
করোনার মধ্যেই শুরু হচ্ছে ইগ্নাইট বার্লিনের পুজো, কলকাতার মৃৎশিল্পী মিন্টু পালের ফাইবার গ্লাসের একচালার দুর্গা প্রতিমা পৌঁছে গিয়েছে সেখানে
“শুনতে পেলাম পোস্তা গিয়ে তোমার নাকি মেয়ের বিয়ে!”
এখন কার্যত মেয়ের বিয়ের মতোই ব্যস্ততা ‘ইগ্নাইট বেঙ্গলিজ ইন বার্লিন’-এর সদস্যদের। প্রথম পুজো বলে কথা! বাংলার শরৎ এখন তাদের উঠোনে। নরম রোদ্দুরে মাখা আকাশে আগমনীর খোলা চিঠি। কোভিডের দমবন্ধ করা সময় থেকে যে উৎসবের ভেলায় চড়ে খুশিতে ভেসে যেতে চাইছে এই বাংলা, বার্লিনও চায় তার সওয়ারি হতে।
করোনার মধ্যেই শুরু হচ্ছে ইগ্নাইট বার্লিনের পুজো। এ যেন মুক্তির আগমনী। কলকাতার মৃৎশিল্পী মিন্টু পালের ফাইবার গ্লাসের একচালার দুর্গা প্রতিমা ইতিমধ্যে সেখানে পৌঁছে গিয়েছে। তাকে ঘিরে শুরু হয়েছে সাজসজ্জা। কথা হচ্ছিল এদের নবতম সদস্য ঐশ্বর্য বাগের সঙ্গে। পুজো উপলক্ষে জার্মানিতে বসবাসকারী কচিকাঁচাদের সুকুমার রায়ের ‘সৎপাত্র’ শেখাচ্ছেন তিনি। সাগরপারের দেশে দুর্গাপুজোয় সপ্তমী থেকে শুরু হয়ে যাচ্ছে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেখানে ছোটরাও আবৃত্তিতে অংশ নিতে চায়, তাই এখন জোরকদমে অনলাইনে চলছে আবৃত্তি শেখার কর্মশালা। জার্মানিতে জন্ম এই কচিকাঁচাদের। তারা বাংলা পড়তে পারে না, তাই সুকুমার রায়ের কবিতাখানি ইংরেজি হরফে তাদের সামনে তুলে ধরতে হচ্ছে। এরকম অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নিচ্ছিলেন ঐশ্বর্য। তিনি বলেন, “সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় কর্ণকুন্তী সংবাদ, দেবতার গ্রাস ইত্যাদি আবৃত্তির জন্য বেছে নিয়েছি।”
‘ইগ্নাইট বেঙ্গলিজ ইন বার্লিন’ একটি অলাভজনক সংস্থা। গ্রিক শরণার্থী থেকে ভারতীয়দের অক্সিজেন দিয়ে সাহায্য, ২৪ ঘণ্টার টেলিমেডিসিন – সব কর্মকাণ্ডেই সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেন। এই সংগঠনে বাঙালি ছাড়াও বিভিন্ন দেশ ও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বাসিন্দাদের উপস্থিতি রয়েছে। ইগ্নাইটের দুর্গাপুজো সেই অর্থে বাঙালি ছাড়াও সব ধর্ম ও বর্ণের মিলিত আয়োজন। সংগঠনের মুখপাত্র দীপাঞ্জন দাস তাই ইগ্নাইটের পুজোকে ‘আন্তর্জাতিক সর্বজনীন’ পুজো বলছিলেন। পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, হাবড়ার ভূমিপুত্র দীপাঞ্জন সাত বছর বার্লিনে আছেন। তিনি জানালেন, বার্লিনে ৪৭ বছরের প্রাচীন দুর্গাপুজোও আছে। তা সত্ত্বেও বাংলাকে এতটা মিস করছিলেন যে একটা নতুন পুজো তাঁরা নিজেরাই শুরু করলেন হইহই করে। কথা বলতে বলতে স্পষ্ট বোঝা যায়, দীপাঞ্জনের স্মৃতিতে বাংলার পুজো মণ্ডপের ছবি ভেসে ওঠে। তিনি উৎসাহে বলে ওঠেন, “কলকাতার পুজোতে আজকাল কর্পোরেটদের ছোঁয়া বড্ড তীব্র হয়ে উঠেছে। সেখানকার পুজোর মতো আড়ম্বর না হলেও বার্লিনে ইগ্নাইটের পুজোয় আবেগ আর আন্তরিকতার অভাব নেই।”
মহাযুদ্ধের স্মৃতি বুকে নিয়ে জেগে আছে যে শহর, যার বুকের উপরে আজো রয়েছে পূর্ব ও পশ্চিমের বিভাজনরেখার ছাপ, সেই শহরের সব বাঙালিকে মিলিয়ে দিতে মা আসছেন। নিয়মকানুন, নির্ঘণ্ট মেনেই পুজো হবে ইগ্নাইটের। ডুসেলডর্ফ থেকে নেপালি পুরোহিত আসছেন পুজো করার জন্য। রয়েছে ভোগ খাওয়ার ব্যবস্থা। চেটেপুটে পুজোর স্বাদ নেওয়া। ইগ্নাইট কর্তৃপক্ষ আশা করছেন, পুজোয় অন্তত ১২০০-১৫০০ মানুষ আসবেন। তবে করোনাবিধি মানতেও কোনো খামতি রাখছেন না তাঁরা। দীপাঞ্জন জানালেন, “পুজোয় প্রবেশ করতে গেলে অবশ্যই করোনা টিকাপ্রাপ্ত হতে হবে। টিকার সার্টিফিকেট না থাকলে সদ্য করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট থাকতেই হবে।”
দুর্গাপুজো শুধু কোনো উৎসব নয়, বরং বৃহৎ উদযাপন। তাই ধর্মীয় নিয়মনীতির বাইরে ইগ্নাইট প্রথমবার একটি পুজোবার্ষিকীর পরিকল্পনা করেছে। শারদীয় উৎসব মানেই রকমারি পুজোসংখ্যা। শিউলির সঙ্গে মিশে যায় সদ্য প্রেস থেকে বেরোনো নিউজপ্রিন্টের গন্ধ। নতুন উপন্যাস, গল্প, কবিতার ডালি। সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা ওটিটি যতই আমাদের অখণ্ড প্রহরে থাবা বসাক, শারদীয় পত্রিকা ছাড়া উৎসব পূর্ণতা পায় না। কিন্তু প্রবাসে বসে এ কাজটা সহজ নয়। সেখানে পুজোবার্ষিকী প্রকাশের উদ্যোগ যে ভীষণই অভিনব, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দীপাঞ্জন বলেন, “ভাষা এখানে প্রতিবন্ধকতা হবে না। জার্মানি ও ভারতের বিভিন্ন রাজ্য, বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, স্লোভেনিয়া থেকে লেখা এসেছে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায়। শিশুরাও অংশ নিয়েছে ছবি আঁকাতে।” কী ধরনের লেখা জমা পড়েছে? রবীন্দ্রনাথ আর লেনিনের সম্পর্ক থেকে পরিযায়ী শ্রমিক বা ভ্রমণ। কবিতা থেকে ডিজিটাল ফটোগ্রাফিতে সেজে উঠেছে ছাপা পত্রিকাটি। বার্লিন পুজোবার্ষিকীর কাজ একেবারে শেষ পর্যায়ে। অষ্টমীর আলো ঝলমলে সন্ধ্যায় তার উদ্বোধন।
