
বাংলার হ্যান্ডলুম শাড়ি আনেককাল আগেই দেশের সীমানা পেরিয়ে ছিল
বাংলার সুতি ও ছাপা হ্যাণ্ডলুম শাড়ি (Bengal's Handloom Saree) অনেককাল আগেই দেশের সীমানা পেরিয়ে ছিল এবং এখন তা পৌঁছে গিয়েছে আবিশ্বের তাবড় তাবড় ফ্যাশন ডিজাইনারদের ডেরায়। H&M- এর মতো বিদেশি ব্র্যান্ডগুলি এবং সব্যসাচীর মতো ডিজাইনাররা বাংলার ৬ গজের সুতির ‘শাড়ি’কে প্রাধান্য দেয়। এমনকী বিতর্কিত মেক্সিকান শিল্পী ও অ্যাক্টিভিস্ট ফ্রিদা কাহলোকেও (Frida Kahlo) একটি ছবিতে ছাপা সুতির শাড়ি পরে দেখা গেছে।
হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। সেই ফ্রিদা কাহলো, যাঁকে বেশিরভাগ সময়ই টিপিক্যাল ব্লাউজ এবং স্কার্ট পরতে দেখা যেত। স্টাইল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পছন্দ করতেন ফ্রিদা। তাঁর বাসস্থান মেক্সিকোর লা কাসা আজুল হলো পণ্যদ্রব্যের খনি এবং ফ্রিদার আইকনিক তেহুয়ানা-স্টাইলের মাটি-ছোঁয়া পোশাক থেকে শুরু করে গেরলাইন পারফিউমের শালিমার, রেভলন নেলপলিশ, ক্যাট-আই সানগ্লাস, ফুলের সুন্দর মুকুট, লাল লিপস্টিক সহ একাধিক পণ্যের উৎপত্তিস্থল এটি। এত কিছু থাকা স্বত্বেও প্রায় ছয় দশক আগে তাঁকে শাড়ি পরতে দেখা গেছিল।
ডিজিটাল প্রকাশনা ‘বর্ডার অ্যান্ড ফল’ সম্প্রতি ইনস্টাগ্রামে একটি ছবি শেয়ার করেছে, যেখানে ফ্রিদা এবং তাঁর দু’পাশে দুই মহিলাকে দেখা যাচ্ছে। তাঁরা ভারতীয় কূটনীতিক এবং রাজনীতিবিদ বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিতের মেয়ে নয়নতারা সেহগল এবং রিতা দর। ১৯৪৭ সালে তোলা এই ছবি। আসল ছবিটি প্রকাশিত হয়েছিল একটি ‘কফি টেবিল বুক’-এ। ফ্রিদা পরেছিলেন সাদা ব্লাউজ, গলায় ভারী চোকার, কানে হীরের দুল সহ একটি হ্যান্ডলুম ছাপা শাড়ি। ইউরোপীয় ও আমেরিকান সুন্দরীদের সবসময়ই বাংলার হ্যান্ডলুম শাড়ির প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিল। এমনকী অ্যাক্টিভিস্ট স্টেসি জ্যাকবসকে সম্প্রতি আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার মতাদর্শের বিরুদ্ধে ‘প্রতিরোধের ১০০ দিন’ উদযাপন উপলক্ষ্যে বাংলার তাঁতের শাড়ি পরতে দেখা গেছে। প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে ‘শাড়ি’ বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে স্টেসি লেখেন, “একজন শ্বেতাঙ্গ মহিলার জন্য এমন পোশাক পরা খুবই অস্বাভাবিক ব্যাপার। আমি আশা করেছিলাম যে, আমেরিকানরা মন্তব্য করবে কেন আমি এই পোশাক বেছে নিলাম! শুধুমাত্র দক্ষিণ এশিয় পরিবারের মানুষ নয়, এর মাধ্যমে সব বর্ণের মানুষদের সঙ্গেই একাত্মতা বোঝাতে চেয়েছিলাম আমি।”
অনুপ্রেরণামূলক জীবন কাহিনি এবং এক ধরনের মায়া বাস্তবতার জন্যই বিখ্যাত হন ফ্রিদা। প্রসঙ্গত, জওহর লাল নেহেরুর বোন বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর দুই মেয়ে, নয়নতারা সেহগল এবং রিতা দর ১৯৪৭ সালে ওয়েলেসলি কলেজ থেকে স্নাতক হন এবং মেক্সিকো পাড়ি দেন। সেখানে গিয়ে তাঁরা শুধু ফ্রিদা’র সঙ্গে দেখাই করেননি, তাঁকে শাড়িও পরিয়ে দিয়েছিলেন। ফ্রিদার শৈশব কেটেছে লা কাসা আজুলে (১৯৪৭ সালে), তাঁর বাড়িতে। সেসময় তাঁর মেরুদণ্ডের সমস্যা মারাত্মক বেড়ে গিয়েছিল এবং পিঠ স্থিতিশীল রাখতে বেশিরভাগ সময়ই তাঁকে করসেট পরে থাকতে হতো। এই সময়ই তাঁকে দেখতে যায় দুই বোন, নয়নতারা আর রিতা।
শাড়ি পরে ফ্রিদা এতটাই অভিভূত হয়েছিলেন যে, তাঁর অসুস্থতা সত্ত্বেও শাড়ি পরা অবস্থায় দুই বোনের সঙ্গে একটি ছবি তোলেন। সেসময় শাড়ি পরা এবং বাংলায় ‘স্টাইল কনসেপ্ট’ প্রচলনের নেপথ্যে ছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা। পার্সি পদ্ধতিতে শাড়ি পরার চটকদার শৈলী মুগ্ধ করেছিল বোম্বের এক নতুন বাসিন্দাকে—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা, ভারতের প্রথম ভারতীয় সিভিল সার্ভিস অফিসার সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনীকে।
তখনও পর্যন্ত, বাংলার মহিলারা সম্ভ্রান্ত বা সাধারণ ভঙ্গিতেই শাড়ি (এখনকার ৬ গজের শাড়ির থেকে কম দৈর্ঘের) পরতো—ব্লাউজ ছাড়া, ব্রড বক্স প্লিট করা, পা পর্যন্ত ঢাকা, আঁচল বুকে জড়ানো, শুধু হাত দুটো দেখা যেত। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সেসময় প্রার্থনা সভায় অংশগ্রহণ করা মহিলাদের জন্য পোশাক নির্ধারণ করেছিলেন—সুসজ্জিত ব্লাউজ, পেটিকোট, শাড়ি এবং আলাদা ভেল (ওড়না); অবিবাহিত মেয়েরা পরতো পাজামার উপর বেখাপ্পা ফ্রক, সালোয়ার কামিজের একটি অভিনব সংস্করণ। জ্ঞানদানন্দিনীই প্রথম পার্সি স্টাইলে ব্লাউজের উপর সিঙ্গেল প্লিটেড শাড়ি পরার রীতি প্রবর্তন করেন, যে স্টাইল ভালোবেসে ফেলেছিলেন মেক্সিকান শিল্পী ফ্রিদা কাহলোও এবং তা-ই ধরা রয়েছে সর্বকালের অন্যতম আইকনিক ফটোগ্রাফে।
______
ছবি কৃতজ্ঞতা: ‘বর্ডার অ্যান্ড ফল’ ইনস্টাগ্রাম পেজ
