সাম্প্রতিক বাংলা ধারাবাহিকে মূল্যবোধের আড়ালে রয়েছে প্রচ্ছন্ন পিতৃতন্ত্র
বাঙালি এখন আর শুধুমাত্র মাছ, রসগোল্লা, ফুটবল আর রবীন্দ্রনাথে আটকে নেই। সে এখন গ্লোবাল সিটিজেন। টেকনোলজির অগ্রসরতায় দূর হয়েছে নিকট। প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতেও ঘরে ঘরে কালার টিভি, কিংবা নিদেনপক্ষে একটি মুঠোফোন তো আছেই। এরই সঙ্গে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিগুলোও এক্সটেন্ডেড হয়ে গেছে জি বাংলা কিংবা স্টার জলসা পরিবারে জুড়ে। শ্রীময়ী, জুন আন্টি কিংবা জবা-শ্যামারা অসাধারণ সব কাজ করেও প্রত্যেকটি পরিবারের সাধারণ সদস্য হয়ে উঠেছেন। ঠিকই পড়ছেন। সাম্প্রতিককালে বলা যায় বাংলা ধারাবাহিকগুলোই বাঙালি সত্ত্বার আইডেনটিটি হয়ে উঠেছে।
এখন প্রশ্ন হল, এই ধারাবাহিকগুলির টার্গেট অডিয়েন্স কারা? উত্তর সবারই কমবেশি জানা। যদি বলা হয় যে বাড়ির মহিলারাই বাংলা ধারাবাহিকগুলির প্রধান দর্শক, তাহলে কেউ দ্বিমত পোষণ করবেন বলে মনে হয় না। যদি এই ধারাবাহিকগুলোকে প্রোডাক্ট হিসেবে দেখা যায় তাহলে বিজনেস স্ট্রাটেজির জায়গা থেকেও ব্যাপারটি প্রতিষ্ঠিত। দু-একটি ধারাবাহিকক বাদ দিলে প্রধানত নারী চরিত্রদেরকেই প্রাধান্য দেওয়া হয় ধারাবাহিকগুলিতে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিষয়টি কি নেতিবাচক? একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে যদি নারীকেন্দ্রিক সোপ্ ওপেরা দেখানো হয়, তাহলে সেটিকে কি কোনওভাবে উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট-এর অঙ্গ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যাবে না?
এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে মনে পড়ে গেলো কলেজ জীবনে ‘ফেমিনিজম’ পড়তে গিয়ে টেক্সট হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খাতা’ ছোটোগল্পটি পড়েছিলাম। সেখানে দেখেছিলাম নারীদেরকেই কীভাবে পুরুষতন্ত্রের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় নারী সত্ত্বার ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকেই সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘মহানগর’ (১৯৬৩) বা ‘চারুলতা’ (১৯৬৪) ছবিতে চিহ্নিত করে গেছেন নারীকেন্দ্রিক ছবিতে পুরুষতন্ত্রকে কাউন্টার করার ভাষাকে। তারপর এতগুলো দশক পেরিয়েও বাংলার বিনোদন জগত সেই উত্তরাধিকারকে বয়ে নিয়ে যেতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। একবিংশ শতকে দাঁড়িয়েও বাংলা ধারাবাহিকগুলোতে সামন্ততান্ত্রিক পরিবার কাঠামো দেখে রীতিমতো অবাক হতে হয়।
সাম্প্রতিক বাংলা ধারাবাহিকগুলিতে যে মূল্যবোধকে প্রাধান্য দেওয়া হয় তার আড়ালে রয়েছে প্রচ্ছন্ন অথচ শক্তিশালী পিতৃতন্ত্র এবং ব্রাহ্মণ্যবাদের ভাবনা। সার্বিকভাবে এক হেজিমোনিক ম্যাসক্যুলিনিটিকে সহজেই প্রতিষ্ঠিত করা যায়, যদি তার পরিপূরক হিসেবে পুরুষতান্ত্রিক নারীত্বকে আদর্শায়িত করা হয়। যেমন নারীত্বের প্রতীক হিসেবে শাঁখা এবং সিঁদুরকে ‘অকারণ’ গৌরবান্বিত করে তোলার প্রচেষ্টা। সিরিয়ালের মায়েরা টিপিক্যাল মা। আর এই টিপিক্যাল মাতৃমূর্তির সঙ্গে বাঙালির আবেগ হয়তো একটু বেশিই জড়িয়ে। আর এই মায়েরাই যদি শাশুড়ি হন তাহলে পুত্রবধুর সঙ্গে তাদের কলহ এবং শত্রুতা অনিবার্য। এ ধরনের সমস্যাগুলি আরও জটিল রূপ নেয় যখন তারা একান্নবর্তী পরিবারের সদস্য হন। (অবশ্য সাম্প্রতিককালে এধরনের একান্নবর্তী পরিবারের অস্তিত্ব কয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে)। আবার সেসব পরিবারের পুরুষরা প্রায় সবাই পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গেই যুক্ত। অর্থাৎ সেই পরিবারতন্ত্রের কথাই বারবার ঘুরে ফিরে আসে।
বাংলা সিরিয়ালের পুরুষ অবশ্যই সুদর্শন আর্য চেহারার। তাঁরা সবসময়েই উচ্চবর্ণের হিন্দু; অর্থাৎ অবশ্যই তাঁরা ব্যানার্জী-মুখার্জী-চ্যাটার্জী, কখনই মণ্ডল-বিশ্বাস-দাস নয়। তারা কখনই দলিত কিংবা মুসলিম, বা অন্যান্য ধর্মের হতেই পারেন না (গুটিকয়েক উদাহরণ ছাড়া)। নানাবিধ গুণের সমাবেশে তাঁরা প্রায় দেবতুল্য হবেন। অর্থাৎ সবদিক দিয়েই আমরা একটি আদর্শ উচ্চবর্ণীয়, হিন্দু, ভারতীয় পুরুষকে খুঁজে পাবো।
এসব পুরুষেরা গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থেকেও কর্মক্ষেত্রে না গিয়ে শুধুমাত্র গৃহযুদ্ধে সামিল থাকবেন এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা তাঁদের স্ত্রীকে রক্ষা করার জন্যই বাড়িতে থাকবেন। মহিলারা প্রায় সকলেই গৃহবধূ। স্বামী, ঘর এবং পরিবারই তাঁদের জগৎ। স্বামীদের কারও কারও চরিত্রে হালকা দোষ থাকলেও তাঁরা কিন্তু একশো শতাংশই সতী স্বাধ্বী। আসলে বাংলা সিরিয়ালে মেয়েরা দেবী হয়ে উঠতে পারেন এবং স্বামীকেও দেবতা জ্ঞানে পুজো করেন। এইসব স্ত্রীদের কেউ কেউ আবার বিচিত্র সব ক্ষমতা রাখেন। যেমন ধরা যাক, বিপদকালে জবা কিংবা শ্যামা যা যা করতে পারেন পেশাদার মানুষেরাও হয়তো তা পারেন না। অর্থাৎ মোদ্দা কথা হলো নিখুঁত পুরুষের সঙ্গী হতে গেলে নারীকেও নিখুঁত হতেই হবে। দুর্ভাগ্যক্রমে কোনোও মেয়ের গায়ের রং কালো হলে তাকে অন্ততঃ সুশ্রী মুখশ্রী যুক্ত হতেই হবে, পাশাপাশি সুকণ্ঠীও হতে হবে।
এবার আসা যাক প্রেমের প্রসঙ্গে। সিরিয়ালের নায়ক-নায়িকা, এমনকি পার্শ্বচরিত্রদের কারোরই জীবনে সহজ স্বাভাবিক প্রেমের অস্তিত্ব প্রায় দেখাই যায় না। প্রধানত পরিবারের প্রভাবেই জটিলতার সৃষ্টি হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হিরো ধনীর দুলাল। সে ঘটনাচক্রে গ্রামের কোনও গরীব ঘরের মেয়েকে বিয়ে করে বসবে। তারপরেই শুরু হবে ধনী এবং প্রভাবশালী প্রাক্তন প্রেমিকা ও প্রেমিকার পরিবারের সঙ্গে সংঘর্ষ। তার পরিবারও সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে অহেতুক আগ্রহ নিয়ে। আবার বহুবিবাহে ফেঁসে যাওয়া পুরুষরা বেশ দুর্বল চরিত্রের অধিকারীই হন। কিন্তু তাতেও অবশ্য সোনার আংটি বাঁকা হয়ে যায় না।
সামাজিক বৈষম্যের ব্যাপার, যেটি আসলেই পিতৃতন্ত্র এবং ব্রাহ্মণ্যবাদের মেশিনারি হিসেবে কাজ করে, তা বেশ প্রকট হয়ে ওঠে বাড়ির পরিচারিকাদের চরিত্র চিত্রণের মাধ্যমে। তাঁদের বেশভূষা, উচ্চারণ এবং মেক-আপের মাধ্যমে এই মেরুকরণের ছবি সহজেই উঠে আসে। সার্বিকভাবেই একটি বাইনারি তৈরি করা এবং তাকে বয়ে নিয়ে চলার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিকতা এবং রক্ষনশীলতার ছবিই বারবার উঠে আসে।
এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে যে পুরুষতন্ত্রই যদি অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক হয়ে থাকে তাহলে মূলত মহিলারাই কেন এই সিরিয়ালগুলির টিআরপি বাড়ানোর খেলায় মাতেন। কারণটিকে কয়েকভাবে ভাবা যেতে পারে।
(১) পুরুষতন্ত্রকে যদি সূক্ষ্মভাবে প্রবেশ করানো যায় তাহলে সাধারণ দর্শকের পক্ষে সহজে সেটি ধরে ওঠা সম্ভব নয়।
(২) পুরুষতান্ত্রিক নারীত্বকে যদি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয় তাহলেও তাকে সহজে কেউ কাউন্টার করবে না।
(৩) বেশি সংখ্যায় নারী চরিত্রের উপস্থিতি, এবং তাঁদের অতিমাত্রায় বাকমুখর করলেই শক্তিশালী করে তোলা হবে, বা তাঁদের সমস্যাগুলি সঠিকভাবে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠবে — এই ভুল ধারণা অবশ্য পুরুষবাদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ নয়।
(৪) সাম্প্রতিককালে বাংলা সিরিয়ালের দর্শক কিছুটা হলেও অসচেতন। বর্তমান মূলধারার ছবি এবং ধারাবাহিকগুলি মূলত ‘সঠিক’ দর্শক তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে।
(৫) ধারাবাহিকের নির্মাতারা এমন একটি বাজার তৈরি করে ফেলেছেন, যে তার বাইরে ব্যতিক্রমী কোনোকিছু ভাবার শক্তি আমাদের দর্শকদের নেই। ব্যতিক্রমী ভাবনার জায়গা থেকে কোনো কাজ হলেও টিআরপির অভাবে কাজটি বেশিদিন চলে না। যেমন ট্রান্সজেন্ডার ইস্যু নিয়ে তৈরি ‘ফিরকি’ ধারাবাহিক টিআরপির অভাবে এক বছরের বেশি চলেনি।
পরিশেষে কয়েকটি প্রশ্ন রাখা যায়। সাম্প্রতিককালে বাংলা ধারাবাহিকের মতো কাজগুলি আর কতদিন আমাদের দর্শক গ্রহণ করতে সক্ষম হবে? যে সমাজে ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং পুরুষতন্ত্র ক্রমশ শক্তি হারাচ্ছে, যেখানে সব মেয়েরা আর গৃহবধূ হয়ে না থেকে, পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাইরে, অফিসে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে সামিল হচ্ছেন; যেখানে ইউনিভার্সিটিগুলোতে উইমেন স্টাডিজ বা জেন্ডার স্টাডিজ -এর মতো বিষয় পড়ানো হচ্ছে, সেই সমাজের নতুন প্রজন্ম এইসব বস্তাপচা ধ্যানধারণা কেজি দরে বিক্রি করা সিরিয়ালগুলোকে ছুঁড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দেবে না তো? এ প্রসঙ্গে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রী এবং বর্তমানে ফিনল্যান্ডের ইভাস্কুলা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন স্টাডিজ বিভাগের গবেষিকা কৌশানী মিত্র জানাচ্ছেন, “চলতি সিরিয়ালের এই ‘ট্রেন্ড’ এক অদ্ভুত জিনিস, একে নিয়ন্ত্রণ করে প্রতি বৃহস্পতিবার প্রকাশ পাওয়া ‘টিআরপি’ লিস্ট। আমি বাংলা সিরিয়াল ইন্ডাস্ট্রির বিপক্ষে নই। কারণ তা ধুঁকতে থাকা টলিউড ইন্ডাস্ট্রির অনেকের রোজগারের একমাত্র উপায়। আমার আপত্তি ওই ‘ট্রেন্ড’ নিয়ে, যার জন্য নেতাজি, কাদম্বিনী গাঙ্গুলি কিংবা লোকনাথ চরিত্রের পুনঃনির্মাণ ঘটে কিংবা শিক্ষিত মেয়েদের ঘরে বসে ঠাকুরের নামজপ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। আমার মনে হয় খুব সচেতনভাবে এই ‘ট্রেন্ড’ পরিবর্তন করা সম্ভব। থালার সমস্ত খাবার যদি একসঙ্গে পাল্টে দেওয়া হয়, তিন-চারদিন পর খিদের পেটে নতুন বা অচেনা খাবারগুলো না খেয়ে অন্য কোনো উপায় থাকবে কি? কিছুদিনের মধ্যেই তেল ছাড়া স্বাস্থ্যকর সেই খাবার মানুষের অভ্যাসে পরিণত হবে। সিরিয়ালের ক্ষেত্রেও তাই, শুধু এক্ষেত্রে সাহস করে সমস্ত টেলিভিশন চ্যানেল এবং প্রোডাকশান হাউসকে সম্মিলিত ভূমিকা নিতে হবে।”
যে বিনোদন মাধ্যমের সঙ্গে এত মানুষের পেটের ভাত জুড়ে আছে, তারা নতুন কিছু ভাবতে শুরু না করলে ভবিষ্যতে ওই সমস্ত শিল্পীদের প্রতিও সত্যিই কি অবিচার করা হবে না? এখন সিরিয়ালের প্রযোজক-পরিচালক-চিত্রনাট্যকাররা যদি টিআরপি দোহাই দিয়ে তাঁদের কাঁধ থেকে দায় ঝেড়ে ফেলতে চান, তাহলে তাঁদের মনে করাতে হয় যে মোটামুটি ২০০০ সাল বা তার কাছাকাছি সময় পর্যন্তও বেশ কিছু ‘ক্লাসিক’ বাংলা ধারাবাহিক উপহার দিয়েছিলেন আমাদের বিনোদন জগতের গুণী মানুষেরা। যেমন জোছন দস্তিদারের ‘তেরো পার্বণ’, ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘বাহান্ন এপিসোড’, তপন সিনহার ‘হুতুমের নকশা’, ইন্দর সেনের ‘জন্মভূমি’ প্রভৃতি। এই ধারাবাহিকগুলি কিন্তু অথরশিপের জায়গা থেকে অনেকখানিই পুরুষতন্ত্রের প্রভাবমুক্ত ছিলো। তখনও নিশ্চয়ই এধরনের উন্নতমানের ধারাবাহিকের দর্শক ছিলো এবং এখনও পরিশীলিত রুচিবোধ সম্পন্ন শিক্ষিত বাঙালি দর্শক রয়েছেন, যাঁরা বর্তমানে বসে দেখার মতো ধারাবাহিকের অভাব বোধ করে থাকেন। তাহলে আমাদের ধারাবাহিক নির্মাতারা সেই সমস্ত দর্শকদের চাহিদাকে উপেক্ষা করে নিয়মিত দায়িত্ব নিয়ে নিকৃষ্ট মানের কাজ করে চলেছেন এবং একদল নির্বোধ দর্শকশ্রেণিও তৈরি করেছেন তাঁদেরই ব্যবসায়িক স্বার্থে, তার কারণ সাংস্কৃতিক এবং শৈল্পিক অবক্ষয় ছাড়া আর কী-ই বা হতে পারে? কিন্তু এই ধারা তাঁরা খুব বেশিদিন ধরে রাখতে পারবেন তো? একথা একমাত্র সময়ই বলতে পারে। উন্নত শিল্পচেতনার কথা বাদ দিলেও শুধুমাত্র অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের জন্য তাঁদের ‘শুভবুদ্ধি’র উদয় হবে এই আশা হয়তো রাখা যায়। আশা রাখছি, কারণ সব ওলোট-পালোট করে নতুনভাবে সাজাতে কিন্তু আমরাই পারি।
(মতামত লেখকের নিজস্ব। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়।)