহলে গল্পটা একটু ছোটো করে বলা যাক। ‘অযান্ত্রিক’ খ্যাত সুবোধ ঘোষ রচিত এই গল্পের মূলে তিনজন নিরপরাধ ব্যক্তি। হরিপদ মুখার্জির (অভিনয়ে উৎপল দত্ত) একমাত্র কন্যা করবী (অভিনয়ে সন্ধ্যা রায়) এবং বঙ্কু মণ্ডল (অভিনয়ে রবি ঘোষ)। হরিপদ ছিল একটি ব্যাঙ্কের হিসাবরক্ষক, একবার অফিস পাড়ায় দুপুরের খাবার খেতে সে যখন অফিস থেকে বেরোচ্ছে, সেই সময়, বঙ্কু তার পকেট কাটার একটা বিফল প্রচেষ্টা করে এবং হাকডাকে ধরা পড়ে পথচলিত জনতার কাছে গণধোলাই খায়। কিন্তু হরিপদ যখন জানতে পারে, যে তার টাকার ব্যাগ আসলে বেহাত হয়নি, সেই পকেটমার কেবলই বিফল প্রচেষ্টা করে পালাতে গেছে, তখন সে জনতার মধ্যে থেকে বঙ্কুকে উদ্ধার করে। বঙ্কু গরিব ঘরের সন্তান, অভাবের সংসার, এক গাদা দেনায় জর্জরিত এবং মা ভীষণ রকম অসুস্থ; তাই সে হরিপদর পকেট কাটার চেষ্টা করে। হরিপদর ওপর মায়া হয় এবং বঙ্কু যাতে তার মায়ের চিকিৎসা করতে পারে, তাই তাকে কিছু টাকা হাতে দেয় হরিপদ। পরের দিন বঙ্কু হাজির হয় হরিপদর ব্যাঙ্কে সাদা থান পরে, তার মা তখন মারা গেছে, পৃথিবীতে আর কেউ নেই। সেই তখন থেকেই বঙ্কু হয়ে ওঠে হরিপদর ছায়া সঙ্গী।

এর বহু বছর পরে, তত দিনে হরিপদর স্ত্রী মারা গেছে, একমাত্র সম্বল মাতৃহারা কন্যা করবী। হরিপদর ওপর তখন কন্যা দায়, বিয়ের জন্য টাকা জোগাড় করতে সে হিমশিম খাচ্ছে। বেশ কিছু পুরোনো বন্ধু ও আত্মীয়দের কাছে গিয়ে কোনো ফল হয় না, তারা সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয়। সেই সময় দেখা হয় স্কুল জীবনের বন্ধু রাজেন মুখার্জির সঙ্গে। রাজেনকে সমস্ত অসুবিধের কথা খুলে বলে হরিপদ। রাজেন বড়ো ব্যবসায়ী, সে তার সুহৃদ হরিকে বলে টাকার জন্য না ভাবতে, সে নিঃসন্দেহে তার বন্ধুর মেয়ের বিয়ের জন্য বাকি অর্থ সঞ্চয় করে আনবে। কিন্তু ঠিক বিয়ের দিন রাজেন মুখার্জী সেই টাকা নিয়ে বেপাত্তা হয়ে যায়। মরিয়া হয়ে বঙ্কু ব্যাঙ্কে লকার থেকে টাকা নিয়ে আসে, যাতে বিয়েটা হয়ে যায়। কিন্তু ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ জানতে পেরে হরিপদ ও বঙ্কু দুজনেরই জেল হয়। জেল থেকে বেরিয়ে এই ত্রয়ী ফের একত্রিত হয়। হরিপদ জানতে পারে যে মেয়ে তার প্রাক্তন বাড়িওয়ালার দ্বারা প্রতারিত হয়ে বাড়ি ছাড়ে ও পেটের দায়ে মানুষের বাড়িতে বিধবা ঝি সেজে কাজ করতে থাকে। করবী তখন প্রতিহিংসা পরায়ণ। সে জেনেছে যে তার বাবার ক্যান্সার, তাই পরিকল্পনা করে যে তারা বিত্তশালীদের ঠকিয়ে হরিপদর চিকিৎসার টাকা তুলবে।

সেই সময়ে মূলত ভারতীয় পরিচালকরা খুব বেশি লম্বা কন্টিনিউয়াস শট নিতেন না। কিন্তু ঠগিনীর শুরুর দৃশ্যটাই একটা লম্বা টানা শট। ফিল্মের মুন্সিয়ানা নিয়েও যখন কথা হয়, তখন তরুণ মজুমদারের উল্লেখ না করে যাবার জোগাড় নেই। বাণিজ্যিক ভাবে সফল ছবিই বানিয়ে গেছেন তিনি।

এ হেন জটিল ন্যারেটিভে কটা বাংলা সিনেমা হয়েছে সেটা সত্যি বলা মুশকিল। যে গল্পটা বর্ণনা করা হল, তার মজা বহু গুণ বেড়ে যায় তরুণ মজুমদারের নন-লিনিয়ার ট্রিটমেন্টের ফলে। শুধু তাই নয়, এর পাশাপাশি এ-ছবির অন্যতম সম্বল উৎপল দত্ত, রবি ঘোষ এবং সন্ধ্যা রায়। মনে পড়ছিল, তরুণ মজুমদারের সঙ্গে উৎপল দত্তের অন্যান্য কাজগুলোর কথা। মঞ্চের অভিনেতা উৎপলকে সব থেকে ভালো ভাবে কেউ যদি ব্যবহার করে থাকেন, তাহলে তিনি বোধহয় তরুণ মজুমদার। ঠগিনীতে যে অসহায় ও জটিল মনস্তত্বের সমন্বয়ে উৎপল দত্ত, হরিপদর চরিত্রকে নির্মাণ করেন সেটা নিঃসন্দেহে উৎপল দত্তের ফিল্মোগ্রাফিতে একটা বিশেষ স্থান রাখবে। এর সঙ্গে যুগল বাঁধেন রবি ঘোষ। ছোটো মিষ্টি হাসি খুশি মানুষটিকে দেখে যে ভীষণ রকম ভয় লাগতে পারে, তা আমরা জেনেছিলাম, জনঅরণ্য দেখে। ঠগিনীতে আমরা দেখলাম তার আরেকটা দিক। “Angry Young Man”। সারা ছবির চলনে রবি ঘোষকে দেখি বছর চল্লিশের কাঁচা পাকা তেল না দেওয়া উসকো-খুসকো চুল, গালে দাড়ি। খাদ্যাভাব ও আর্থিক অনটন এক যুবকের মুখে কী অভিব্যক্তি আনতে পারে, তা কয়েকটিমাত্র দৃশ্যে রবি ঘোষ যে দক্ষতার সঙ্গে শুধুমাত্র চোখের মধ্যে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা নিঃসন্দেহে স্বাভাবিক বা ন্যাচারালিস্ট অভিনয়ের ক্ষেত্রে মাস্টার ক্লাস।

সেই সময়ে মূলত ভারতীয় পরিচালকরা খুব বেশি লম্বা কন্টিনিউয়াস শট নিতেন না। কিন্তু ঠগিনীর শুরুর দৃশ্যটাই একটা লম্বা টানা শট। ফিল্মের মুন্সিয়ানা নিয়েও যখন কথা হয়, তখন তরুণ মজুমদারের উল্লেখ না করে যাবার জোগাড় নেই। বাণিজ্যিক ভাবে সফল ছবিই বানিয়ে গেছেন তিনি। আবার ন্যারেটিভ নিয়ে বিভিন্ন রকমের এক্সপেরিমেন্টও করে গেছেন তনুবাবু। তরুণ মজুমদারের প্রথম সিনেমা পলাতক। কনভেনশনাল হিরোকে নিলে ভয় অনেকটা কম, অন্য রকমের গল্প কাটতি হবে সহজে। কিন্তু তিনি বেছে নিলেন নবাগত অনুপ কুমারকে। ঠগিনীর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায় ছবিটার বিষয় ও তার প্রতিস্থাপন। একজন মেয়ে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে জাল বিয়ে করছে এবং ফুলশয্যার রাতে বিয়েতে পাওয়া সমস্ত গয়না নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। গল্পটা দেখে প্রথমে মনে হয়েছিল, বিশাল ভরদ্বাজ পরিচালিত সাত খুন মাফ (২০১১)-এর কথা। এখানে কন্যা কখনওই স্বামীদের সঙ্গে শয্যায় সঙ্গম করে না। কিন্তু সে যুবতী মেয়ে। করবীকে যে তার বাড়ির মালিকের হাতে শারিরীক ভাবে নির্যাতিত, তা ছবির অনেক শেষে এসে আমরা জানতে পারি। কিন্তু সমাজের লোলুপ পুরুষদের দৃষ্টি তাকে কীভাবে দেখে, তার ক্যামেরার পিওভিতে ধরতে কোনো রকম কুণ্ঠার নিদর্শন দেখাননি তরুণ মজুমদার।

আবার যখন ক্লাইম্যাক্স দেখলাম, তখন মনে হল গ্যাংস অফ ওয়াসিপুরের ডায়ালগ, “গোল নাহি মারেঙ্গে সালে কো কেহ কে লেঙ্গে উস্কি”। ক্লাইম্যাক্সে জানা গেল, কলকাতার যে অঞ্চলে এসে এই ত্রয়ী গা ঢাকা দিয়েছে, রাজেন মুখার্জির বাড়ি হয়তো আশেপাশেই। এই ঘটনা দেখানোর আগে অবধি পরিচালক দর্শকদের জানাননি যে কী কারণে হিসাবরক্ষক হরিপদ ও তার সঙ্গী বঙ্কুকে ব্যাঙ্ক থেকে টাকা চুরি করে মেয়ের বিয়ে দিতে হয়েছিল। ঠিক যেন তুরুপের তাস। গল্পের শেষভাগে গিয়ে যখন এই তথ্য আমরা জানতে পারি, একটা অন্য প্রাণ পায় ঠগিনী। করবী, হরি ও বঙ্কু স্থির করে যে রাজেন মুখার্জীর ছেলেকে তারা চিরতরে জীবনের মক্ষম ঘা দেবে এবং এই ক্ষেত্রে রাজেন মুখার্জীর ছেলেকে প্রেমের ফাঁদে ফেলা ও তাকে ঠকিয়ে মক্ষম শোধ নেবার জন্য করবী নেয় সম্পূর্ণ চার্জ। ঠিক যেন, গোলি নাহি মারেঙ্গে সালে কো কেহকে লেঙ্গে উস্কি।
 

Developed by DXDasia