ব্যারাকপুর – ব্রিটিশদের স্মৃতি ঘেরা প্রাচীন জনপদ

হেরিটেজ ওয়াকে গেলে চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠবে ইতিহাস

ব্যারাকপুরের নাম শুনলে আমাদের প্রথমেই মনে পড়ে মঙ্গল পাণ্ডের কথা। ১৮৫৭ সালে তাঁর বিদ্রোহ থেকেই সারা দেশে ব্রিটিশ বিরোধী অভ্যুত্থান ছড়িয়ে যায়। সমাপ্ত হয় ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন। বিদ্রোহ করার শাস্তি হিসেবে মঙ্গল পাণ্ডেকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্টের মাঠে একটি বটগাছের ডালে ঝুলিয়ে। সেই মাঠ এখন পুলিশ ট্রেনিং স্কুল চত্বরের পাশে। বেশির ভাগ অংশই ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধীনে।

মঙ্গল পাণ্ডে পার্ক  

এখনও সেই বটগাছ দেখতে পাবেন আপনি। তবে মাঠের কিছু অংশে যেতে চাইলে অনুমতি নিতে হবে। যে মোটা ডালে মঙ্গল পাণ্ডেকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল বলে মনে করা হয়, সেটি আজও রয়েছে। গাছের সামনে কিছুক্ষণ চোখ বুজে দাঁড়ালে হয়তো আপনার কল্পনায় ভেসে উঠতে পারে ওই অশান্ত দিনগুলি। ভারতবর্ষের ইতিহাস যখন চিরকালের জন্য পালটে যাচ্ছিল।

মঙ্গল পাণ্ডে স্মারক 

ব্যারাকপুরে হেরিটেজ ওয়াকে গেলে চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠবে ইতিহাস। ব্রিটিশরা এখানে ক্যান্টনমেন্ট তৈরি করেন ১৭৭২ সালে। তার আগে এই প্রাচীন জনপদের নাম ছিল চানক। ইংরেজদের গড়ে তোলা ক্যান্টনমেন্ট বা ব্যারাক থেকেই জায়গাটির নাম ‘ব্যারাকপুর’ হয়ে ওঠে। আজও দেখতে পাবেন মনোরম বাগানে ঘেরা ঔপনিবেশিক রীতিতে বানানো একের পর এক বাংলো। সেগুলো থেকে হুগলি নদীর অসাধারণ ভিউ। ইংরেজদের কাছে ব্যারাকপুর কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এইসব বাংলো দেখেই তা অনুমান করা যায়।    

ইতিহাসে প্রথম ব্যারাকপুরের উল্লেখ পাওয়া যায় গ্রিক নাবিক, ভূগোলবিদ, ইতিহাসবিদদের লেখায় প্রথম খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে তৃতীয় খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। ১৫-১৬ শতাব্দী নাগাদ হুগলি নদীর ধারে চানক এবং আশেপাশের শহরগুলি ছিল খুব ব্যস্ত। ব্রিটিশ আমলে সেগুলি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র এবং বাজার হয়ে ওঠে।  

গান্ধি ঘাট 

গান্ধি ঘাটে গেলে দেখতে পাবেন, মহাত্মা গান্ধির চিতাভস্মের ওপর গড়ে উঠেছে ভবন। তারপর চলে যান বিখ্যাত অন্নপূর্ণা মন্দিরে। ১৮৭৫ সালে এই মন্দির উদ্বোধন করেন রামকৃষ্ণ পরমহংস। স্থানীয় লোকেরা একে রানি রাসমণি মন্দিরও বলে থাকেন। এটির তত্ত্বাবধান করতেন রাসমণির ছোটো মেয়ে জগদম্বা। 

অন্নপূর্ণা মন্দির 

রানি রাসমণির আরেকটি স্মৃতিও রয়েছে এখানে – লালকুঠি দমকল স্টেশনের পুরোনো ভবন। এখন ভগ্নপ্রায়, একসময় ছিল বিশাল প্রাসাদ। বলা হয়, এই জমিদারবাড়ি ছিল রানি রাসমণির পারিবারিক সম্পত্তি। 

সরকারি হাইস্কুল 

ঔপনিবেশিক প্রভাবের কথা যদি বলি, ব্যারাকপুরে রয়েছে ১৮৩৭ সালে গড়ে ওঠা সরকারি হাইস্কুল। প্রতিষ্ঠা করেন জর্জ ইডেন, আর্ল অফ অকল্যান্ড। তিনি ভারতের গভর্নর জেনারেল ছিলেন তখন। গরিব পরিবারের বাঙালি ছেলেরা এখানে পড়ার সুযোগ পেত। অর্থ আসত গভর্নরের তহবিল থেকে। এছাড়া দেখতে পারেন সেন্ট বার্থোলোমিও’স ক্যাথিড্রাল বা গ্যারিসন চার্চ। ব্রিটিশ উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা এবং তাঁদের পরিবার মিলে এই সেমি-গথিক রীতির স্থাপত্য গড়ে তোলেন ১৮৩১ সালে। 

সেন্ট বার্থোলোমিও’স ক্যাথিড্রাল বা গ্যারিসন চার্চ

গন্তব্যের শেষ নেই ব্যারাকপুরে। নিজের মতো ঘুরে দেখুন পরিত্যক্ত ব্রিটিশ বাংলো, সদর বাজার, পুরোনো নীল কুঠি এবং আরও যা যা ইচ্ছে করে। পরিবার এবং বন্ধুদের সঙ্গে মজা উপভোগ করুন। কলকাতা থেকে এক দিনেই ব্যারাকপুর দেখে ফিরে আসা যায়।   
 

Developed by DXDasia