
প্রয়াত তরুণ মজুমদারের স্মৃতিচারণ করছেন সংগীতশিল্পী শিবাজী চট্টোপাধ্যায়
তরুণ মজুমদার এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে শিবাজী চট্টোপাধ্যায়
চলচ্চিত্রের সঙ্গে গানের যেমন আত্মিক সম্পর্ক, আমার সঙ্গে তনুদার সম্পর্কটাও ছিল ঠিক তেমন। গানের খাতিরে একদিন যে যোগাযোগের শুরু হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে ক্রমেই তা আরও গভীরতা পায়। তরুণ মজুমদারের (Tarun Majumdar) সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের (Hemanta Mukherjee) বাড়িতে। তনুদা তখন ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’ (Bhalobasa Bhalobasa) ছবির জন্য একজন নতুন কণ্ঠশিল্পী খুঁজছেন। রেকর্ড করে পাঠালাম ‘হার মানা হার’ গানটি। তনুদার পছন্দ হয়ে গেল আমার কণ্ঠ। হেমন্তদার সঙ্গে গায়কির মিল পাওয়ায় তনুদা আমাকে ভীষণ স্নেহ করেছেন আজীবন। শুরু হল তরুণ মজুমদারের সঙ্গে আমার আর অরুন্ধতীর এক ঐতিহাসিক পথচলা। তারপর এ যোগাযোগে বিরতি পড়েনি খুব একটা।

‘ভালোবাসা ভালোবাসা’ ছবিতে তাপস পালের লিপে শিবাজী চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান ‘হার মানা হার’
ওঁর ছবির গানই আমাকে জনপ্রিয়তা দিয়েছিল, এ কথা তো কোনোদিনও অস্বীকার করতে পারব না। শুধু গায়ক নয়, সংগীত পরিচালক হিসাবেও আমার যা কিছু খ্যাতি, সব ওঁরই হাত ধরে। তনুদা সবসময় চাইতেন আমাকে এবং অরুন্ধতীকে দিয়ে জুটিতে কাজ করাতে। বলতেন, “সংসার জীবনে তোমরা যেমন জুটি বেঁধেছ, ঠিক তেমন গানের জগতকেও তোমাদের জুটি অনেক কিছু দিক।”
১৯৯৬ সালে একবার তনুদা ডেকে পাঠালেন, বললেন সিরিয়াল করবেন। ‘বনপলাশীর পদাবলী’। কিন্তু এ নিয়ে তো আগেই চলচ্চিত্র হয়েছে। সে কথা তনুদাকে জানালামও। তনুদা নাছোড়বান্দা, সিরিয়াল হিসেবে এ কাজ আবার নতুনভাবে করতে চান তিনি। সেই মতো লিখে ফেললেন অসাধারণ চিত্রনাট্য। আমিও তাঁর কথা মতো গান তৈরি করে ফেললাম। যদিও শেষমেশ সে কাজ বাস্তবায়িত হয়নি। প্রথম থেকেই প্রযোজকদের সঙ্গে বাজেট নিয়ে একটা সমস্যা ছিল। কিন্তু তনুদা আপোষ করেননি। এদিকে আমি মনে মনে খুব দুঃখ পাচ্ছি। খেটেখুটে যত্ন নিয়ে গানগুলো তৈরি করলাম, সে গান মানুষের কাছে পৌঁছল না।
তনুদা সবসময় চাইতেন আমাকে এবং অরুন্ধতীকে দিয়ে জুটিতে কাজ করাতে। বলতেন, “সংসার জীবনে তোমরা যেমন জুটি বেঁধেছ, ঠিক তেমন গানের জগতকেও তোমাদের জুটি অনেক কিছু দিক।”
তনুদাই একমাত্র পরিচালক, যাঁর হাত ধরে প্রচুর নতুন অভিনেতা-অভিনেত্রী ‘ইন্ডাস্ট্রি’ চিনেছিলেন। নতুনদের জায়গা করে দেওয়ার যে অধ্যাবসায়ের মধ্যে তিনি আজীবন নিয়োজিত ছিলেন, তার কি কোনো তুলনা হয়? শুধু কি তাই! অভিনেতাদের নামও বদলে দিতেন প্রয়োজনমতো। মহুয়া, মৌসুমী, দেবশ্রী – প্রত্যেক নামই তনুদার দেওয়া। এমন পিতৃস্নেহ বর্তমান সময়ে দুর্লভ।
তনুদা নিজে গান লিখে, ভিতরে ভিতরে নিজেই একটা সুর ভাঁজতেন। ওঁর সুর-ভাবনা আমার কাছে এসে প্রকাশ করতেন অনেকসময়। সেই মনের মধ্যে চলা সুরকে আমি সবসময় গুরুত্ব দিতে চেয়েছি। তাঁর সংগীত নিয়ে সম্যক জ্ঞান আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে প্রতিটা মুহূর্তে। ‘ভালোবাসার অনেক নাম’ (Bhalobasar Anek Name) ছবিতে একটি গান ছিল, ‘আমি অল্প নিয়ে থাকতে পারি, যদি পাই একটু ভালোবাসা’ – এই গানের কথা তনুদার, সুর আমার। এ গান আজও জনপ্রিয়। উল্লেখ না করলেই নয়, তনুদার সহযোগিতা ছাড়া এ গান অসম্ভব ছিল।

‘ভালোবাসার অনেক নাম’ ছবিতে শিবাজী চট্টোপাধ্যায়ের সুরে ‘আমি অল্প নিয়ে থাকতে পারি’
একাধিক ছবি এবং সিরিয়ালের কাজ হতে হতেও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। আমারও অসংখ্য গান আড়ালে রয়ে গিয়েছে। হঠাৎ আমার জীবনে ‘আলো’ এল। ‘আলো’-র (Alo) পরিকল্পনা চলাকালীন তনুদা বলেন, অনেকদিন ধরেই তো নানারকম সমস্যা হচ্ছে, আশাকরি এবার ভালোই ভালোই সবটা হবে। এ ছবির মাধ্যমে যেন অরুন্ধতী-শিবাজী (Arundhati-Shibaji) জুটি পূর্ণতা পেল। ছবি শুরুর আগে প্রায় দু-মাস ধরে আমরা নানান আলোচনা করেছি কীভাবে কোথায় গানের প্রয়োজন ইত্যাদি বিষয়ে। এ ছবিতে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর লিপে অরুন্ধতীকে গান গাওয়ানোর সময় আবিষ্কার করলাম, ওঁদের দুজনের কণ্ঠের অসাধারণ মিল। যেন ঋতুপর্ণাই গাইছে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, এ ছবির সমস্ত অংশ জুড়ে ছিল রবীন্দ্রনাথের গান। একটি গানের সঙ্গে অন্য একটি গানের সুরের সংযোগ— ‘শারদ প্রাতে’ গানের এক জায়গায় খেয়াল করলে বোঝা যাবে আলতো করে “আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে” গানের সুর ভেসে এসেছে। এই পরীক্ষানিরীক্ষা করার সাহস আমরা দেখিয়েছিলাম। দর্শকও সাদরে গ্রহণ করেছেন।

অরুন্ধতী হোম চৌধুরীর কণ্ঠে ‘আলো’ ছবিতে ‘শ্রাবণের ধারার মতো’
হঠাৎ আমার জীবনে ‘আলো’ এল। ‘আলো’-র পরিকল্পনা চলাকালীন তনুদা বলেন, অনেকদিন ধরেই তো নানারকম সমস্যা হচ্ছে, আশাকরি এবার ভালোই ভালোই সবটা হবে। এ ছবির মাধ্যমে যেন অরুন্ধতী-শিবাজী জুটি পূর্ণতা পেল।
আমাদের জুটিকে তনুদা আবার ফিরিয়ে আনলেন ‘চাঁদের বাড়ি’ (Chander Bari) ছবিতে। মজার কথা হল, এ ছবিতে আবার তিনি আমাদের অভিনয়ও করতে বলেন। সে এক কেলেঙ্কারি কাণ্ড। যদিও আমরা হইহই করে শুটিং করেছিলাম। মনে হয়েছিল এই ‘চাঁদের বাড়ি’-ই যেন আমার নিজের বাড়ি। প্রত্যেকে কত আপন। বিভেদ ভুলে এমন মিলেমিশে থাকার কথা তনুদা ছাড়া আর কতজনই বা বলেছেন!

‘চাঁদের বাড়ি’ ছবিতে যৌথতার কথা বলেছেন তরুণ মজুমদার
একজন আদ্যোপান্ত কাজ পাগল মানুষ ছিলেন তনুদা। কাজ ছাড়া একদিনও থাকতে পারতেন না। এত বেশি কাজ করতে করতে হয়তো অনেক ক্ষেত্রেই কাজের মান নিয়ে তোয়াক্কাও করতেন না। তরুণ মজুমদারের সিনেমা (Tarun Majumdar’s Film) দর্শকরা যদি খুব মন দিয়ে দেখেন, সকলেই সেটি বুঝবেন। খুব অবাক লাগত, যে মানুষটা ‘পলাতক’, ‘গণদেবতা’, ‘দাদার কীর্তি’, ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’, ‘আলো’, ‘নিমন্ত্রণ’ বা ‘চাঁদের বাড়ি’-র মতো ছবি বানান, তিনিই আবার ‘শহর থেকে দূরে’, ‘খেলার পুতুল’, ‘মেঘমুক্তি’, ‘সজনী গো সজনী’, ‘ভালোবাসার অনেক নাম’ কীভাবে বানাতে পারেন! একই মানুষের কাজের মধ্যে এতো পার্থক্য! ‘আলো’-র অভূতপূর্ব সাফল্যের পর তনুদাকে বলেছিলাম, এই মান থেকে আর নামবেন না, দর্শক আরও উন্নত মানের ছবি আশা করবে আপনার থেকে। কিন্তু ‘সিনেমাপোকা’টি বড়ো নাছোড়বান্দা। তনুদাকে দিয়ে কাজ করিয়ে তবে ছাড়বে। ভালো-মন্দের ঊর্ধ্বে গিয়ে তনুদা আজীবন আঁকড়ে থাকতে চেয়েছিলেন সিনেমা মাধ্যমকে। তিনি পেরেওছিলেন। অমন একখান শিরদাঁড়া বড্ড দুর্লভ এখনকার দিনে।
আমার প্রিয় তনুদা চলে গেলেন। যুগের শেষ হল। এখন বাংলা ইন্ডাস্ট্রি কি রসাতলে যাবে? এমনটা একেবারেই মনে করি না। উত্তমকুমার (Uttam Kumar), সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray), ঋত্বিক ঘটক (Ritwik Ghatak), মৃণাল সেন (Mrinal Sen) প্রয়াত হবার পরেও রসাতলে যায়নি। ইন্ড্রাস্ট্রি চলেছে নিজের ছন্দে। তনুদা যে ধারার ছবি বানাতেন, সেখান থেকে অনেকখানি আলাদা হয়ে গেছে বর্তমান চলচ্চিত্র-ভাবনা। এ সময়েও নতুন পরিচালকরা একের পর এক ছবিতে ভালো ব্যবসা করছেন। ভালো-মন্দ বিচার না করে এটুকু ভাবা দরকার, মানুষ দেখছেন বলেই ব্যবসা করছে বাংলা ছবি। তাই ভালো কাজের মাপকাঠিটা শেষমেশ থাকে দর্শকেরই হাতে। তনুদা শেষদিন অবধি এমনটাই বিশ্বাস করেছেন। তাঁর মতো প্রাণবন্ত, আড্ডাবাজ, চিরসবুজ, চিরতরুণ কাউকে দেখিনি। আমার কাছে তিনি আজীবন বেঁচে থাকবেন সিনেমার মধ্যে দিয়ে, গানের মধ্যে দিয়ে।
*লেখাটি বঙ্গদর্শনের সাপ্তাহিক পত্রিকা শনিবারের কড়চা থেকে পুনঃপ্রকাশিত হল
