স্থানীয় চিনারাই মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ করেন
বাঙালি সমাজে কালীপুজোর ঐতিহ্য বেশ পুরোনো। বাংলা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য কালী মন্দির। সেগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটা খুব বিখ্যাত, আবার স্বল্পখ্যাত এবং খ্যাতির লাইমলাইট থেকে দূরে থাকা কালী মন্দিরের সংখ্যাও কিছু কম নয়, বরং বেশিই। আমাদের মহানগর কলকাতার আরেক নাম কালীক্ষেত্র। তিলোত্তমার বেশ কিছু কালী মন্দিরের নাম দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। যারা অন্য দেশ, অন্য সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে আমাদের বাংলায় এসেছেন, তাদের মধ্যে বহু মানুষ আমাদের সংস্কৃতিকে আপন করে নিয়েছেন, এমনকি তাঁদের কেউ কেউ আমাদের কালী উপাসনার মধ্যেও অনুভব করেছেন অন্তরের টান। বৌবাজারের ফিরিঙ্গি কালী মন্দিরের কথা আমরা সবাই জানি। এই শহরে কালীর এমন মন্দিরও কাছে, যা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চিনারা, এখানে চিনা সম্প্রদায়ই মন্দিরের নিত্য পুজো করে।

আশ্চর্য এই মন্দিরের খোঁজ মিলবে কলকাতা বাইপাসের কাছে ট্যাংরা এলাকায়। এমনিতেই ট্যাংরা কলকাতার চায়না টাউন নামে পরিচিত। কয়েকশো বছর ধরেই এখানে চিনাদের বাস।
মন্দিরের সামনেই বড়ো হরফে ইংরেজিতে লেখা ‘চাইনিজ কালী টেম্পল’। মন্দিরটি খুবই ছোটো। মূল কালী বিগ্রহের পাশে রয়েছে আরেকটি ছোটো কালীমূর্তি। আছে শিবের বিগ্রহও। স্থানীয় লোকেরা বলে থাকেন, অনেক বছর আগে এক চিনা দম্পতির সন্তান খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। অনেক ডাক্তারবদ্যি দেখিয়েও তার রোগ তো সারেই নি, বরং ক্রমশ বেড়ে চলছিল। এলাকার এক গাছের তলায় দু’টি পাথরকে আশেপাশের লোকজন পুজো করত। শেষ চেষ্টা হিসেবে সেই পাথরগুলির কাছেই প্রার্থনা জানান ওই চিনা দম্পতি। ব্যাকুল আবেদন জানান, যাতে তাঁদের সন্তান সেরে ওঠে। তারপর ঘটে অবাক কাণ্ড। সত্যিই সুস্থ হয়ে ওঠে তাঁদের সন্তান। তখন থেকেই দেবী কালীর প্রতি তাঁদের অটুট আস্থা গড়ে ওঠে। তার পরেই এই মন্দির গড়ে ওঠে। এখনও মন্দিরে দেখা যায় সেই গাছ এবং দুটি পাথর।

এলাকার চিনা বাসিন্দারাই মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ করেন। তাঁদের সহায়তা করেন স্থানীয় হিন্দুরা। দেবীর বর্তমান সেবায়েত জন চেং। চিরাচরিত রীতি মেনেই এখানে শিবকে পরানো হয় সাদা ফুলের মালা, লাল জবার মালা দেওয়া হয় কালীকে। প্রতি শনিবার বিশেষ পুজোর ব্যবস্থা থাকে। প্রত্যেক বছর কালীপুজোর রাতে এখানেও ধুমধাম করে উৎসব হয়। বিশেষ তিথিগুলিতে পুজোর দায়িত্ব নেন ব্রাহ্মণ পুরোহিত। দেশীয় ধূপকাঠির সঙ্গে চিনা ধূপকাঠি জ্বালানো হয় মন্দিরে। এখানে দেবীর মূল ভোগ নুডলস আর চপসি। তবে ফল, মিষ্টি, খিঁচুড়ি, পায়েসও মেলে প্রসাদ হিসেবে।