৬০ বছরের জন্মদিনে নান্দীকার শোনালো ‘মানুষ’-এর গল্প

২৯ জুন ষাট বছরে পা দিল ঐতিহ্যবাহী থিয়েটার দল নান্দীকার

১৯৬০ সালের ২৯ জুন কলকাতার প্রখ্যাত গ্রুপ থিয়েটার নান্দীকার তাদের যাত্রা শুরু করেছিল তৎকালীন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়দের হাত ধরে। তারপর এক এক করে এই দলে আসেন অজয় গাঙ্গুলি, দীপেন সেনগুপ্ত, কেয়া চক্রবর্তী, বিভাস চক্রবর্তী, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তর মতো নাট্য-ব্যক্তিত্বরা। ভারতীয় থিয়েটারের ইতিহাসে সেই নান্দীকার এই ২৯ জুন পা দিল ষাট বছরে। ‘নাট্যকারের সন্ধানে ছয়টি চরিত্র’, ‘মঞ্জুরি আমের মঞ্জুরি’, ‘পাতা ঝরে যায়’, ‘শের আফগান’, ‘তিন পয়সার পালা’, ‘চার অধ্যায়’ ইত্যাদি প্রযোজনার মাধ্যমে বাংলা থিয়েটারের দর্শককে নান্দীকার উপহার দিয়েছিল থিয়েটারের নতুন ভাষা। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, অসিত বন্দ্যোপাধ্যায় ছেড়ে যাবার পর ১৯৭০-এর শেষের দিকে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত দলের প্রধান নির্দেশক হিসাবে দায়িত্ব নেন। শুরু হয় নান্দীকারের নতুন পথ চলা। তারপর এক এক করে যুক্ত হয়েছেন স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত, সোহিনী সেনগুপ্ত, দেবশংকর হালদার, সপ্তর্ষি মৌলিক প্রমুখ নাট্যজনেরা। 

গত শনিবার ২৯ জুন ষাট বছরে পা দিল নান্দীকার। নাট্যদলের জন্মদিন উপলক্ষে নতুন নাটক মঞ্চস্থ করলেন তাঁরা। অনিন্দিতা চক্রবর্তী এবং সপ্তর্ষি মৌলিকের লেখনীতে সোহিনী সেনগুপ্তের নির্দেশনায় অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে বিকেল ৩টে ও সন্ধে ৬-৩০টায় মঞ্চস্থ হল ‘মানুষ’। প্রফুল্ল রায়ের ছোটগল্প অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে এই প্রযোজনা। এই দ্বিভাষী নাটকে অভিনয় করেছেন সপ্তর্ষি মৌলিক ছাড়াও প্রায় ত্রিশজন অভিনেতা-অভিনেত্রী। সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন গৌতম ঘোষাল। কিছু রাজনৈতিক বিধি-নিষেধের দিকে প্রশ্ন তোলে এই নাটক। নাটক শুরু হয় প্রত্যন্ত গ্রামের কিছু দরিদ্র মানুষের কথা দিয়ে, যাদের কাছে সামান্য আলো, সামান্য খাবার, সামান্য পোশাক যেন বিলাসিতা। শহরে চলে যেতে চায় তারা। বাঁচার মতো করে বাঁচবার জন্য নতুন জীবন শুরু করতে চায় শহরে। কিন্তু পথের কাঁটা হয়েছে বিশাল অরণ্য আর শেরমুন্ডি পাহাড়। ঘন অরণ্য, বিশাল পাহাড় আর অবিরাম বৃষ্টিতে তারা দিশেহারা হয়ে যায়। কী হবে এরপর? সেইসব মানুষের পাশে দাঁড়ায় ভরোসালাল। এই কয়েকজন পুরুষের সঙ্গে যোগ দেয় একজন গর্ভবতী মহিলা। সে শহর যেতে চায় তার ‘মরদ’-এর কাছে। কিন্তু সে জানে না তার স্বামী জীবিত কিনা। ভরোসা কি পারবে মেয়েটিকে নিয়ে শহরের হাসপাতালে পৌঁছাতে? নাকি ভরোসার উদ্দেশ্য রয়েছে অন্যকিছু? নাটকটির দ্বিতীয় পর্যায়ে তার উত্তর মিলবে। আর তার জন্য এই প্রযোজনাটি দেখতে হবে অবশ্যই।

ভরোসালালের চরিত্রে অভিনয় করেছেন সপ্তর্ষি মৌলিক। কথায় কথায় তিনি বলেন, “২০১২ সালে আমি প্রথম নান্দীকারে আসি। আমার কাছে অভিনয় প্রাথমিক পর্যায়ে একটা মনের বিষয়। সেই মনের বিষয়টা কোথাও বলা হয় না। বাইরের বিষয়কেই প্রধানত গুরুত্ব দেওয়া হয় বেশি। নান্দীকারে আমার প্রথম দিনের ওয়ার্কশপে যখন গেলাম, স্যার রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তের সঙ্গে চোখাচুখি হল। সেই মুহূর্তে মনে হল, এতদিন ধরে যা খুঁজছিলাম, অবশেষে পেলাম। সেটা ঠিক ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না। তারপর আস্তে আস্তে দলটা আমার পরিবার হয়ে উঠতে শুরু করল।”

থিয়েটার মানে শুধুমাত্র মঞ্চে অভিনয় করা নয়, নানারকম কাগজপত্র থেকে শুরু করে টেকনিক্যাল নানাদিক জানাটাও একজন থিয়েটারকর্মীর কাজ। নান্দীকার দায়িত্ব নিয়ে সেই কাজ পালন করে চলেছে। সপ্তর্ষি বলেন, “থিয়েটার দল মানে শুধুমাত্র অভিনয় নয়। সেখানে আনুষঙ্গিক অফিশিয়াল কাজকর্ম থাকে। শ্যামবাজারের অফিসে গিয়ে একটু একটু করে সেগুলোও শিখতে লাগলাম। নান্দীকার প্রযোজিত ‘নাচনী’ আমার অভিনীত প্রথম কাজ। সেখান থেকে জার্নিটা শুরু হল, এখনও চলছে। আমার এই শেখাটা চলছে প্রতিদিনই। আর ‘মানুষ’ নাটকটি মঞ্চস্থ করা ভীষণ চ্যালেঞ্জিং ছিল আমাদের কাছে। কারণ মূল গল্পটি খুব সিনেম্যাটিক। একটা বিশাল পাহাড় অতিক্রম করার দৃশ্য আছে এখানে। সোহিনী (সেনগুপ্ত) নিজের মতো করে পুরো বিষয়টা সাজিয়েছে।” দেখতে দেখতে নান্দীকারের ষাটে পা। উচ্ছ্বসিত বাংলা তথা ভারতীয় থিয়েটারের দর্শক।

Developed by DXDasia