July 1, 2017 | 12:00 PM

বাংলার পীর ২

বাংলার নবাব যখন মুর্শিদকুলি খাঁ, তখন হজরত সৈয়দ শাহ্ গাজী মোবারক সুন্দরবনে এসে শুরু করেছিলেন আধ্যাত্মিক আরাধনা। শোনা যায়, তাঁর বাবা ছিলেন জমিদার চন্দন শাহ্। ছেলেকে সংসারের বাঁধনে আটকে রাখার জন্য বিয়ে দিয়েছিলেন। আরব ও পারস্য থেকে তখন পীর-সুফিরা এদেশে আসছেন ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে। তখনই সুফিবাদের প্রতি অমোঘ টান অনুভব করে তিনি সংসার ত্যাগ করেন। তাঁর জন্মস্থান ছিল তৎকালীন ২৪ পরগনার বেলে আদমপুর। সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে ঈশ্বরের সাধনা করতে করতে মোবারক গাজী চলে এলেন ঘুটিয়ারিতে। এরপরই শুরু হল তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা দেখানোর কাজ। তাঁর দুই ছেলে ছিলেন দুঃখী গাজী আর মেহের গাজী। দুঃখী গাজীর বংশধররা আজ দেওয়ান পরিবার নামে পরিচিত। তাঁরাই মোবারক গাজীর দরগা দেখভাল করেন। যে পাঁচ পীরের মাহাত্ম্য নিয়ে আমাদের বাংলা সাহিত্য এত সমৃদ্ধ হয়েছে গাজী মোবারক তার মধ্যে অন্যতম। নির্যাতিত ও অবহেলিত মানুষের সামাজিক অধিকার রক্ষার জন্য তিনি ঈশ্বরের সাধনা করেছেন, তবে তা ছিল হিন্দু–মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতি রক্ষা করেই। ইতিহাস থেকে জানা যাচ্ছে, তৎকালীন দক্ষিণ মেদরমল্লার, বর্তমানে বারুইপুরের জমিদার মদন রায়চৌধুরী আর ঘুটিয়ারির পাশে ব্রাহ্মণ অধ্যুষিত গ্রাম নারায়ণপুরের জমিদার রামচন্দ্র চ্যাটার্জির ওপর তাঁর প্রভাব ছিল ব্যাপক। কথিত আছে, বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ জমিদারির খাজনা বাবদ তিন বছরে মদন রায়চৌধুরীর কাছে তিন লক্ষ তিন হাজার টাকা পেতন। মদন রায়চৌধুরীর মন্ত্রী ছিলেন ফরিদ মোল্লা। পীর মোবারক গাজীর কাছে এসে গোটা ঘটনা জানানোর পর জমিদারের খাজনা মকুব হল। আর তাতে সন্তুষ্ট হয়ে মায়ের নির্দেশ মতো মদন রায়চৌধুরী ১৩৫৬ বিঘে জমি পাট্টা দিয়েছিলেন পীরের নামে। পীর বংশ আজও সেই জমির ওপর নির্ভর করে কাল যাপন করেন।

৭ আষাঢ় মৃত্যু হয়েছিল পীর মোবারক গাজীর। প্রতি বছর এদিনে তাঁর স্মৃতিতে নানা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান হয়। অনুষ্ঠান শুরুর আগে আজও শিরনি দিয়ে যান মদন রায়চৌধুরীর বংশধররা। এটাই রীতি। তারপর ৭ দিন ধরে চলে মেলা। ঠিক তার ৪০ দিন পর ১৭ শ্রাবণ শুরু হয় উরুস। মাত্র একদিন ধর্মীয় উৎসব হয়। উরুসের জন্য আলাদা ট্রেনের ব্যবস্থা করতে হয় রেল দফতরকে। শুধু বাংলা নয়, বিহার, ওড়িশা -বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে তাঁর প্রভাব। তাঁকে অনেকে ডাকেন বড় খাঁ পীর নামে।

লোক মুখে শোনা যায়, তিনি ছিলেন সুদর্শন আর মেজাজী। ঘুটিয়ারি শরিফে পীর মোবারক গাজীর দরগার পাশে রয়েছে পুকুর। এটা মক্কা পুকুর নামে পরিচিত। তিনি জীবিত থাকা অবস্থায় বড় পীর সাহেবের নামে পুকুর কাটা হচ্ছিল। জমিদার মদন রায়চৌধুরী নবাবের পাওনা টাকা শোধ করতে যাওয়ার আগে এই পুকুরে আড়াই কোপ দিয়ে মাটি কেটেছিলেন। পীরের প্রতি ভক্তি দেখিয়ে জমিদার কোদালে কোপ দিয়ে মাটি কাটছেন তখন এটাই ছিল সেরা ঘটনা। এই পুকুরে শিরনি ভাসিয়ে শিরনি ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকেন মানুষ।

মাজারের পাশে রয়েছে পায়রা রাখার জায়গা। তার সামনে পীরের তিন নাতির কবরস্থান। তার পাশে ছেলে দুঃখী দেওয়ানের মাজার। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসেন। বৃহস্পতি ও শুক্রবার রওজায় দোওয়া চাইতে আসেন অনেকেই। এমনকি বিদেশিরাও আসেন প্রায়ই।

ঘুটিয়ারি শরিফ স্টেশনের যেদিকে পীরের দরগা তার উল্টোদিকে রয়েছে গৌরমোহন সেনের কবরস্থান। তিনি নিজের লেখা বইয়ে বলছেন, বাংলায় ১৩৪০ সালে এক অমোঘ টানে বৌবাজার থেকে প্রতিদিন তিনি আসতেন ঘুটিয়ারি শরিফে। পীরের গান গাইতেন। ১৩৬২ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী মৃত্যুর পর পীরোত্তর সম্পত্তিতে ইসলামিক নিয়মে কবর দেওয়া হয়েছে। গৌরমোহনের ছোট ছেলে প্রবীর সেন সপরিবারে এখানে থাকেন। প্রবীর সেন বলছিলেন, যখন তাঁর বয়স দু’বছর তখন থেকে বাবার হাত ধরে আসতেন পীরের রওজায়। এখানেই পড়ে থাকতেন দুজনে। পীরের অছিলায় ১১ বছর বয়সে তিনি দৃষ্টিহীন হয়ে পড়েন। না হলে পীরের এবাদাতের যোগ্য উত্তরাধিকার হবেন না ছেলে। এমনই বলেছিলেন বাবা। তাঁরা সাত ভাই। কিন্তু বাবার ইচ্ছা আর পীর মোবারকে ঐহিক বাণীর ফলে বাবার কবরস্থানের পাশেই রয়েছেন তিনি। প্রবীর সেন একদিকে পীরের এবাদত করেন, পাশাপাশি তারামা-র পুজো করেন।

একসময় এখানে ছিল বিদ্যাধরী নদী। সে নদী এখন ছোট্ট খাল। তারই একপারে আধ্যাত্মিক আরাধনা শুরু করেছিলেন পীর মোবারক গাজী, লোকমুখে শোনা যায়, তাঁর সঙ্গী ছিল দুটো বাঘ। তাঁর মৃত্যুর বেশ কিছুকাল পরও বাঘ দুটো আসত দরগায়। মাজারের চত্বরে গোমাংস নিষিদ্ধ। স্থানীয়রা বলেন হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি রক্ষার জন্য এমনই বিধান চালু আছে যুগ যুগ ধরেই।

এখানে থাকার জন্য ঘর ভাড়া পাওয়া যায়। ভাড়া ২০০ থেকে ৪০০ টাকা। দেওয়ান পরিবার যাবতীয় ব্যবস্থা করে দেন। শিয়ালদহ থেকে ক্যানিং লোকালে মাত্র ৫০ মিনিট। স্টেশনের পাশেই পীরের দরগা। দু’দণ্ড কাটিয়ে যাওয়া যায়।

Developed by DXDasia