প্রাচীনকাল থেকে ভাগীরথীর অন্যতম সাক্ষী শাঁখাই ঘাট

জনশ্রুতি অনুযায়ী, রোজ ভোরে এই শাঁখাই ঘাটে গঙ্গাস্নান করতে আসতেন কবি জয়দেব

সেই সুদূর প্রাচীনকালে ভারতে ভ্রমণে এসে মেগাস্থিনিস পৌঁছেছিলেন কাটোয়ার তীরে। তিনি কাটোয়াকে 'কটদুপা' বলে তার ইন্ডিকা গ্রন্থে উল্লেখও করেন। অনেক পরে, গ্রিক ঐতিহাসিকদের গ্রন্থ থেকে এই তথ্য খুঁজে পাই আমরা। এখানে কাটোয়া তীর মানেই গঙ্গা আর অজয়ের মিলনস্থল, যে মিলনস্থলে ছিল কেশব ভারতীর আশ্রম, যেখানে গঙ্গাতীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে উপস্থিত হয়েছিলেন শ্রীচৈতন্যদেব, কেশবভারতীর কাছে তিনি এই মিলনস্থলেই দীক্ষালাভ করেন। বারবার গঙ্গা-অজয়ের মিলনস্থল বলা উদ্দেশ্য হল এই – দুই নদীর মিলনস্থলের একদিকে কাটোয়া শহর, অন্যদিকে শাঁখাই ঘাট। সেই শাঁখাই ঘাট, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ একপার থেকে অন্যপারে যান, যেখানে প্রতিদিন বীরভূমের গঙ্গাস্নান-যাত্রীদের ভিড় লেগেই থাকে। 

কথিত আছে, প্রভু নিত্যানন্দের দ্বাদশ গোপালের অন্যতম তথা একমাত্র শূদ্র গোপাল উদ্ধারণ দত্তকে মা গঙ্গা তার মেয়ে রূপে দেখা দিয়েছিলেন এবং শাঁখা পরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শাঁখার দাম মেটাতে গেলে মা গঙ্গা অদৃশ্য হয়ে যান। তাই আজও এখানে বীরভূম-বর্ধমান-মুর্শিদাবাদের বহু স্নানযাত্রিনী শাঁখাই ঘাটে শাঁখা পরেন। নববিবাহিত মহিলাদের কাছে এই ঘাটে শাঁখা পরাটা খুব পবিত্র কাজ হিসাবে দেখা হয়। যদিও উদ্ধারণ দত্তের মুখ্য খ্যাতিলাভ তথা সাধনস্থল হল উদ্ধারণপুর, যিনি প্রথম জীবনে লক্ষণ সেনের তাম্রশাসনখ্যাত গ্রাম নৈহাটিতে সামন্তরাজা নৈরাজার দেওয়ান ছিলেন। 

প্রাচীনকাল থেকেই এই ঘাটের নাম মানুষের মুখে-মুখে ঘুরত। পরে, মধ্যযুগেও তার প্রভাব দেখা যায়, তাই মঙ্গলকাব্যগুলিতে কখনও 'শঙ্খিনী ঘাট', কখনও 'শঙ্খধ্বনির ঘাট' , কখনওবা 'সাখাই ঘাট' নামে আমরা শাঁখাই ঘাটের কথা খুঁজে পাই। জনশ্রুতি অনুযায়ী, বীরভূমের কেঁদুলি থেকে রোজ ভোরে এই শাঁখাই ঘাটে গঙ্গাস্নান করতে আসতেন 'গীতগোবিন্দ'র কবি জয়দেব গোস্বামী। অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবেও এই ঘাট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবস্থানগতভাবে সুবিধা জন্য এখানে মুর্শিদাবাদের নবাব দুর্গ তৈরি করেন, কারণ বর্ধমানের অংশে এই ঘাট হলেও গঙ্গার অপরপারে নদিয়া, অনতিদূরে মুর্শিদাবাদ ও বীরভূম জেলা। এই কারণে এই স্থানটির উপর নজর পড়ে ইংরেজদেরও। ইংরেজ সাহেব এডিস এখানে নীলকুঠি তৈরি করেন, এই নীলকুঠিতেই চাকরি করতেন রাঢ়দেশের বিখ্যাত পাঁচালিকার দাশরথি রায়। জোর করে নীলচাষ এবং উৎপন্ন নীল রপ্তানিতে জলপথের ব্যবহার করার সুবিধা হত এখানে। জানা যায়, ১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধের সময়ে রাতের অন্ধকারে গঙ্গার অপর পার দিয়ে ইংরেজ সেনারা পলাশির দিকে যাত্রা করেছিল। পরে ১৭৬৩ সালে বক্সারের যুদ্ধে যখন কাটোয়া-গিরিয়া-উধুয়ানালা যুদ্ধে কেঁপে ওঠে, তখন কাটোয়ার যুদ্ধের অধিকাংশ এই শাঁখাই-এ বজরাডাঙার মাঠে হয়। বজরাডাঙাতে রবার্ট ক্লাইভ তাঁর বজরা এনেছিলেন বলে, তখন থেকেই এই স্থানটি ‘বজরাডাঙা’ নামে পরিচিতি পায়। 

স্থানীয় গবেষক স্বপন ঠাকুর একবার লিখেছিলেন যে, কলকাতা থেকে ঠাকুর পরিবার বোলপুর যাওয়ার জন্য জলপথকে ব্যবহার করতেন এবং ভাগীরথী দিয়ে আসার পথে শাঁখাই ঘাটে নেমে বিশ্রাম নিতেন(এ-প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ঠাকুরবাড়ির অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বোলপুর আসার সময় নৌকাযোগে ভাগীরথী হয়ে বাবলা নদী হয়ে ময়ূরাক্ষীতে প্রবেশ করতেন)। শাঁখাই ঘাট আরও একটি বিশেষ কারণে বিখ্যাত, সেটি হল এখানেই প্রথম রাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তিকে আনা হয় রাজস্থানের জয়পুর থেকে। যখন ভারতবর্ষের মুসলিম আক্রমণ শুরু হয়, একের পর এক হিন্দু মন্দিরকে ভেঙে ফেলা হয়, দেবতার মূর্তিকে উৎখাত করা হয়, তখন মথুরা-বৃন্দাবন থেকে প্রচুর হিন্দু দেবতার মূর্তিকে জয়পুরে সরিয়ে দেওয়া হয়। অনেকপরে প্রভু নিত্যানন্দের নাতি প্রেমানন্দ সেই রাধাকৃষ্ণের যুগল একটি মূর্তিকে জয়পুর থেকে বৃন্দাবন হয়ে গঙ্গার উজানে নৌকাযোগে এসে শাঁখাই ঘাটে নামেন এবং শাঁখাইয়ে একটি রাধাকৃষ্ণ মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন। তার আগে এই রাঢ়বঙ্গে কৃষ্ণের সাথে রাধার পুজো হত না যুগলমূর্তি হিসাবে। শ্রী বঙ্কিমচন্দ্র ঘোষ তার 'রাঢ়ের বৈষ্ণব পরিক্রমা ' গ্রন্থে লিখেছেন যে, এই শাঁখাই থেকেই রাধাকৃষ্ণ যুগল এবং জগন্নাথদেবের ভ্রাম্যমাণ পুজো গোটা রাঢ়দেশে চালু হয় এবং শাঁখাইয়ের পর ভ্রাম্যমাণ পুজোর কেন্দ্র হিসাবে নল্যাপুর বা বর্তমান নলিয়াপুরে শুরু হয়, এই নল্যাপুর ছিল প্রভু নিত্যানন্দের জামাই 'শ্রীকৃষ্ণ মঙ্গল'-এর রচয়িতা শ্রীমাধব চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীপাটভূমি।

কালের স্রোতে শাঁখাই ঘাট অক্ষত আছে আজও, শুধু স্থানীয় মানুষের দাবি- গঙ্গার উপর একটি ত্রিমুখী ব্রিজ হলেই নদিয়া-বর্ধমান-মুর্শিদাবাদ ও বীরভূমকে সহজেই জোড়া যাবে, হয়তো অদূর ভবিষ্যৎকালে সেটাও হবে, বাংলার পূর্ব ও পশ্চিম দিকের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি ত্বরান্বিত হবে আরও।

Developed by DXDasia