রামমোহনের বংশধরেরা শিরনি চড়ালে তবেই শুরু হয় পিরের উৎসব

পির একদিল শাহ্‌র দরগার মিনারটি গড়ে দিয়েছিলেন বিজয় বিশ্বাস

বাংলায় সুফি-দরবেশরা আসতে শুরু করেছিলেন একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দী থেকেই। তাঁদের মরমিয়া সুরে প্লাবিত হয়েছিল বাংলাদেশের মানুষ। ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে এলেও তাই হিন্দু আর মুসলমানের মধ্যে এক অদ্ভুত সমন্বয়ের সেতু তৈরি করে ফেলেছিলেন তাঁরা। পিররা তাই সর্বজনীন হয়ে উঠেছিলেন। ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’-এর শুরুতেও তাই জড়িয়ে গেল পির-বন্দনা। পিরের দরগায় আজও তাই মাতোয়াল্লি কোথাও হিন্দু, কোথাও মুসলমান। যে পাঁচপিরের কাহিনি পিরসাহিত্যে বা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে, তার অন্যতম হলেন একদিল শাহ্। তাঁর অলৌকিক কাহিনি এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

ইতিহাস বলছে, প্রায় ৮০০ বছর আগে বাগদাদ থেকে বারাসাতের কাজিপাড়ায় এসে আস্তানা তৈরি করেছিলেন তিনি। হজরত পির একদিল শাহ্‌ ছিলেন খাজা মইনুদ্দিন চিস্তির শিষ্য। তখন বারাসাতের নাম ছিল আনোয়ারপুর পরগনা। কাজিপাড়া তখনই বনেদি মুসলমানের গ্রাম। সেই গ্রামের ছোটু মিয়াঁ ও তাঁর স্ত্রী ছিলেন নিঃসন্তান। তাঁদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন হজরত একদিল। তখন গৌড়ের সুলতান ছিলেন হোসেন শাহ্‌। হজরত একদিল শাহ্‌র আসল নাম ছিল আহমদ উল্লাহ রাজি। তখন কাজিপাড়ার পাশে ছিল সুবর্ণরেখা নদী। সে নদী এখন ছোট্ট খাল। তাঁরই পশ্চিমপাড়ে একদিল শাহর মাজার। আজও তাঁর ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। কেউ মাজারে এসে দোওয়া করেন, কেউ এসে চাদর চড়িয়ে যান। প্রতি বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত বহু মানুষ আসেন। মাজার জিয়ারত করেন, মনের ইচ্ছা জানান, রোগ-শোক থেকে মুক্তি চান।

পৌষ সংক্রান্তির আগের রাতে মৃত্যু হয়েছিল হজরত পির একদিল শাহের। প্রতি বছর এইদিনে শুরু হয় উরুস উৎসব। মেলা বসে দরগার পাশে, উরুস উৎসব চলে ৮ দিন ধরে। উরুস শুরুর আগের রাতে মাজারে প্রথম শিরনি দিয়ে যান রাজা রামমোহন রায়ের বংশধররা. সঙ্গে দেন সমপরিমাণ নজরানা। তারপর শুরু হয় উরুস। আজও এই রীতি চলছে। দরগার পাশে রয়েছে উঁচু মিনার। বারাসাতেরই বিজয় বিশ্বাস তৈরি করে দিয়েছিলেন এই মিনার। উরুসের আগের রাতে এখানে নহবত বাজে। ক’বছর আগে থেকে আর সানাইবাদকের দেখা পাওয়া যায় না। এখন সানাইয়ের সুর শোনা যায় মাইকে। রাজা রামমোহন রায়ের বংশধররা পিরের ভক্ত ছিলেন। দরগাহর উন্নতির জন্য ন’শ ঊনত্রিশ বিঘে পাঁচ কাঠা জমি তাঁরা দান করেছিলেন। উরুস শুরুর আগের রাতে এখন আর রায় বংশের কেউ আসেন না, তাঁদেরই মনোনীত গোবরডাঙার জমিদার বাড়ির সদস্য আসেন, না হলে উরুস শুরু হবে না।

ভারতের লৌকিক জীবনে জড়িয়ে রয়েছেন ঐতিহাসিক আর কাল্পনিক পির। একদিল শাহ ছিলেন ঐতিহাসিক পির। ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য এদেশে এলেও কখনও হিন্দুদের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ হয়নি। তাঁর লড়াই ছিল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে। তখন বারাসাতেরই আনোয়ারপুরের শাসক চাঁদ খাঁ-র সঙ্গে তাঁর বিরোধ ছিল। চাঁদ খাঁ-র অহমিকা, দরিদ্র মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, পির একদিল সহ্য করতে পারতেন না। রাখালের ছদ্মবেশে তিনি ঘুরে বেড়াতেন। অলৌকিক শক্তির নিদর্শনও নাকি রাখতেন। তাঁর গরু আর পাখিপ্রীতি ছিল অসম্ভব। তাঁর নজরগাহে গাছে থাকা বাদুড় মারা নিষিদ্ধ। তাঁর দরগায় আজো রয়েছে  অনেক পায়রা। এই এলাকায় পায়রা হত্যা নিষিদ্ধ। দরগার পাশে রয়েছে পায়রা থাকার ঘর। কোনো পায়রা অসুস্হ হলে তাকে নির্দিষ্ট ঘরে রেখে দেওয়া হয়। দরগার খাদেমদার বলছেন, “পিরের রহমতে কয়েকদিন পর সুস্থ হয়ে সে ফের উড়তে শুরু করে।”

ছোটু মিঁয়া জীবিত থাকতেই একদিল শাহর মৃত্যু হয়েছিল। কবরস্থান বা রওয়াজ শরিফে দুটি বাঁশ রয়েছে এখনও। পাকা কবরস্থান তৈরি করে দিয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়ের বংশধররা। কাঁচা কবরস্থানে যে বাঁশ দুটো ছিল তখন, আজ ৮০০ বছর পরও পির একদিল শাহর স্মৃতি বহন করছে তা।

হিন্দু -মুসলমান সবার কাছে পির একদিল শাহ আজও সমানভাবে গ্রহণীয়। বহুবার এখানে দাঙ্গা সংগঠিত করার চেষ্টা করেছে একদল। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের সম্মিলনই এখানকার ইতিহাস। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গাতেও নাকি বারাসাতের কাজিপাড়ায় দু’ধর্মের মানুষের কোনো অনিষ্ট হয়নি। সারারাত এক যোদ্ধার বীরদর্প শুনতে পেতেন মানুষ। স্থানীয়রা বলেন, তিনি আর কেউ নন, হজরত পির একদিল শাহ স্বয়ং। মানুষ তাঁর দরগায় আসেন। দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষ দিনরাত এখানে পড়ে থাকেন, অনেকেরই নাকি রোগমুক্তিও হয়েছে, নিঃসন্তানের সন্তান হয়েছে, বলছিলেন স্থানীয়রা। দূর থেকে মানুষ এলে তাঁদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেন খাদেমদারা। পিরের স্মৃতিতে রয়েছে স্কুল, লাইব্রেরি।

বহু স্মৃতি-বিজড়িত দরগা এটা। চারিদিকে সাবেকি গাছ। ছায়া ঘেরা রওয়াজা। পাশে মজে যাওয়া সুবর্ণরেখা নদী। এই নদীতে একসময় সপ্তডিঙা মধুকর ভাসত। কলকাতার থেকে বারাসাত স্টেশনে নেমে ভ্যানরিকশায় ১০ মিনিট জগদিঘাটা কাজিপাড়া। চাঁপাডালি বাসস্ট্যান্ড থেকেও রিকশায় ১০ মিনিট। কাজি মনজুর-উল আলম বলছিলেন, সরকার একটু নজর দিলে আরো বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যেত পিরের সম্প্রীতির বার্তা। আজ, এই বদলাতে থাকা বাংলায় এই মাটির সম্প্রীতির ইতিহাসটাই খুঁড়ে সামনে আনা দরকার খুব বেশি করে। যেখানে ইতিহাসে পিরের মাজারে নতজানু হন হিন্দু গৃহবধূটি, বারাসাতের কালিপুজোয় ঢল নামে স্থানীয় মুসলমানদেরও।

Developed by DXDasia