কোন সময়ের রাজা, চন্দ্রকেতু?

‘…আমরা এই স্থির করিয়াছি, চন্দ্রকেতু লক্ষণ সেনের অধীনে করদ ভূপতি ছিলেন।’

চন্দ্রকেতু। এমন এক রাজা, যার নামে একটি এলাকার নামই হয়ে গেল ‘চন্দ্রকেতুগড়’। এবং চন্দ্রকেতুর সঙ্গে গোরাচাঁদ পীরের সংঘর্ষ, চন্দ্রকেতুগড়ের প্রাচীনত্ব – ইত্যাদি বিষয়ে লিখেছি আগে। কিন্তু আমার মধ্যে একটা প্রশ্ন উঁকি দিয়েছে বারবার, আসলে চন্দ্রকেতু কোন সময়ে বর্তমান ছিলেন? ওই জনপদ থেকে পাওয়া গেছে গুপ্ত-শুঙ্গ যুগের নিদর্শন। আবার, সাত-আটশো বছর আগেও ওই নগরী বর্তমান ছিল – এমনটাও জেনেছি বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ ঘেঁটে। দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকা ওই জনপদ শেষ অবধি পরিচিতি লাভ করেছিল শেষতম শাসক চন্দ্রকেতুর নামানুসারে। ‘চন্দ্রকেতুগড়’। আটশো বছর পেরিয়েও, গড় ও অন্যান্য নিদর্শন মাটিতে মিশে গেলেও, নামটি অক্ষুণ্ণ আছে আজও। সেই চন্দ্রকেতুর শাসনকাল খুঁজতেই বসেছি আজ। অনুমান, সম্ভাবনা আর ইতিহাসের ছেঁড়া-ছেঁড়া সূত্র জুড়ে যে বয়ান, তা আমার কাছে নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছে অবশেষে। বাকিটা পাঠকের হাতে…

কেদারনাথ চক্রবর্ত্তী তাঁর ‘চন্দ্রকেতু’ উপন্যাসে লিখেছিলেন – ‘বিশেষ গণনা করিয়া এই স্থির করিয়াছি, চন্দ্রকেতু বঙ্গীয় ৫০০ অব্দের শেষভাগে পৈতৃক সিংহাসনারূঢ় হয়েন। তৎকালীন মুসলমানদিগের রচিত গোরাচাঁদের পুথি ও সমগ্র ভারতবর্ষ ইতিহাসসমূহসার পর্য্যালোচনা করিলে জানা যায়, চন্দ্রকেতু বঙ্গেশ্বর লক্ষ্মণসেনের অধীনে করদ ভূপতি ছিলেন। …পৃথুরায়ের পতনের পর খ্রীঃ ১১৯৩ অব্দ হইতে দিল্লী নগরীতে মুসলমান রাজত্ব বদ্ধমূল হয়। ইহার পূর্ব্বে যৎকালে দিল্লী নগরী হিন্দু রাজাদিগের শাসনাধীনে ছিল তখন যে ঐ নগরীতে হিন্দুধর্ম্মবিদ্বেষী কোন প্রবল মুসলমানের বসতি ছিল এ সিদ্ধান্ত বোধ হয় কাহার মনে আবির্ভাব হইতে পারে না। গোরাচাঁদের পুথিতে প্রকাশ পাওয়া যায় মহম্মদ গোরাচাঁদ (অধুনা যিনি পীর বলিয়া বিখ্যাত) দিল্লীতে তাঁহার বসতি ছিল। বঙ্গীয় ৬০৩ অব্দে বখ্‌তিয়ারখিলিজি বঙ্গেশ্বর লক্ষ্মণ সেনকে সিংহাসনচ্যুত করেন। ৬০৩ অব্দের পূর্ব্বে মুসলমানেরা বঙ্গে প্রভুতা স্থাপন করিতে পারে নাই। বঙ্গ হিন্দুরাজাগণের শাসনাধীনে ছিল, তৎকালে কোন বিজাতীয় বিদেশী ভূপতির হস্তগত হয় নাই। উপরোক্ত কারণ দৃষ্টে ও ধরণীতল মধ্যে যে সকল ভগ্নাবশিষ্ট রাজ অট্টালিকা রহিয়াছে তাহা পরীক্ষা করিয়া আমরা এই স্থির করিয়াছি, চন্দ্রকেতু লক্ষণ সেনের অধীনে করদ ভূপতি ছিলেন।’

বঙ্গীয় ৫০০ অব্দের শেষভাগ অর্থাৎ ৫৫১ বঙ্গাব্দ থেকে ৬০০ বঙ্গাব্দ, ইংরাজিতে ১১৪৪-১১৯৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে চন্দ্রকেতু রাজত্বের শুরু, এমনই বক্তব্য কেদারনাথ চক্রবর্ত্তীর। লক্ষণসেনের রাজত্বকাল ছিল ১১৭৮-১২০৬ খ্রিষ্টাব্দ, কাজেই চন্দ্রকেতু যে লক্ষ্মণ সেনের অধীনে করদ ভূপতি ছিলেন, এ-বক্তব্যের সপক্ষে মিলে যাচ্ছে ইতিহাসের সময়কাল। কিন্তু ওই একই উপন্যাসে চন্দ্রকেতুর সঙ্গে গোরাচাঁদের যুদ্ধও বর্ণনা করেছেন কেদারনাথ। এখন, বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, গোরাচাঁদের জন্ম আনুমানিক ১২৬৫ খ্রিস্টাব্দে এবং মৃত্যু ১৩৭৩ খ্রিস্টাব্দে। তিনি ১৩২০-২২ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ গৌড়ের সুলতান সামসুদ্দিন ফিরোজ শাহের সময় দেউলিয়ায় আসেন। যদি ধরেও নিই চন্দ্রকেতু ১১৮৩-৯৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সিংহাসনে বসেন, তবু অন্তত ১৩২০-২২ পর্যন্ত তাঁর রাজত্ব করার চিন্তা হাস্যকর। আবার, সতীশচন্দ্র মিত্রের মতে, ১২৩০-৩৩ খ্রিস্টাব্দে ইজুল মুলুক আলাউদ্দিন জানী নামে এক মুসলমান বাংলার এই অংশ শাসন করতেন। তাঁর সময়েই দেউলিয়া গ্রামে বাস করতেন রাজা চন্দ্রকেতু। তিনি গোরাচাঁদের মৃত্যুপরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে আরও বলেছেন – ‘অবশেষে সেই কথা তদানীন্তন বঙ্গেশ্বর আলাউদ্দীনের(১২৩০-৩৭)কর্ণগোচর হইলে তিনি গোরাই গাজীর সমাধির উপর মসজিদ নির্ম্মাণ করিয়া দেন।’

লক্ষ্মণ সেনের সময়ে সিংহাসনে বসলে ১২৩০-৩৩ খ্রিস্টাব্দের চন্দ্রকেতু রাজত্ব করতেন – এ যুক্তি মেনে নেওয়া যায়। আলাউদ্দিনের রাজত্বকাল এবং গোরাচাঁদের মৃত্যুর সম্পর্কে সতীশচন্দ্রের বর্ণিত সময়কালও সমর্থন করে তা। সেক্ষেত্রে নস্যাৎ করে দিতে হয় বিভিন্ন পুঁথি থেকে প্রাপ্ত গোরাচাঁদের জীবনকাল(১২৬৫-১৩৭৩) সংক্রান্ত তথ্য।

(ঋণ – ‘মাস্তুল’ পত্রিকা)

Developed by DXDasia