বারাকপুরের পার্কে আজও পাহারা দিচ্ছেন সিপাহি নেতা মঙ্গল পাণ্ডে

পার্কে বসে গঙ্গা তীরের সূর্যাস্ত দেখার শোভা অতুলনীয়

শিয়ালদহ থেকে মেন লাইনের ট্রেনে অষ্টম স্টেশন বারাকপুর (Barrackpore)। স্টেশনের বাইরে টোটো, অটো, রিক্সার স্ট্যান্ড। তার কোনোটাতে চেপে পৌঁছে যাওয়া যায় নির্দিষ্ট গন্তব্যে। মঙ্গল পাণ্ডে পার্ক (Mangal Pandey Park)। জনপদটির নাম শুনলে মনে পড়ে যায় সিপাহি বিদ্রোহের কথা। এই মাটিতেই একদিন ইংরেজদের ভারী বুটের আস্ফালন সহ্য করতে না পেরে প্রতিবাদ করেছিলেন সিপাহি মঙ্গল পাণ্ডে। ১৮৫৭ সালে এই বারাকপুরের সেনানিবাসে তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। বলা হয়, বারাকপুর থেকেই সিপাহি বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে ভারতের সর্বত্র। একদিন বিদ্রোহ করার শাস্তি হিসেবে ব্রিটিশরা বারাকপুর ক্যান্টনমেন্টের মাঠে একটি বটগাছের ডালে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেয় তাঁকে।

গঙ্গার তীরে সাজানো শহর বারাকপুর । চারদিকে তাকালেই সবুজের নেশায় চাঙ্গা হয়ে যায় শরীর। ঝাঁ চকচকে রাস্তা, বাহারি আলো, একের পর এক স্কুল, কলেজ, সব কিছু নিয়েই জমজমাট এই ব্যাস্ত জনপদটি। নদীর পাড় বরাবর হেঁটে গেলে মনে হয় শত ব্যাস্ততার মধ্যেও যেন কোনো এক নিস্তব্ধতা গ্রাস করছে অনবরত। আর করবে নাই বা কেন! বারাকপুরের ‘ব্যারাক’ মানেই তো সেনাবাহিনী। এখনও সেই বাহিনীর পাহারার বহর নজর এড়ায় না। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বন্দুকধারীদের টহলদারি চলে রোজদিন। এ শহরের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা তথা ভারতের ইতিহাস। জড়িয়ে আছে প্রাচীন লাটসাহেবের বাংলো, এশিয়ার প্রথম চিড়িয়াখানা, বিখ্যাত ঘোড়দৌড়ের বিলুপ্ত ইতিহাস সহ আরও নানা কিছু। লর্ড ক্যানিংয়ের ভালোবাসার শহর ছিল বারাকপুর। এখানেই রয়েছে দেশের প্রাচীনতম বিমানঘাঁটি। রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ, জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী, সীমান্ত গান্ধী বাদশা খান, ও ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেব সহ বহু মনিষীর পদধূলি পড়েছে বারাকপুরের ইতিহাসে।

স্টেশন থেকে টোটো অথবা অটোয় মিনিট দশেকের রাস্তা। লোহার গেটের ওপর বড়ো বড়ো করে লেখা ‘মঙ্গল পাণ্ডে পার্ক’। সিপাহি নেতা মঙ্গল পাণ্ডের নামানুসারেই এই উদ্যানটির নামকরণ করা হয়েছে এরকম। ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চল এবং সুরেন্দ্রনাথ কলেজের পাশেই অবস্থিত এই পার্ক। ১০ টাকার টিকিট কেটে ঢুকতে হয় ভিতরে। ক্যামেরায় ছবি তুলতে চাইলে রয়েছে ভিন্ন টিকিটের ব্যবস্থাও। বিদ্রোহের আগুনে একদিন তোলপাড় হয়েছিল যে জায়গা আজ সেখানেই এক অন্য দুনিয়া। পার্কের ভিতরে দুইধারে সাজানো গাছের সারি। এগোলেই চোখে পড়বে মঙ্গল পাণ্ডের আবক্ষ মূর্তি। একটু দুরেই রয়েছে বৃহৎ এক কামান, যা সাক্ষ্য দিচ্ছে ইতিহাসের।

প্রাচীনত্বের মধ্যেই এক টুকরো স্মৃতির আস্তানা মঙ্গল পাণ্ডে পার্ক। একদিকে অতীতের সিপাহি বিদ্রোহের ইতিহাস অন্যদিকে বর্তমানে প্রেমিক-প্রেমিকার কথোপকথনে নিত্যদিন মোহময়ী হয়ে ওঠে এই পার্কটি। সমগ্র পার্ক জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অজস্র পুরনো গাছ। বাচ্চাদের মনোরঞ্জনের জন্য রয়েছে দোলনা, স্লিপ ইত্যাদি নানা কিছু। একপাশে সার দিয়ে সাজানো রয়েছে বেশ কয়েকটি বেঞ্চ। জনপ্রিয়তা এতোটাই তুঙ্গে যে, ছুটির দিন তো বটেই সপ্তাহের যেকোনো দিনেই এখানে ফাঁকা বসার জায়গা মেলা ভার! এছাড়াও রয়েছে নৌকা ভ্রমণের ব্যাবস্থা। মাঝির সঙ্গে খানিক দরদাম করে উঠে পড়াই যায় তাতে। গঙ্গার হাওয়া মেখে, পড়ন্ত বিকেলে সূর্যাস্ত দেখার লোভ যে কাউকে সহজেই বিভোর করে দেবে, নিশ্চিত।

যে স্থানে একদিন মঙ্গল পাণ্ডের ফাঁসি হয়েছিল আজ সেখানেই রয়েছে তাঁর স্মৃতি মূর্তি। ইংরেজ শাসনের শেষে স্থাপিত হয় এই মূর্তি। পার্কটি গড়ে উঠেছে তার অনেক পরে। নদীর পাড়ে যখন একের পর এক স্কুল কলেজ তৈরি হল, তখন কাছেই বিশ্রামের জায়গা হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করে মঙ্গল পাণ্ডে পার্ক। নব্বইয়ের দশক থেকেই পার্কে জনসমাগম বাড়তে থাকে। এ চত্বরের গাছ, নদী এমনকি প্রতিটা বেঞ্চ আজও সাক্ষ্য দেয় বন্ধুত্বের, প্রেমের, আড্ডার অথবা মান অভিমানের। প্রতিদিন সকাল ৮ টা থেকে বিকেল ৬ টা অবধি খোলা থাকে উদ্যানের দরজা।

বর্তমানের চাহিদা মেনে চা, ফুচকা, আইস্ক্রিম ইত্যাদির ব্যবসাও জমে উঠেছে পার্ক ঘিরে। সম্প্রতি পার্কের ভিতরেও নতুন রেস্টুরেন্ট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বেতের সাজ এবং বাহারি আলোয় নতুন করে সেজে উঠেছে মঙ্গল পাণ্ডে পার্ক চত্বর। যদিও তাতে সিপাহি বিদ্রোহের ইতিহাস ফিকে হয়নি একটুও। এখনও সবকিছু দাঁড়িয়ে থেকে নজর রাখছেন স্বয়ং মঙ্গল পাণ্ডে। কলকাতা থেকে দিনের দিন গিয়ে আবার ফিরে আসা যায় বারাকপুর থেকে। সপ্তাহান্তে একটি দিন চাইলেই ঘুরে আসা যায় ইতিহাসের শহর বারাকপুর থেকে।

Developed by DXDasia