‘সিরিয়াল’ নির্মাতা মৃণাল সেন

দূরদর্শনে প্রাথমিক সম্প্রচারের পর অরিজিনাল টেপগুলি হারিয়ে যায়

লকাতায় আসার পর মৃণাল সেন (Mrinal Sen) চিনতে শুরু করছেন নতুন শহরকে। মানাতে বহু চেষ্টা করলেও ঠিকভাবে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। অনেক দৃশ্য তাঁর কাছে অচেনা ঠেকছিল। নিজেই বলছেন সে কথা। “মানুষ বন্যার জলের মতো এদিক থেকে ওদিক ছুটছে। আপাতত মনে হলো, কোনো গন্তব্য নেই তাদের। অনেক কুকুর খাবারের খোঁজে শহরময় শোরগোল করে চলে যাচ্ছে। প্রত্যেকটা গলিতে ওদের চেঁচামেচি। ছোট শহরগুলো থেকে চাকরি ও আশ্রয়ের জন্য প্রতিদিন মানুষ এসে কলকাতায় ভিড় করছে। তারা কেউ ফিরে যেতে পারছে না। বৃদ্ধ–শিশু বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ সবাই মিলে গাদাগাদি অবস্থা। শ্বাস নিতে পারছে না শহর কলকাতাশিশুদের মুখগুলো কেমন ভীতিকর পাণ্ডুর নিস্তব্ধ। চোখের দিকে তাকালেই আঁতকে উঠতে হয়। আমার পকেটশূন্য, তাদের দিকে তাকানো যায় না। সবাই মানুষ, কোনো ধর্ম নেই। কে হিন্দু কে মুসলমান চেনার দরকার নেই। রাজনৈতিক আন্দোলনের বিপক্ষে এ যেন এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়, যা আমার সম্পূর্ণ অচেনা।”

মৃণাল সেন পালিয়ে যাননি। বরং এ শহরের গভীরতাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁর চলচ্চিত্রের ভাষায় নতুন সংজ্ঞা পেল কলকাতা। এই শহর মৃণাল সেনকে কখনও ছেড়ে যায়নি। ভালোমন্দর রাস্তা ডিঙিয়ে মৃণাল থেকে গেলেন এ শহরে। কালক্রমে চড়াই-উৎরাই পার করে এসে দাঁড়ালেন এক সমতলে। মৃণাল সেনকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

ব্যক্তিগতভাবে আমার মৃণাল সেনের প্রসঙ্গ এলেই মনে পড়ে যায় কলকাতার সামগ্রিক চিত্র। রাজপথ থেকে গলির অন্ধকার, বেকারত্ব-দারিদ্র-বিপর্যয়ের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট। কিন্তু এ লেখা মৃণাল সেনের কলকাতা-ভুবনকেন্দ্রিক নয়। কলকাতা ও সিনেমার বাইরে প্রায় আড়ালে চলে যাওয়া ‘সিরিয়াল নির্মাতা মৃণাল সেন’ – যিনি টেলিভিশনের পরিসরে নিয়ে এসেছিলেন নতুন ভাষা, নতুন দিগন্ত।

টাইটেল কার্ড

দূরদর্শনে (Doordarshan) সপ্তাহে একটি করে পর্ব সম্প্রচারিত হত ১৯৮৬-৮৭ সালে। প্রতিটা পর্বের বিষয় আলাদা, অর্থাৎ ভিন্ন গল্প। গল্প অনুযায়ী পাল্টে যেত চরিত্রেরাও। প্রত্যেকটির দৈর্ঘ্য প্রায় তেইশ মিনিট। মৃণাল সেন পরিচালিত সিরিজটির নাম ‘কভি দূর কভি পাস’ (Kabhi Door Kabhi Paas)। হিন্দি ভাষায় নির্মিত এই সিরিজে অভিনয় করেছিলেন সেকালের তাবড় অভিনেতারা। মৃণাল সেনের ছবি যাঁরা নিয়মিত দেখেছেন, তাঁরা জানেন যে, নারী-পুরুষের ব্যক্তিসম্পর্ক নিয়ে তিনি খুব একটা কাজ করেননি। বরং তাঁর নির্মাণে বেশি করে ধরা দিয়েছে সেকালের মধ্যবিত্ততা, মূল্যবোধ, সামগ্রিকতার পাশাপাশি সূক্ষ অন্তর্লীন রাজনীতি। কিন্তু সিরিজগুলি বানানোর সময় মৃণাল সেন নারী-পুরুষের সম্পর্ককে অধিক প্রাধান্য দিয়েছিলেন। যা আজ অনেক দর্শকেরই অজানা।

দূরদর্শনে সপ্তাহে একটি করে পর্ব সম্প্রচারিত হত ১৯৮৬-৮৭ সালে। প্রতিটা পর্বের বিষয় আলাদা, অর্থাৎ ভিন্ন গল্প। গল্প অনুযায়ী পাল্টে যেত চরিত্রেরাও। প্রত্যেকটির দৈর্ঘ্য প্রায় তেইশ মিনিট। মৃণাল সেন পরিচালিত সিরিজটির নাম ‘কভি দূর কভি পাস’। হিন্দি ভাষায় নির্মিত এই সিরিজে অভিনয় করেছিলেন সেকালের তাবড় অভিনেতারা।

কভি দূর কভি পাস – একক অভিনয়ে অনিল চট্টোপাধ্যায়

মেগা সিরিয়ালের ধারণা তখনও ভারতীয় দর্শকদের ছিল না। তবে সেই সময় দূরদর্শনের বিখ্যাত টেলিভিশন সিরিয়াল ছিল ‘হামলোগ’ (১৯৮৪), ‘বুনিয়াদ’ (১৯৮৬-৮৭), ‘রামায়ণ’ (১৯৮৭-৮৮) এবং মহাভারত (১৯৮৮-৮৯)। এর পাশপাশি বিখ্যাত চিত্রপরিচালকরা তথ্যচিত্র বা স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি করতেন টেলিভিশনে। সবই সম্প্রচারিত হত কলকাতা দূরদর্শনে। তবে এক্ষেত্রে ‘A Series by’ না লিখে মৃণাল সেন প্রতিটা পর্বের শুরুতেই লিখেছেন ‘A Serial by Mrinal Sen’। যার প্রাথমিক সম্প্রচারের পর অরিজিনাল টেপগুলি হারিয়ে যায়। পুত্র কুণাল সেনকে সিরিজগুলির লো-রেজোলিউশন ফাইল পাঠিয়েছিলেন মৃণাল সেন। কিছু মাস আগে ইউটিউবে কুণাল সেন ১৩টি পর্বের মধ্যে মোট ১০টি পর্ব প্রকাশ করেছেন।

১। দশ সাল বাদ – অভিনয়ে গিরিশ কারনাড, অপর্ণা সেন
২। দো বাহিনে – অভিনয়ে অনিতা কানোয়ার, নীনা গুপ্ত
৩। কভি দূর কভি পাস – একক অভিনয়ে অনিল চট্টোপাধ্যায়
৪। আজকাল – অভিনয়ে মনোহর সিং, লিলি চক্রবর্তী
৫। স্বয়ম্ভর – অভিনয়ে অপরাজিতা কৃষ্ণা, অখিল ভগত, সুহেল শেঠ
৬। দ্য শাল – অভিনয়ে প্রিয়া তান্দুলকর, দিলীপ ধাওয়ান
৭। দ্য ভিক্টরি – অভিনয়ে দীপঙ্কর দে, সুরেখা সিক্রি
৮। দ্য স্ট্রেঞ্জার – অভিনয়ে নীনা গুপ্ত, দিলীপ ধাওয়ান
৯। দ্য আনিভার্সারি – অভিনয়ে ধৃতিমান চ্যাটার্জি, দীপ্তি নাভাল
১০। দ্য আনভ্যানকুইশড – অভিনয়ে উত্তরা বওকর, মনোহর সিং, পাপিয়া অধিকারী

প্রথম পর্ব অর্থাৎ দশ সাল বাদ, সৌজন্যে- কুণাল সেন

দ্য আনিভার্সারি – অভিনয়ে ধৃতিমান চ্যাটার্জি, দীপ্তি নাভাল

প্রত্যেকটি সিরিজই গুণগতমানে সমৃদ্ধ। অভিনব গল্প এবং পরিবেশনে মৃণাল সেন ভারতীয় টেলিভিশনে নতুন দিগন্ত তৈরি করেছিলেন। প্রায় হারাতে বসা এই কাজগুলি দেখে দর্শক মুগ্ধ। অন্য মৃণাল সেনকে আবিষ্কারের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম এই সিরিজ। একদিকে যুদ্ধ, দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষে মানুষের জীবন ও সত্তা যখন ধ্বস্ত, সেই দুঃসময়ে দেখা-পাওয়া নতুন মানবসত্য— তা যতই ভয়ঙ্কর, অপ্রিয় হোক— মৃণাল প্রতিবাদ করেছেন সর্বত্র। আর অন্যদিকে মানুষের চিরন্তন প্রেমের কাহিনি নতুন ভাষা পেয়েছে উল্লিখিত সিরিজে। মৃণাল সেন, এ শহরের আদিঘোড়া এবং প্রিয় কমরেড।

____________

(প্রিয় পাঠক, ২০২৩ সালে শতবর্ষ পূর্ণ করবেন মৃণাল সেন। সেই উপলক্ষ্যে সারাবছর বঙ্গদর্শন.কম প্রকাশ করবে মৃণাল সেন সম্পর্কিত একাধিক গবেষণাধর্মী লেখা এবং চিত্র-আলোচনা।)

Developed by DXDasia