নরীর কণ্ঠে ‘আজু কাঁহা মেরি’ গান থামলেই খালি হয়ে যেত রঙ্গগৃহ

আজ বিশ্ব থিয়েটার দিবস

কলকাতা তখন থিয়েটার চর্চার তীর্থক্ষেত্র। নামজাদা ‘কাপ্তেন বাবু-রা সেসব থিয়েটারের চূড়ামণি। গিরিশচন্দ্র ঘোষ, অমরেন্দ্রনাথ দত্ত, রসরাজ অমৃতলাল বসু, অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি সকলেই তাঁরা নিত্যনতুন থিয়েটার আর তার উপস্থাপনা নিয়ে ব্যস্ত। সেদিনের এই চর্চাকে যাঁরা নতুন আলো দেখিয়েছিলেন, তাঁরা হলেন থিয়েটারের দিকপাল সব নগরনটী। নিষিদ্ধপাড়ার মেয়েরা সেদিন থিয়েটারকে ছেলেদের মেয়ে সেজে অভিনয়ের যুগ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। অন্ধকার পাড়ায় প্রবেশ করল নতুন যুগের আলো। যদিও সম্ভ্রান্ত বাড়ির মেয়েদের কাছে তখনও থিয়েটার হল বাস্তবিক অর্থে অবিদ্যা পাড়ার ছেনালি।

এ রকম যখন চলছে, তখন ১৮৯৪-এর ৮ এপ্রিল, সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র পরলোক গমন করেন। তার পর থেকেই থিয়েটার পাড়ায় বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের আরও নিবিড় প্রবেশ ঘটে। এই সূত্রেই মঞ্চে এল ‘গ্র্যান্ড নিউ ড্রামা’ – ‘চন্দ্রশেখর’। দ্য স্টেটসম্যান, ইন্ডিয়ান ডেলি নিউজ-এ ‘চন্দ্রশেখর’-এর সাফল্য নিয়ে তখন বিরাট তোলপাড়। তাতেই জানা গেল থিয়েটারনটী নরীসুন্দরী দলনী বেগমের ভূমিকায় অভিনয় করে এক নতুন নজির তৈরি করেছেন। কেমন সেই নজির?

রমাপরি দত্ত তাঁর ‘রঙ্গালয়ে অমরেন্দ্রনাথ’ বইতে লিখেছেন-“আর সাজিতেন নরীসুন্দরী- দলনী বেগম। সত্যিকারের দলনী বেগমও বুঝি অমন মর্মস্পর্শী অভিনয় করিতে পারিত না। তাঁহার কন্ঠ নিঃসৃত ‘আজু কাঁহা মেরি’ গান এখনও কর্ণে মধুবর্ষণ করিতেছে। শোনা যায়, বহু দর্শক নাকি মাত্র এই গানখানি শুনিবার জন্য’ই রঙ্গালয়ে আসিতেন। ফুলহাউস বিক্রি, কিন্তু চতুর্থ অঙ্কের শেষ দৃশ্যে দলনী-র এই গানের পর, পঞ্চমাঙ্কের পটোত্তোলনের পর দেখা গেল যে রঙ্গগৃহে মাত্র মুষ্টিমেয় দর্শক বিদ্যমান।” গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানি নরীসুন্দরী-র কণ্ঠে’ই প্রবল জনপ্রিয় এই  ‘আজু কাঁহা মেরি’ গানটির রেকর্ড করেছিল। এ প্রসঙ্গেও একটি মন ভেজানো কাহিনি শুনিয়েছেন রমাপতি দত্ত। তিনি লিখছেন, “মিনার্ভায় ‘চন্দ্রশেখর’-এর অভিনয় কালে সুশীলার মতো সর্বগুণসমন্বিতা প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী ও খ্যাতনামা গায়িকাও দলনীর ভূমিকা গ্রহণ করিয়া নরীসুন্দরী-র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অগ্রসর হইতে প্রথমে কিছুতেই সম্মত হন নাই। শেষে কর্তৃপক্ষের একান্ত জেদাজেদিতে এ অংশ লইতে বাধ্য হন ও গ্রামোফোন রেকর্ড হইতে দলনীর গান শিক্ষা করিয়া তবে রঙ্গমঞ্চে নামেন।” এমনই হল এ গানের নেপথ্য কথা।     
 

Developed by DXDasia