
প্রিয়াঙ্কার ডিজাইনার পোশাক দেখে আপ্লুত স্বয়ং রানি ক্যামিলা
লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেস আর হুগলির বাদিনান গ্রামের ভৌগোলিক দূরত্ব কয়েক হাজার কিলোমিটার। পশ্চিমবঙ্গের ম্যাপে অত্যন্ত ক্ষুদ্র এই গ্রামটিতে যাওয়ার ঝক্কিও অনেক। সিঙ্গুর স্টেশন থেকে প্রথমে টোটোয়, তার পরে পায়ে হেঁটে যেতে হয় সেই প্রত্যন্ত গ্রামে। কিন্তু সেখানে বসেই একটি মেয়ে এমন এক কাজ করে দেখিয়েছে, যা সাড়া ফেলেছে গোটা বাকিংহাম প্যালেস জুড়ে এবং গোটা বিশ্বে। তাঁর কল্পনা, শৈলী ও দক্ষতা ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে দূরত্বের সব বেড়াজাল।
গত শনিবার, ৬ মে, ২০২৩ তারিখে, রাজ্যাভিষেক সম্পন্ন হয়েছে রাজা তৃতীয় চার্লসের (Charles III)। আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেট ব্রিটেনের (Great Britain) নতুন রাজা হয়েছেন ক্যুইন এলিজাবেথের জ্যেষ্ঠ পুত্র চার্লস। একইসঙ্গে ‘ক্যুইন কনসর্ট’ (Queen Consort) ঘোষণা করা হয়েছে চার্লসের স্ত্রী ক্যামিলাকে (Queen Camilla)। এই রাজকীয় অনুষ্ঠানে রাজা এবং রানির পোশাকের ডিজাইন তৈরির জন্য আহ্বান করা হয়েছিল দেশ-বিদেশের বিভিন্ন শিল্পীদের। স্বভাবতই দেশ-বিদেশের অনেক শিল্পী নিজেদের তৈরি করা ডিজাইন পাঠিয়েছিলেন। সেইসব ডিজাইনের ভিড়েও রানি ক্যামিলার চোখ টেনেছে ভারতীয় এক কন্যার বানানো ডিজাইন। বঙ্গতনয়া প্রিয়াঙ্কা মল্লিকের ডিজাইন দেখে তিনি আপ্লুত হয়েছেন।

প্রিয়াঙ্কার বাড়ি বাদিনান গ্রামে। বাকিংহাম প্যালেস দূরে থাক, কোনোদিন ইংল্যান্ডের ত্রিসীমানায় যাওয়ারও সুযোগ হয়নি প্রিয়াঙ্কার। কিন্তু কয়েক হাজার মাইল দূরে বসেও, প্রিয়াঙ্কা এমন কাজ করে দেখিয়েছেন, যা দেখে মুগ্ধ ব্রিটেনের রাজ পরিবার। যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন আর আগের মতো খারাপ নয়। পৃথিবীর প্রায় সব প্রান্তেই পৌঁছে গিয়েছে বিদ্যুৎ এবং মোবাইল ফোন। কিন্তু বাদিনান গ্রামে এখনও ফোনের নেটওয়ার্ক পেতে বেশ বেগ পেতে হয়। কিন্তু এতসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রিয়াঙ্কার শিল্প আজ পৌঁছে গিয়েছে ব্রিটেনের রাজদরবারে। ব্রিটেনের রাজ পরিবারের কাছে সমাদৃত হয়েছে এই বঙ্গতনয়ার অসামান্য শিল্প। তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলো ‛করোনেশন বিগ লাঞ্চ’-এও (Coronation Big Lunch)।
তবে এসব কিন্তু মোটেও সহজ ছিল না। বলার অপেক্ষা রাখে না, রাজ পরিবারের অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশের নানা জ্ঞানীগুণী ফ্যাশন ডিজাইনার নিজেদের নকশা পাঠিয়েছিলেন। এতসব নামিদামি ডিজাইনারের ভিড়েও, নিজের শিল্পদক্ষতার উপর বিশ্বাস রেখে নিজের ডিজাইন পাঠিয়ে দিয়েছিলেন প্রিয়াঙ্কা। প্রিয়াঙ্কার বানানো ডিজাইন খুবই পছন্দ হয় ক্যামিলার। প্রিয়াঙ্কার বানানো নকশাটির থিম ছিল ‛ইটারনাল রোজ’ (Eternal Rose)। প্রিয়াঙ্কার ডিজাইন অনুযায়ী, ড্রেসটির কাঁধের কাছে প্রজাপতি এবং গোটা পোশাক জুড়েই গোলাপ ফুলের পাপড়ির মোটিফ রয়েছে। সঙ্গে রয়েছে একটি সুন্দর লাল রঙের হ্যাট। লাল গোলাপ ইংল্যান্ডের জাতীয় ফুল। সেহেতু লাল গোলাপকেই নিজের নকশার থিম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন প্রিয়াঙ্কা। একইসঙ্গে এই অনুষ্ঠানে রানির জুতোর নকশাও করেছিলেন প্রিয়াঙ্কা। সব মিলিয়ে প্রিয়াঙ্কার কাজ দেখে মুগ্ধ হয়েছেন রানি। তাঁর কাজে রাজ পরিবার এতটাই মুগ্ধ হয়েছে যে, তাকে চিঠি পাঠিয়েছেন খোদ ক্যুইন কনসর্টের ব্যক্তিগত ডেপুটি সচিব। প্রিয়াঙ্কাকে পাঠানো সেই চিঠিতে লেখা রয়েছে, “তুমি অত্যন্ত গুণী শিল্পী। তোমার আঁকা পোশাকের নকশা পেয়ে রানি আপ্লুত। সময় করে তুমি যে এই পোশাকের নকশা বানিয়েছ, তার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।”

এই পোশাক অবশ্য মূল অনুষ্ঠানে পরতে দেখা যায়নি রানিকে। রানির পোশাক ছাড়াও, রাজা চার্লসের জন্য একটি কসমিক বাটারফ্লাই থিমের ব্রুচ ডিজাইন করেছিলেন প্রিয়াঙ্কা। সেটিও যথেষ্ট সমাদৃত হয়েছে ব্রিটেনের রাজ দরবারে। তবে প্রিয়াঙ্কা এই প্রথম ব্রিটেনের রাজ পরিবারের জন্য পোশাক ডিজাইন করলেন, এমনটা নয়। আগেও রানি এলিজাবেথের জন্য পোশাক ও মুকুটের নকশা ডিজাইন করে বাকিংহাম প্যালেসে পাঠিয়েছিলেন প্রিয়াঙ্কা। সেই ডিজাইন দারুণ পছন্দ হয়েছিল রানি এলিজাবেথের (Queen Elizabeth II)। তখনও রাজ পরিবারের তরফের শুভেচ্ছা জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল বাদিনানের এই তরুণীকে।
প্রিয়াঙ্কার বানানো ডিজাইন খুবই পছন্দ হয় ক্যামিলার। প্রিয়াঙ্কার বানানো নকশাটির থিম ছিল ‛ইটারনাল রোজ’ (Eternal Rose)। প্রিয়াঙ্কার ডিজাইন অনুযায়ী, ড্রেসটির কাঁধের কাছে প্রজাপতি এবং গোটা পোশাক জুড়েই গোলাপ ফুলের পাপড়ির মোটিফ রয়েছে। সঙ্গে রয়েছে একটি সুন্দর লাল রঙের হ্যাট। লাল গোলাপ ইংল্যান্ডের জাতীয় ফুল। সেহেতু লাল গোলাপকেই নিজের নকশার থিম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন প্রিয়াঙ্কা। একইসঙ্গে এই অনুষ্ঠানে রানির জুতোর নকশাও করেছিলেন প্রিয়াঙ্কা। সব মিলিয়ে প্রিয়াঙ্কার কাজ দেখে মুগ্ধ হয়েছেন রানি।

প্রত্যন্ত গ্রামে থাকলেও, প্রিয়াঙ্কা বরাবরই নিজের কাজের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন। নিজের দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে সেই স্বপ্নকে সত্যিও করেছেন। প্রিয়াঙ্কার বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, মা গৃহবধূ। আছে এক ছোটো ভাই। মোট চার জনের মধ্যবিত্ত সংসার। ছোটো থেকেই দারুণ আঁকার হাত ছিল প্রিয়াঙ্কার। পাড়া থেকে শুরু করে জেলা এবং জাতীয় স্তরের বহু প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন প্রিয়াঙ্কা। মা-বাবা চেয়েছিলেন মেয়ে যেন ডাক্তার হয়। সেই দিকে পড়াশোনা খানিকটা এগোলেও, কিছুদিন পরেই প্রিয়াঙ্কা নিজের রাস্তা বদলে ফেলেন। পড়াশোনা শুরু করেন আর্ট নিয়ে। তিনি আর্ট নিয়ে কোর্স করেছেন অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে। বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা করার মতো আর্থিক অবস্থা ছিল না। তাই প্রথমে তিনি ইতালির মিলান শহরের একটি প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনলাইনে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের কোর্স করেন। এরপর হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন কোর্সে ভর্তি হয়ে যান প্রিয়াঙ্কা। পরিবেশবান্ধব উপায়ে কিভাবে বিভিন্ন ব্যবসা করা যায়, হার্ভার্ডে তা নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন সাম্মানিক ফেলোশিপ, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন সাম্মানিক ডক্টরেট। এইসব পড়াশোনার সঙ্গেই চলতে থাকে নিজের ফ্যাশন ডিজাইনিং-এর কাজ। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নিজের ব্যবসাও শুরু করে দেন তিনি। বর্তমানে রয়্যাল কমনওয়েলথ সোসাইটির সদস্যা প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে চর্চা বিশ্বজুড়ে। তাঁর নামের সঙ্গে জুড়েছে বহু আন্তর্জাতিক খ্যাতি।