
তিন বার ইউপিএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন তিনি
তিনি বাবা-মার একমাত্র মেয়ে। নয়নের মণি। দাদু-ঠাকুমা উপদেশ দিয়েছিলেন বাবা-মাকে, আরেকটি সন্তান দরকার, নিদেনপক্ষে এক পুত্র সন্তানও দত্তক নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সেই মারোয়ারি দম্পতি সেসব কথায় আমল দেননি। সর্বস্ব দিয়ে মেয়েকে বড়ো করে তুলেছেন। তারপর ওই মেয়ে ২০১৫-১৬ ইউপিএসসি পরীক্ষায় সারা ভারতে ১৯ নম্বর র্যাংক করলেন। বাংলায় সেই বার একমাত্র কৃতি মেয়ে, শুধু তাই নয়, বিগত ১০ বছরের মধ্যে রাজ্যে সেরা ফলাফল তাঁরই।
শ্বেতা আগরওয়াল। ভদ্রেশ্বরের রবীন্দ্রনগর জিটি রোডের বাসিন্দা। বাবা সন্তোষ আগরওয়ালের তখন ছিল পারিবারিক মুদির দোকান। চূড়ান্ত অভাবের মধ্যেও তিনি মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। মেয়েরও খুব বইপত্রের দিকে ঝোঁক। চন্দননগরের কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি করা হয় শ্বেতাকে। তখন স্কুলের মাসিক ফি ছিল ১৬৫ টাকা। সন্তোষ আগরওয়াল বলতেন, যদি ১০ টাকা দিনে রোজগার কর যায়, তাহলে স্কুলের বেতনের জন্য সাড়ে ৫ টাকা করে রোজ রেখে দেওয়া যাবে। এতটাই লড়াই করে মেয়েকে পড়াশোনা শিখিয়েছিলেন। বাড়িতে টিভি পর্যন্ত ছিল না। সংসারের হাল শক্ত হাতে ধরে রেখেছিলেন মা প্রেমা আগরওয়াল। ছোটোবেলা থেকেই শ্বেতার লক্ষ্য, বড়ো হয়ে তিনি আইএএস অফিসার হবেন।
রক্ষণশীল পরিবার থেকে মেয়ের পড়াশোনায় যথেষ্ট বাধা এসেছে। আবার তারই মধ্যে, মেধাবী ছাত্রী শ্বেতার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন শিক্ষকরা। চন্দননগরের সেন্ট জোসেফ কনভেন্ট থেকে মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়ে ব্যান্ডেলের অক্সিলিয়াম কনভেন্ট থেকে উচ্চমাধ্যমিকের পাঠ শেষ করলেন শ্বেতা। এদিকে আর্থিক চাপ ক্রমশ বাড়ছে, বাবা মুদিখানার দোকান ছেড়ে লোহার ব্যবসা ধরলেন। চূড়ান্ত প্রতিবন্ধকতার মধ্যে শ্বেতা কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স থেকে হলেন স্নাতক। বাবা-মায়ের আনন্দ তখন দেখে কে! পরিবারে প্রথম স্নাতক হয়েছে তাঁদের মেয়ে। তারপর এমবিএ করেন শ্বেতা।
এরই মধ্যে মুম্বই থেকে চাকরির অফার এল। অনটনের কথা ভেবে যোগ দিলেন চাকরিতে। কিন্তু আইএএস হওয়ার স্বপ্নে ওই চাকরি ছেড়ে দিলেন। চাকরি ছাড়ার সময় অফিসের বস জিজ্ঞেস করেছিলেন, যে পরীক্ষায় ৪ লক্ষ পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৯০ জন পাশ করে, তার জন্য এত ভালো চাকরি ছেড়ে দেওয়া ঝুঁকি হবে না তো? উত্তরে শ্বেতা জানিয়েছিলেন, তিনি সেই ৯০ জনের মধ্যেই থাকবেন।
প্রথমবার ইউপিএসসি-র পরীক্ষায় বসে অকৃতকার্য হয়ে ছিলেন শ্বেতা। তবু ভেঙে পড়েননি। ২০১৩-১৪ সালে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বসে সারা ভারতে ৪৯৭ র্যাংক করলেন। আবার পরীক্ষায় বসলেন। ২০১৪-১৫ সালে পরীক্ষা দিয়ে র্যাংক অনেকটা ওপরে উঠলেও অল্প কিছু নম্বরের জন্য আইএএস-এ সুযোগ পেলেন না। আইপিএস ক্যাডার হয়ে হায়দ্রাবাদ চলে যান। সেখানে পুলিশ অ্যাকাডেমিতে শুরু হয় ট্রেনিং। কিন্তু খাঁকি পোশাকে তাঁর টান ছিল না। অদম্য ইচ্ছাশক্তির জেরে আবার পরীক্ষায় বসলেন ২০১৫-১৬ সালে। সেই জেদের কাছে হার মানল সব প্রতিবন্ধকতা। সারা দেশে ১৯ র্যাংক করলেন শ্বেতা আগরওয়াল। তাঁর লড়াই অন্য ৫ জন সাধারণ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার্থীর মতো ছিল না। তা সত্ত্বেও দমে জাননি তিনি। এখন শ্বেতা আগরওয়াল রামপুরহাটে মহকুমা শাসকের পদে কর্মরত আছেন।
