দুশো বছর অতিক্রান্ত শ্রীরামপুর কলেজ পাচ্ছে ‘হেরিটেজ’ স্বীকৃতি

এশিয়া মহাদেশের প্রথম মিশনারি কলেজ এটি

ময়ের স্রোতে অনেকটা পথ পেরিয়ে আজ ২০৫ বছরের দোরগোড়ায় সে। অথচ ক্লান্তি নেই একরত্তি। জীর্ণতা যতটুকু আছে, তাও অনায়াসে ফিকে হয়ে যায় ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার মিশেলে। কথা হচ্ছে, ঐতিহ্যবাহী শ্রীরামপুর কলেজ নিয়ে।

গঙ্গার পাড় ঘেঁষে সাদা রঙের এক অট্টালিকা, যেন চিরন্তন এক রাজকীয় মেজাজে দাঁড়িয়ে আছে। লোহার গরাদ ঠেলে ভিতরে ঢুকে এগিয়ে গেলেই মূল ভবন। তার সামনে দিয়ে উঠে গেছে সিঁড়ি। এ আঙিনায় দাঁড়ালেই শুরু হয়ে যায় ‘টাইম ট্রাভেল’। উঁচু ছাদ, কড়ি-বর্গা, খড়খড়ি দেওয়া জানলা, মস্ত খিলান, গম্বুজ এ সবকিছু আমাদের নিয়ে যায় ২০০ বছরের পুরোনো আস্তানায়।

বাংলার দ্বিতীয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শ্রীরামপুর কলেজ (Serampore College)। কলকাতায় যে বছর হিন্দু কলেজ (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি) প্রতিষ্ঠিত হয় ঠিক তার পরের বছর হুগলি (Hooghly) জেলার শ্রীরামপুর শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় এই কলেজ। বাংলা তথা ভারতের তো বটেই এশিয়ার প্রথম মিশনারি কলেজও এটি। এই প্রতিষ্ঠানের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের নানা উপকরণ। রয়েছে দ্বি-শতবর্ষের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির অজস্র কথোপকথন।

বর্তমানে হুগলি জেলার ব্যস্ততম শহর শ্রীরামপুর। আধুনিকতার সবটুকু পরশ মেখে প্রতিনিয়ত পাল্লা দিচ্ছে তিলোত্তমার সঙ্গে। শপিং মল, নামী-দামী দোকান, আলোর রোশনাই, ভিড়ভাট্টা সবকিছুতে রীতিমতো জমজমাট আজকের শ্রীরামপুর। কিন্তু আধুনিকতা যতই শহরকে গ্রাস করুক, ঐতিহ্য আজও অমলিন। একদিকে মাহেশের বিখ্যাত রথ, অন্যদিকে চটকল, প্রথম ছাপাখানা, গির্জা, কোর্ট, ড্যানিশ ঐতিহ্য ইত্যাদি নানান ইতিহাসের মেলবন্ধন ঘটেছে এ শহরে।

আঠেরো শতকের মাঝামাঝি সময়ে দিনেমারদের হাতে শ্রীরামপুর হয়ে ওঠে বাণিজ্য-নগরী। ১৮০০ সাল, ‘শ্রীরামপুর ত্রয়ী’ অর্থাৎ কেরি-মার্শম্যান-ওয়ার্ড এই শহরে আসার পরেই শিক্ষার প্রসার ঘটে। তাঁদের হাত ধরে ১৮১৮ সালে গঙ্গার ধারে ‘অল্ডিন হাউজে’ চালু হয় শ্রীরামপুর কলেজ।

কলকাতার থেকে বয়সে বড়ো শ্রীরামপুর। কলকাতার সঙ্গে তুলনা করলে আজ যা জেগে আছে তা এক করুণ শহরের ফসিল। কিন্তু সেই ফসিল ছুঁয়েও বোঝা যায় ইতিহাসের কত শুভ-অশুভ মহরতের সাক্ষী থেকেছে এই ছোটো জনপদ। এহেন শ্রীরামপুর শহরের নির্মাণ ও স্থাপত্যে লেগে থাকা ঐতিহ্যের নয়া রূপটান দিতে কোমর বেঁধে নেমেছে রাজ্য সরকার (West Bengal Govt)৷ কিছুদিন আগেই জাঁকজমক সহকারে উদ্বোধন করা হয় ড্যানিশ মিউজিয়ামটি। মিউজিয়ামটির পরেই এবার রাজ্য হেরিটেজ কমিশনের উদ্যোগে শ্রীরামপুর শহরের প্রাচীন কলেজ ভবনটিকেও হেরিটেজ তকমা দেওয়া হল। কাজ শুরু হল সংস্কারের।

আঠেরো শতকের মাঝামাঝি সময়ে দিনেমারদের হাতে শ্রীরামপুর হয়ে ওঠে বাণিজ্য-নগরী। ১৮০০ সাল, ‘শ্রীরামপুর ত্রয়ী’ অর্থাৎ কেরি-মার্শম্যান-ওয়ার্ড এই শহরে আসার পরেই শিক্ষার প্রসার ঘটে। তাঁদের হাত ধরে ১৮১৮ সালে গঙ্গার ধারে ‘অল্ডিন হাউজ’- এ চালু হয় শ্রীরামপুর কলেজ। পরবর্তীতে ১৮২১ সালে, ডেনমার্ক সরকারের দেওয়া প্রায় ১০ একর জমিতে বর্তমান কলেজ ভবনের পড়াশোনা শুরু হয়। তৎকালীন প্রায় দেড় লক্ষ টাকা ব্যয়ে গড়ে উঠেছিল এই কলেজ ভবনটি। জানা যায়, ১৮২৭ সালে ডেনমার্কের রাজা ষষ্ঠ ফ্রেডরিকের দেওয়া সনদবলে এই প্রতিষ্ঠান ধর্মতত্ত্বের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে মর্যাদা পায়। কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ হন উইলিয়াম কেরি। ১৮৩৩ সালে চালু হয় কলেজের সংবিধান। কলেজ কাউন্সিলের প্রথম শিক্ষকও হন কেরি স্বয়ং। তখন অধ্যক্ষ পদে বসেন জন মার্শম্যান। শ্রীরামপুর কলেজের গ্রন্থাগারে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের প্রায় ১০১টি ভাষায় দশ হাজারেরও বেশি পুরোনো বই রয়েছে কেরী লাইব্রেরী ও রিসার্চ সেন্টারের আর্কাইভে। শ্রীরামপুর কলজের অধ্যক্ষ নীতিশ দাশ বঙ্গদর্শনকে জানান, “পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে প্রকাশিত প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বাইবেল সহ মিশনের প্রাকাশিত পুস্তক, অভিধান, ব্যাকরণ, সংস্কৃত ভাষায় সংগৃহীত পুঁথি, বেদ-পুরানা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য বই রয়েছে গ্রন্থাগারে। দেশ বিদেশের নানান গবেষকদের আসা যাওয়াও লেগেই থাকে। এরকম লাইব্রেরী পশ্চিমবাংলায় দ্বিতীয় একটি খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর।”

এ কলেজের প্রাক্তন এক ছাত্রী শিল্পা হালদারের কথায়, “ছোট থেকে কলেজ বাড়িটাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছি। গেটের বাইরে থেকে হাঁ করে দেখতাম। সেখানে পড়তে পারার আনন্দ তো বলে বোঝানো যায় না, তবে এ আনন্দ আরও বেড়ে যাচ্ছে কলেজকে হেরিটেজ ঘোষণা করার পর থেকে। কলেজের ভিতরের সবকিছু, যেমন ঘর, জানলা, সিঁড়ি, লাইব্রেরী এমনকি গাছগুলো দেখলেও যে কেউ বলে দিতে পারে এই ঐতিহ্যের কদর কতখানি।”

বেশ কিছুদিন ধরেই নানা মহলে এ কলেজ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নানা পরিকল্পনা করার দাবি ওঠে। বছরের নানা উৎসব অনুষ্ঠানে কলেজের মূল ভবনটি সেজে উঠলেও কলেজের ‘আঁতুড়ঘর’ অল্ডিন হাউজটি ঝোপজঙ্গলে ঢাকা ভগ্নস্তূপের মতো ইতিহাসের সাক্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হেরিটেজ ঘোষণার পরই শ্রীরামপুর শহরের প্রাচীন মানুষ সহ এই কলেজের অধ্যক্ষরা এই ভবনটির সংস্কার নিয়েও যথেষ্ট আশাবাদী। নীতিশবাবুর কথায়, “অনেকদিন যাবৎ কলেজ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আবেদন করা হয়েছিল। আসলে পুরাতন ঐতিহ্যের ভার অনেক, কলেজ কর্তৃপক্ষের একার পক্ষে তা বহন করা সম্ভব ছিল না। সরকারের এ ঘোষণায় এখন কাজ অনেক সহজ হবে।”

বছরের এই সময়টাতে এক পালাবদলের পর্ব চলে। একদিকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল বেরিয়ে গিয়েছে আর অন্যদিকে কলেজের চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষা চলছে।  পুরোনো ছাত্রছাত্রীদের কলেজের পাঠ গুটিয়ে স্মৃতিচারণ শুরু আর একদল নতুন মুখ নতুন স্বপ্ন নিয়ে পা রাখবে অন্দরে। ঠিক এরকম সময়ে শ্রীরামপুর কলেজের হেরিটেজ তকমা পাওয়া যেন উৎসাহের মাত্রা আরও খানিকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। পুরোনো আর নতুনের সহাবস্থানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন মহলে। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের সোশ্যাল মিডিয়াও জানান দিচ্ছে, গঙ্গা পাড়ের এই বুড়ো বাড়িটার বয়স বাড়লেও, মায়া রয়ে গিয়েছে একইরকম।

Developed by DXDasia